কমান্ডার আবদুর রউফ আর নেই
ঐতিহাসিক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম অভিযুক্ত ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক কমান্ডার (অব.) আবদুর রউফ (৮৩) আর নেই। আজ শুক্রবার ভোর ৫টার দিকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
আবদুর রউফ স্ত্রী, এক ছেলে ও দুই মেয়ে এবং নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে ভৈরবের সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
আবদুর রউফের চাচাতো ভাই ভৈরব প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মনসুর এনটিভি অনলাইনকে জানান, আজ শুক্রবার জুমার নামাজের পর ভৈরবের ভৈরবপুর ঈদগাহ মাঠে প্রথম জানাজা হবে। পরে ঢাকায় একাধিক জানাজা শেষে রাজধানীর বনানীতে নৌবাহিনীর কবরস্থানে তাঁর লাশ দাফন করা হবে।
একনজরে আবদুর রউফ : ১৯৩৩ সালের ১১ নভেম্বর কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার ভৈরবপুর গ্রামে আবদুর রউফের জন্ম। বাবা আলহাজ আবদুল লতিফ ছিলেন স্থানীয় পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান। ছাত্রজীবনে রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন আবদুর রউফ। ১৯৫১-৫২ সালে তিনি ছিলেন ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক। ১৯৫৩-৫৪ সালে তিনি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৫৫-৫৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে এমএ পাস করার পর আবদুর রউফ শিক্ষকতায় যোগ দেন। ১৯৬১ সালে বিএড পাস করার পর উপাধ্যক্ষ হিসেবে ঢাকার শাহীন স্কুলে যোগ দেন। ১৯৬২ সালে যোগ দেন পাকিস্তান নৌবাহিনীতে। সেখানে কর্মরত থাকা অবস্থায় স্বাধীন বাংলা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত হন। ১৯৬৮ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ১৪ মাস কারাগারে থাকার পর ১৯৬৯ সালে গণ-অভ্যুত্থানের ফলে মুক্তি পান। এর পর তিনি নরসিংদী কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে তাঁর অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বাধীন ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়নের তরুণদের নিয়ে যে বিশেষ গেরিলা বাহিনী গঠিত হয়েছিল, সেই বাহিনীর তিন সদস্যের পরিচালকমণ্ডলীর তিনি ছিলেন অন্যতম সদস্য।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের আগস্ট মাসে আবদুর রউফ পুনরায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যোগ দেন এবং নৌবাহিনীর পুনর্গঠনে বিশেষ অবদান রাখেন। ১৯৭৩ সালে তিনি কমান্ডার পদে উন্নীত হন। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর তৎকালীন সামরিক সরকার তাঁকে কারারুদ্ধ করেন। ১৯৭৬ সালে কারামুক্তির পর তিনি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বরে তিনি পপুলেশন সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের (পিএসটিসি) প্রধান নির্বাহী হিসেবে যোগ দেন। ১৯৯৩ সালে গণফোরাম গঠনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন গণফোরাম সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য। মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ২০১৩ সালে বাংলা একাডেমি তাঁকে সম্মানসূচক ফেলোশিপ দেয়।

মোস্তাফিজ আমিন, ভৈরব