সব হত্যা-অন্যায়ের বিচার হবে, সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি আস্থা রাখুন : সেনাপ্রধান
জনরোষ, তিরস্কার ও ঘৃণা সঙ্গী করে হাজারো শহীদের রক্ত মাড়িয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান ফ্যাসিস্ট সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা। সেদিন গণভবন দখলে নেয় ছাত্র-জনতা। একদিকে ছিল বিজয় মিছিল, অন্যদিকে নৃশংসতা। সেদিন শেখ হাসিনা দেশছাড়ার পরও যাত্রাবাড়ী ও আশুলিয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে গণহত্যা। এমন পরিস্থিতিতে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী (শেখ হাসিনা) পদত্যাগ করেছেন এবং এখন একটা ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট ফর্ম (অন্তর্বর্তী সরকার গঠন) করে আমরা আমাদের কার্যক্রম পরিচালন করব। প্রতিটা হত্যার বিচার করা হবে, প্রতিটা অন্যায়ের বিচার হবে। সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি আস্থা রাখুন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার পূর্বঘোষিত কর্মসূচি ছিল ‘মার্চ টু ঢাকা’। কর্মসূচিতে সারা দেশ থেকে আন্দোলনকারীদের ঢাকায় আসার আহ্বান জানানো হয়। ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি চলাকালে অনির্দিষ্টকালের কারফিউ চলে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনকারীরা যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, আশুলিয়া, গাবতলী দিয়ে রাজধানীতে প্রবেশ করতে থাকে। অবশ্য কয়েক দফায় ভাষণের সময় পরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিকেল ৩টা ৫২ মিনিটে বক্তব্য শুরু করেন সেনাপ্রধান।
সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, ‘আপনারা জানেন, দেশে একটা ক্রান্তিকাল চলছে। আমি সমস্ত রাজনৈতিক দলের নেতাদেরকে এখানে আমন্ত্রণ করেছিলাম। উনারা এখানে এসেছেন আমরা একটা সুন্দর আলোচনা করেছি। সেখানে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, একটা ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট (অন্তর্বর্তী সরকার) আমরা ফর্ম (গঠন) করব। ইন্টেরিম গভর্নমেন্টের মাধ্যমে এদেশের সমস্ত কার্যকলাপ চলবে। আমরা এখন মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে যাব, এ ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট ফর্মের ব্যাপারে উনার সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে আমরা একটা ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট ফর্ম করে দেশ পরিচালনা করব।’
জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, ‘আমি আপনাদের কথা দিচ্ছি, সব হত্যা, সব অন্যায়ের বিচার আমরা করব। আপনারা সেনাবাহিনীর প্রতি আস্থা রাখেন, সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি আস্থা রাখেন। আমি সমস্ত দায়-দায়িত্ব নিচ্ছি। আপনাদের জানমাল এবং আপনাদেরকে আমি কথা দিচ্ছি, আপনারা আশাহত হবেন না ইনশাআল্লাহ। আপনাদের যত দাবি আছে, সে দাবিগুলো আমরা পূরণ করব এবং দেশে একটা শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে নিয়ে আসব। আপনারা আমার সঙ্গে সহযোগিতা করেন দয়া করে। আর এই ভাঙচুর, হত্যা, মারামারি, সংঘর্ষ—এগুলো থেকে বিরত হোন।’
সেনাবাহিনী প্রধান বলেন, ‘আমি নিশ্চিত, আপনারা যদি আমার কথামতো চলেন, আমরা যদি একসঙ্গে কাজ করি, নিঃসন্দেহে আমরা একটা সুন্দর পরিণতির দিকে অগ্রসর হতে পারব। আপনারা দয়া করে আমাকে সাহায্য করেন। মারামারি করে এই সংঘাতের মাধ্যমে আমরা আর কিছু অ্যাচিভ (অর্জন) করতে পারব না, আর কিছু আমরা পাব না। সুতরাং দয়া করে আপনারা সমস্ত ধ্বংসযজ্ঞ, সমস্ত অরাজকতা, সমস্ত সংঘর্ষ থেকে বিরত হোন এবং ইনশাআল্লাহ আমরা সবাই মিলে একটা সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হব। প্রতিটা হত্যার বিচার করা হবে, প্রতিটা অন্যায়ের বিচার হবে।’
জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, ‘আমরা আজকে সুন্দরভাবে কথা বলেছি, সব প্রধান (রাজনৈতিক) দলের নেতারা এখানে উপস্থিত ছিলেন। আমি উনাদের ইনভাইট (নিমন্ত্রণ) করেছিলাম এখানে। উনারা এসেছেন এবং আমরা একটা সুন্দর আলোচনা করেছি। এই আলোচনা ফলপ্রসূ হবে বলে আমি মনে করছি। আমরা একটা সুন্দর ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট ফর্ম করে দেশ পরিচালনা করব। প্রধানমন্ত্রী (শেখ হাসিনা) পদত্যাগ করেছেন এবং এখন একটা ইন্টেরেম গভর্নমেন্ট ফর্ম করে আমরা আমাদের কার্যক্রম পরিচালন করব। আপনারা একটু ধৈর্য ধরেন। আমাদেরকে কিছু সময় দেন। ইনশাআল্লাহ আমরা সবাই মিলে সমস্ত সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হব। আপনারা আর এই সংঘাতের পথে যাবেন না এবং শান্তি-শৃঙ্খলার পথে ফেরত চলে আসেন।’
সেনাপ্রধান বলেন, ‘আমাদের দেশের অনেক ক্ষতি হচ্ছে, অর্থসম্পদের ক্ষতি হচ্ছে। লোকজন মারা যাচ্ছে। এগুলো থেকে আপনারা বিরত হোন এবং আমাদের সাহায্য করেন। আমি সমস্ত দায়িত্ব নিচ্ছি। আপনারা আমাকে সাহায্য করেন। সবাইকে ধন্যবাদ। আল্লাহ হাফেজ।’
ভাষণ শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নেরও জবাব দেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আজকে এখানে জামায়াতের আমির ছিলেন, বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা ছিলেন, জাতীয় পার্টির নেতারা ছিলেন এবং সুশীল সমাজ, এখানে ড. আসিফ নজরুলও ছিলেন।’
সেনাপ্রধান বলেন, এখানে আমার সামনেই উনি (ড. আসিফ নজরুল) সব ছাত্রদেরকে একটা সুন্দর বার্তা দিয়েছেন। উনাকে সবাই শ্রদ্ধা করে। আমি আশা করি, ছাত্ররা উনাকে শ্রদ্ধা করে ওই বার্তা শুনে তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে চলে আসবে এবং আমরা একটা সুন্দর একটা পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাব ইনশাআল্লাহ।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, সেনাবাহিনী শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার কাজ চালিয়ে যাবে। আপনাদের সবার দায়িত্ব, ছাত্রদের দায়িত্ব, রাজনৈতিক নেতা এবং রাজনৈতিক কর্মীদের দায়িত্ব হচ্ছে সেনাবাহিনীকে সাহায্য করা। আপনারা মিডিয়ার মাধ্যমে আমাদেরকে এভাবে একটু সাহায্য করেন। আমরা তাহলে এই পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ সহজেই নিয়ে আসতে পারব।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সেনাপ্রধান বলেন, যদি দেশ শান্ত হয়ে যায়, তাহলে আর কারফিউর কোনো প্রয়োজন নেই, কোনো জরুরি অবস্থার প্রয়োজন নেই, কোনো গোলাগুলির প্রয়োজন নেই। আমি আদেশ দিয়ে দিয়েছি, সেনাবাহিনী কোনো গোলাগুলি করবে না, পুলিশ কোনো গোলাগুলি করবে না। এখন পরিস্থিতি তৈরি হয়ে আছে। আমি আশা করছি, আমার এই বক্তব্যের পরে পরিস্থিতির উন্নতি হবে, আমরা একটা সুন্দর পরিবেশের দিকে যাচ্ছি।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, আমি বলছি, ছাত্রদের প্রতিনিধি বলতে আমি এখানে উনাদের কাউকে পাইনি। আমি ড. আসিফ নজরুলকে পেয়েছি। যেহেতু উনাকে ছাত্ররা শ্রদ্ধা করেন এবং উনিও একটা সুন্দর ভিডিও মেসেজ (বার্তা) দিয়েছেন ছাত্রদের জন্য। আমি আশা করব, এই ভিডিও মেসেজটা কাজে দেবে। এভাবে আপনার কাজ করে দিতে হবে। সবাই ভালো থাকেন। সবাইকে ধন্যবাদ।
সেনাপ্রধান আরও বলেন, আমরা আপনারা সবাই যারা আন্দোলনরত, ছাত্র যারা আছেন, আন্দোলনরত যত লোকজন আছেন, দয়া করে ঘরে ফিরে যান সবাই। ভালো থাকেন। আল্লাহ আমাদের মঙ্গল করুক। আল্লাহ হাফেজ।
এর আগে, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট সেনাসদরের হেলমেট অডিটোরিয়ামে নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ‘অফিসার্স অ্যাড্রেস’ অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান বলেন, ‘যেকোনো পরিস্থিতিতে জনগণের জানমাল এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের জনগণের আস্থার প্রতীক। জনগণের স্বার্থে ও রাষ্ট্রের যেকোনো প্রয়োজনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সবসময় জনগণের পাশে আছে এবং থাকবে।

সোহরাব হোসেন