ইউএনওর গাড়ি আটকে বর ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা, পাঁচ জনকে জেল-জরিমানা
নওগাঁর আত্রাইয়ে সপ্তম শ্রেণির ১২ বছর বয়সী এক শিশুর বাল্যবিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। তবে এ বিয়ে বন্ধ করতে গিয়ে বরযাত্রীদের হামলার মুখে পড়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান। এ সময় ইউএনওর সরকারি গাড়ি আটকে বরকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন বরপক্ষের লোকজন। গতকাল শনিবার (২৯ আগস্ট) বিকেলে উপজেলার বিশা ইউনিয়নের সমাসপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পরে অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্সের সহায়তায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে বর, কনেসহ তিনজনকে আটক করা হয় এবং পাঁচজনকে জেল-জরিমানা করা হয়।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, শনিবার দুপুরে সমাসপাড়া এলাকায় ১২ বছর বয়সী সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক ছাত্রীর সঙ্গে আল আমিন নামের এক যুবকের বিয়ের আয়োজন করা হয়। খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত ঘটনাস্থলে গিয়ে বিয়ে বন্ধ করে দেন। পরে বাল্যবিয়ের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বর আল আমিনকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার সময় বরযাত্রীরা ইউএনওর গাড়ির গতিরোধ করেন। এ সময় প্রায় ৩০ জন বরযাত্রী উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পুলিশের ওপর অতর্কিত হামলার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তারা আটক বরকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে আত্রাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অতিরিক্ত পুলিশ সদস্যদের নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে বর, কনেসহ তিনজনকে আটক করা হয়।
এদিকে এ বাল্যবিয়ের অনুষ্ঠানে সমাসপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সভাপতি মুনিরুল জামান মুনিরসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের উপস্থিতি ও বাল্যবিয়েতে অংশগ্রহণের বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া মুনিরুল জামান মুনিরের ইন্ধনেই বরপক্ষ ইউএনওর গাড়িতে হামলা ও বরকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ করেছেন গ্রামবাসীদের একাংশ।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সমাসপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সভাপতি মুনিরুল জামান মুনির বলেন, বিয়েটা আরও দুই বছর আগে হয়েছে। আনুষ্ঠানিকতা বাকি ছিল। বরপক্ষের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক থেকে সেখানে গিয়েছি। পরে ইউএনও এসে বিয়ের অনুষ্ঠানটা বন্ধ করে দিলে ঝামেলা সৃষ্টি হয়। আমি উপজেলা প্রশাসনকে সহযোগিতা করেছি। হামলায় ইন্ধনের অভিযোগটি সঠিক নয়।
আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে বাল্যবিয়েটি বন্ধ করি। বরকে আটক করে নিয়ে আসার সময় বরপক্ষের লোকেরা আমাদের গাড়ি আটকে দেয় এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে তারা পুলিশ ও প্রশাসনের লোকজনের ওপর হামলার চেষ্টা করে এবং আটক ব্যক্তিকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালায়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং আত্রাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুব আলমের নেতৃত্বে অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সরকারি কাজে বাধা প্রদান এবং পুলিশ ও স্টাফের ওপর আক্রমণের চেষ্টা করার অভিযোগে বর-কনেসহ প্রথমে তিনজনকে আটক করা হয়। পরবর্তীতে আরও চারজনকে আটক করা হয়।
আজ রোববার (৩০ আগস্ট) সকালে আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, গতকালের ঘটনায় বাল্যবিবাহ সম্পাদনের অপরাধে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে বরের বাবা মো. ইয়ানুস শেখকে ২০ হাজার টাকা, কনের বাবা জুয়েলকে ২০ হাজার টাকা এবং সরকারি কাজে বাধা প্রদান, আসামি ছিনতাইয়ের চেষ্টা, মোবাইল কোর্ট পরিচালনার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্য, পেশকার ও গ্রাম পুলিশের ওপর আক্রমণের চেষ্টার অপরাধে সমাজপাড়া গ্রামের মান্নানকে এক বছর, একই গ্রামের মো. রাব্বি শেখকে ছয় মাস এবং মো. মাহাতাব আলীকে এক মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। এছাড়াও বর ও কনের বাবার কাছ থেকে বাল্যবিবাহ সংক্রান্ত আইন মেনে চলার জন্য মুচলেকা নেওয়া হয়।

আসাদুর রহমান জয়, নওগাঁ