একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় এমআরটি লাইন-৫ প্রকল্প
রাজধানীর পশ্চিমাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলকে পরিবেশবান্ধব গণপরিবহণ ব্যবস্থার আওতায় সংযুক্ত করতে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-৫-এর সাউদার্ন রুট নির্মাণে প্রকল্প গ্রহণ করেছে সরকার।
‘ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (লাইন-৫) : সাউদার্ন রুট’ শীর্ষক প্রকল্পটি বর্তমানে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বিবেচনা ও অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সচিবালয়ে অনুষ্ঠেয় চলতি অর্থবছরের (২০২৬-২৭) একনেকের তৃতীয় সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। একনেকের চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সভায় সভাপতিত্ব করবেন।
ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (লাইন-৫), সাউদার্ন রুটের প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. আবদুল ওয়াহাব আজ বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) বলেন, প্রকল্পের প্রয়োজনীয় সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে। এটি পরবর্তী একনেক সভায় উপস্থাপন করা হবে।
আবদুল ওয়াহাব বলেন, ‘প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত একটি এমআরটি করিডোর চালু হবে। এর মাধ্যমে টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজ গেট, আসাদ গেট, শুক্রাবাদ, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও, আফতাব নগর, আফতাব নগর সেন্টার, আফতাব নগর ইস্ট ও নাসিরাবাদ হয়ে গণপরিবহন সংযোগ স্থাপিত হবে।’
সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক বিভাগের অধীনে সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩৩ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত।
প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি অর্থায়ন থাকবে ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। আর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও দক্ষিণ কোরিয়ার ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ড (ইডিসিএফ) থেকে প্রকল্প ঋণ হিসেবে পাওয়া যাবে ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি ১০ লাখ টাকা।
প্রকল্পের আওতায় মূল এমআরটি লাইন ও স্টেশন নির্মাণ, ডিপোর সিভিল ও ভবন নির্মাণকাজ, বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক ব্যবস্থা, রেলওয়ে ব্যবস্থা, রোলিং স্টক এবং ডিপো সরঞ্জাম স্থাপন করা হবে। এ ছাড়া ইউটিলিটি স্থানান্তর, পরামর্শক সেবা, ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসনসহ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়ক অবকাঠামোও নির্মাণ করা হবে।
প্রস্তাবিত রুটটি এমআরটি লাইন-৫-এর নর্দার্ন রুট এবং এমআরটি লাইন-১-এর সঙ্গে সংযুক্ত হবে। এর ফলে যাত্রীরা বিভিন্ন এমআরটি করিডোরের মধ্যে সহজে স্থানান্তর করতে পারবেন এবং সমন্বিত গণপরিবহণ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করতে পারবেন।
পরিকল্পনা কমিশন তাদের সুপারিশে বলেছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিম করিডোরের মধ্যে যোগাযোগ সহজ হবে এবং ঢাকাবাসী পরিবেশবান্ধব গণপরিবহণ ব্যবস্থায় উন্নততর সুবিধা পাবেন।
পরিকল্পনা কমিশন আরও বলেছে, অন্যান্য এমআরটি লাইনের সঙ্গে আন্তঃসংযোগের ফলে যাত্রীরা কম সময়ে বিভিন্ন করিডোরে যাতায়াত করতে পারবেন। একই সঙ্গে এটি রাজধানীর যানজট কমাতেও ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্পটি অনুমোদনের আগে কয়েক দফা পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রথমে সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক বিভাগ ৫৪ হাজার ৬১৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে প্রকল্পটি ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাব করে। ২০২৪ সালের ২৩ এপ্রিল প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করা হয়।
পরে প্রকল্প ব্যয় কমিয়ে ৪৭ হাজার ৭২১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয় এবং বাস্তবায়নকাল ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পুনর্নির্ধারণ করা হয়। ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি আরেকটি পিইসি সভায় সংশোধিত প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করা হয়।
পরবর্তীতে প্রকল্পটি পুনর্গঠন করে ব্যয় ধরা হয় ৪৭ হাজার ৬৪৪ কোটি ৮১ লাখ টাকা। এরপর ২০২৬ সালের ১৬ জুলাই অনুষ্ঠিত পর্যালোচনা সভার পর প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় আরও ২ হাজার ১৪১ কোটি ৪ লাখ টাকা কমিয়ে বর্তমান ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পের সবচেয়ে বড় বরাদ্দ ১৭ হাজার ৭৩৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা বা মোট ব্যয়ের ৩৮ দশমিক ৯৮ শতাংশ মূল লাইন ও স্টেশন নির্মাণ এবং ডিপোর সিভিল ও ভবন নির্মাণকাজে ব্যয় হবে।
বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক কাজ এবং রেলওয়ে ব্যবস্থায় ব্যয় হবে ১৩ হাজার ২৫৮ কোটি ৪৯ লাখ টাকা বা মোট ব্যয়ের ২৯ দশমিক ১৪ শতাংশ। রোলিং স্টক ও ডিপো সরঞ্জামের জন্য প্রয়োজন হবে ৪ হাজার ৮২১ কোটি ২৪ লাখ টাকা বা ১০ দশমিক ৬০ শতাংশ।
ভূমি অধিগ্রহণ, পুনঃঅধিগ্রহণ ও পুনর্বাসনে ব্যয় হবে ৪ হাজার ৯৭৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা, যা প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ১০ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
এডিবির কারিগরি সহায়তা কর্মসূচির আওতায় সম্পন্ন করা সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ২০২২ সালের অক্টোবরে শেষ হয়। সমীক্ষায় প্রকল্পটিকে কারিগরি, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগতভাবে বাস্তবসম্মত হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে ১২ শতাংশ ডিসকাউন্ট রেটের ভিত্তিতে প্রকল্পটির এনপিভি ৩৫ হাজার ১৬১ কোটি টাকা, বিসিআর ২ দশমিক ৪১ শতাংশ এবং আইআরআর ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ।
পরিকল্পনা কমিশন বলেছে, প্রকল্পটি পরিবেশবান্ধব গণপরিবহণ সম্প্রসারণের পাশাপাশি রাজধানীর যানজট নিরসনে সহায়তা করবে। এ কারণে একনেকের অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ৫০ কোটি টাকার বেশি হওয়ায় সংশ্লিষ্ট সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী এটি একনেকের অনুমোদনের জন্য উপযুক্ত।’

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)