যুদ্ধ, এআই চ্যালেঞ্জ ও সংকট নিয়ে শুরু জাতিসংঘ অধিবেশন, অনন্য উচ্চতায় বাংলাদেশ
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি, রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ঝুঁকি এবং খোদ জাতিসংঘের অস্তিত্ব রক্ষার সংকটকে সামনে রেখে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে শুরু হয়েছে সংস্থাটির সাধারণ পরিষদের ৮১তম বার্ষিক অধিবেশন।
নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া সাধারণ বিতর্কে বিশ্বের প্রায় ১৩০টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান অংশ নিচ্ছেন। এবারের অধিবেশনে জাতিসংঘের বিভিন্ন কর্মসূচিতে বাজেট ছাঁটাই, সংস্থার শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তনের ইস্যুটি আলোচনায় আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে পরাশক্তিগুলোর সম্পর্কের টানাপোড়েনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা এখন মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, যা বিশ্বনেতাদের বক্তব্যে গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পাবে।
এবারের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।
বৈশ্বিক সংকট ও আর্থিক অনিশ্চয়তা
দ্বিতীয় মেয়াদে মসনদে বসার পর আবারও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ইতোমধ্যে জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গ সংস্থা থেকে ট্রাম্পের অনুদান প্রত্যাহার এবং উচ্চ মাত্রায় পারস্পরিক শুল্কারোপের সিদ্ধান্তে বিশ্ব অর্থনীকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। এ ছাড়া জাতিসংঘের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের বকেয়া চাঁদা ঘিরে দেখা দিয়েছে সংকট। যদিও চলতি সপ্তাহেই ৭২৫ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে ওয়াশিংটন, তবুও সংস্থার কাছে দেশটির বকেয়া এখনো এক বিলিয়ন ডলারের বেশি।
অন্যদিকে, জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ চলতি বছরই শেষ হতে চলেছে। নতুন নেতৃত্বের অনিশ্চয়তা এবং ট্রাম্পের অব্যাহত সমালোচনার মুখে বহুজাতিক এই সংস্থাকে অত্যন্ত সংকটজনক অবস্থায় দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং জাতিসংঘের অধিবেশন এড়িয়ে ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসতে যাওয়ার বিষয়টি। এতে বিশ্বমঞ্চে জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে।
ভূ-রাজনীতি : মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন যুদ্ধ
মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি এবং চার বছর পেরিয়ে যাওয়া ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধও কাঁপাবে জাতিসংঘ ভবন। ওয়াশিংটন ভিসা বাতিল করায় ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস সরাসরি উপস্থিত থাকতে না পারবেন না এবারের অধিবেশনে। তবে তিনি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বক্তব্য দেবেন। অন্যদিকে, নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়ার ভেটো ক্ষমতার কারণে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে জাতিসংঘ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে না পারলেও, ব্ল্যাক সি-তে শস্য ও জ্বালানি পরিবহণ স্বাভাবিক করতে জোর তাগিদ দিচ্ছেন মহাসচিব গুতেরেস।
এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক অবস্থান
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের শুরু থেকেই অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও গৌরবের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলাদেশ। এর পেছনে রয়েছে দুটি বড় কারণ—একটি হলো অধিবেশনের পুরো কার্যক্রমের সভাপতিত্ব করছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, যিনি গত জুনে সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। দ্বিতীয়টি হলো সরকারপ্রধান হিসেবে তারেক রহমানের প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশগ্রহণ। নতুন গণতান্ত্রিক ধারায় যাত্রার পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেবেন। ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ বিতর্ক পর্বে তিনি প্রথম ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করবেন। জাতিসংঘের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ শেষে আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর দেশের উদ্দেশে রওনা করবেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরে দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, আইনের শাসন, জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়নের পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের জোরালো দাবি বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা হবে। একই অধিবেশনে একাধারে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্ব এবং প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য ও গর্বের অধ্যায় হিসেবে যুক্ত হয়েছে।
এদিকে, বর্তমানে বাংলাদেশে ১৩ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে বাংলাদেশ আয়োজিত একটি বিশেষ ইভেন্টে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জোরালো সহযোগিতা আহ্বান করবেন বলে জানা গেছে।

জাকের হোসেন, নিউইয়র্ক থেকে