রাজবাড়ীতে যন্ত্রে ধান রোপণ, কমছে কৃষকের খরচ
কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে শ্রমিক সংকট ও উৎপাদন খরচ কমিয়ে ধান চাষে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে রাজবাড়ীতে। চলতি আমন মৌসুমে জেলার ১৬টি রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ৩৬৩ একর জমিতে ধানের চারা রোপণ করা হয়েছে। এতে কম সময়ে ও কম খরচে ধান রোপণের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগও সৃষ্টি হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক ভুট্টা ও গম উন্নয়ন কেন্দ্র (সিমিট) ও সিজিআইএআর-এর ‘স্কেলিং ফর ইমপ্যাক্ট’ কর্মসূচির আওতায় রাজবাড়ীতে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ধান রোপণ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, চারা উৎপাদন উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং রাইস ট্রান্সপ্লান্টার চালক ও কৃষিযন্ত্র মেরামতকারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রচলিত পদ্ধতিতে হাতে ধানের চারা রোপণে বেশি শ্রমিক, সময় ও অর্থের প্রয়োজন হয়। আমন মৌসুমে শ্রমিক সংকট এবং মজুরি বেড়ে যাওয়ায় অনেক কৃষককে বাড়তি খরচ গুনতে হয়। এর বিপরীতে রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে অল্প সময়ে বেশি জমিতে চারা রোপণ করা সম্ভব। এতে শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা কমার পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদন খরচও সাশ্রয় হচ্ছে।
বালিয়াকান্দির এক কৃষক জাকির হোসেন জানান, আগে ২২ শতাংশ জমিতে ধানের চারা রোপণ করতে তিনজন শ্রমিক প্রয়োজন হতো। প্রতিজনের মজুরি ছিল ৬০০ টাকা। এর সঙ্গে খাবার বাবদ আরও ২০০ টাকা করে খরচ হতো। সব মিলিয়ে ওই পরিমাণ জমিতে ধানের চারা রোপণে প্রায় ২ হাজার ৪০০ টাকা খরচ হতো। বর্তমানে একই জমিতে রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে মাত্র ৮০০ টাকায় চারা রোপণ করা যাচ্ছে।
বালিয়াকান্দির নারী উদ্যোক্তা রজিয়া বেগম রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে কৃষকদের সেবা দেওয়ার পাশাপাশি নিজেও আয় করছেন। তিনি বলেন, আগে ধানের চারা রোপণের জন্য কৃষকদের শ্রমিকের ওপর নির্ভর করতে হতো। শ্রমিক সংকট ও বাড়তি মজুরির কারণে সময়মতো চারা রোপণ করা কঠিন হয়ে পড়ত। এখন ২২ শতাংশ জমিতে মাত্র ৮০০ টাকায় যন্ত্রের মাধ্যমে ধান রোপণ করা যাচ্ছে। এতে কৃষকের খরচ কমছে, পাশাপাশি উদ্যোক্তা হিসেবে তারও আয় করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
রজিয়া বেগম আরও বলেন, সিমিট ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কার্যক্রম তার দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করেছে। তবে এ কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করতে হলে মানসম্মত চারা উৎপাদন, সময়মতো চারা সরবরাহ, দক্ষ যন্ত্রচালক তৈরি, যন্ত্রের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং কৃষকদের মধ্যে আরও সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
সিমিটের কর্মকর্তারা জানান, কৃষিকে আধুনিক করতে শুধু কৃষিযন্ত্র সরবরাহ করলেই হবে না। এর পাশাপাশি প্রয়োজন মানসম্মত চারা, প্রশিক্ষিত অপারেটর ও মেকানিক এবং স্থানীয় পর্যায়ে নির্ভরযোগ্য কৃষিসেবা। এ উদ্যোগের মাধ্যমে নারী ও তরুণদের কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
এ বিষয়ে সোমবার (৫ অক্টোবর) রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার শালমারায় একটি মাঠ দিবস অনুষ্ঠিত হয়েছে। মাঠ দিবসে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ধান রোপণের সুবিধা, কৃষকের সময় ও খরচ সাশ্রয়, স্থানীয় পর্যায়ে কৃষিসেবা সম্প্রসারণ এবং নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ফরিদপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মো. খায়ের উদ্দিন মোল্লা। বিশেষ অতিথি ছিলেন সিমিট বাংলাদেশের বিজ্ঞানী ও ট্রেনিং ম্যানেজার ড. পিভিএল ভারতী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিমিটের যশোর অঞ্চলের সমন্বয়ক কৃষিবিদ মো. জাকারিয়া হাসান।
মাঠ দিবসে স্থানীয় কৃষক ও উদ্যোক্তারা যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ধান রোপণের সুবিধা ও খরচ সাশ্রয়ের বিষয় তুলে ধরেন। একই সঙ্গে কৃষিযন্ত্রের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশের সহজলভ্যতা এবং দ্রুত মেরামতসেবা নিশ্চিত করা নিয়ে তারা সংশয় প্রকাশ করেন। তাদের মতে, এসব বিষয় নিশ্চিত করা গেলে কৃষকদের মধ্যে যন্ত্রের ব্যবহার আরও বাড়বে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, শ্রমিক সংকট, শ্রমের মূল্য বৃদ্ধি এবং সময়মতো চাষাবাদ সম্পন্ন করার প্রয়োজনীয়তার কারণে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চলতি আমন মৌসুমে রাজবাড়ীতে ১৬টি রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে ৩৬৩ একর জমিতে ধান রোপণকে এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

মো. কবির হোসেন, রাজবাড়ী