স্লুইসগেট ধসে নদীগর্ভে বিলীন ডোমারের হালিমার বাড়ি
মাত্র চার দিন আগেও নদীভাঙনের পর কোনোভাবে টিকে ছিল বাড়ির অর্ধেক অংশ। সেই শেষ আশাটুকু আঁকড়ে ধরে ছিলেন নীলফামারীর ডোমার উপজেলার জোড়াবাড়ী ইউনিয়নের পূর্ব হলহলিয়া গ্রামের বাসিন্দা হালিমা বেগম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটিও রক্ষা পেল না। অব্যাহত ভাঙনে তার বাড়ির অবশিষ্ট অংশও নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এখন ঘরের টিন, বাঁশ, কাঠসহ ব্যবহারযোগ্য মালামাল খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা।
আজ বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) হরিডারা নদীর তীরে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকদিন আগেও যেখানে হালিমা বেগমের বসতভিটা ছিল, সেখানে এখন শুধু নদীর উত্তাল স্রোত। পরিবারের সদস্যরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে ঘরের অবশিষ্ট মালামাল সরিয়ে নিচ্ছে। নদীভাঙনের কারণে পুরো পরিবার এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
গত রোববার (২ আগস্ট) হরিডারা নদীর ওপর নির্মিত স্লুইসগেট ধসে পড়ার পর ভয়াবহ নদীভাঙনের শুরু হয়। প্রথমে হালিমা বেগমের বাড়ির অর্ধেক অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়। এরপর টানা চার দিনের ভাঙনে গতকাল বুধবার অবশিষ্ট অংশটুকুও নদীতে হারিয়ে যায়।
হালিমা বেগম বলেন, ‘সেদিন আমার চোখের সামনে বাড়ির অর্ধেক নদীতে চলে গেল। ভাবছিলাম অন্তত বাকি অংশটা থাকবে। কিন্তু সেটাও আর রইল না। এখন ঘরের টিন আর কাঠ খুলে অন্য জায়গায় রাখছি। আমি মানুষের বাড়িতে কাজ করে খাই। নতুন করে ঘর তৈরির সামর্থ্য আমার নাই। এখন কোথায় থাকব, কীভাবে থাকব—কিছুই জানি না।’
হালিমা বেগমের বড় মেয়ে ছাবিনা বেগম বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে প্রথম দিন কিছু শুকনা খাবার দেওয়া হয়েছিল। এরপর আর কেউ খোঁজ নেয়নি। আমরা চাল-ডাল চাই না। সেদিন যদি কয়েকটি বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করা হতো, তাহলে হয়তো আমার মায়ের বাড়িটা রক্ষা পেত।’
স্থানীয় বাসিন্দা প্রদীপ রায় বলেন, ‘স্লুইসগেট ভেঙে যাওয়ায় আমাদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সামনের শত শত বিঘা কৃষিজমিতে সেচ সংকট দেখা দেবে। ইতোমধ্যে বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এ ছাড়া প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ পরিবারের চলাচলের রাস্তা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।’
স্থানীয়রা জানায়, নদীভাঙন এখনও অব্যাহত রয়েছে। এতে নদীতীরবর্তী আরও কয়েকটি বাড়ি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। আতঙ্কে অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় মালামাল নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
জোড়াবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাখাওয়াত হাবীব বাবু বলেন, ‘হালিমা বেগমের পুরো বাড়িটিই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হয়েছে। নদীভাঙন অব্যাহত থাকায় আশপাশের বাসিন্দাদের মধ্যেও চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে।’
ডোমার উপজেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী ফিরোজ আলম বলেন, ‘আমরা পুরো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি। সাধারণ মানুষের চলাচলের সুবিধার্থে একটি অস্থায়ী কাঠের সাঁকো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এখানে নতুন একটি ছয় ভেন্টের স্লুইসগেট নির্মাণের জন্য চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। শিগগিরই অনুমোদন পাওয়া যাবে বলে আশা করছি।’
ডোমার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শায়লা সাঈদ তন্বি বলেন, ‘প্রথম দিন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে শুকনা খাবার দেওয়া হয়েছে। যাদের বাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে, তাদের নিজস্ব জায়গায় নতুন করে ঘর নির্মাণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হচ্ছে। এ ছাড়া জনগণের চলাচলের জন্য দ্রুত একটি অস্থায়ী কাঠ বা বাঁশের সেতু নির্মাণের লক্ষ্যে আজ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পরিদর্শনে পাঠানো হয়েছে।’

ইয়াছিন মোহাম্মদ সিথুন, নীলফামারী