টাকার অবমূল্যায়ন চায় না এফবিসিসিআই
প্রবাসী আয় বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রা (ডলার) পর্যাপ্ত থাকার কথা জানিয়ে বিনিময় হার নতুন করে না বাড়ানোর অনুরোধ করেছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি (এফবিসিসিআই)। একই সঙ্গে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) আকার ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার দাবি তুলেছে সংগঠনটি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকে আজ সোমবার (৬ এপ্রিল) সংগঠনটির প্রশাসক আবদুর রহিম খানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল একগুচ্ছ লিখিত প্রস্তাব তুলে দেয়।
টাকার মান প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভবনের নিচে এফবিসিসিআইয়ের মহাসচিব আলমগীর হোসেন বলেন, ডলারের অভাব না থাকায় বিনিময় হার না বাড়ানোর কথা বলছি। টাকার মান যেন আর না কমানো হয়।
গভর্নর বলেছেন, দেশে ডলারের অভাব নেই। তাই এক্সচেঞ্জ রেট বাড়ানোর সুযোগ নাই। কেউ যদি বাড়িয়ে দেয়, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তহবিল বাড়ানোর জরুরি জানিয়ে আলমগীর হোসেন বলেন, রপ্তানি খাতকে সহযোগিতা করতে ইডিএফ গঠন করা হয়। বর্তমানে তার আকার কমিয়ে দুই বিলিন ডলারে পৌঁছেছে। সেখান থেকে বাড়িয়ে তা পাঁচ বিলিয়ন ডলারে নেওয়ার দাবি তুলেছে সংগঠনটি।
আলমগীর হোসেন বলেন, আমরা বলেছি, ধীরে ধীরে কেইস-টু-কেউস বেসিস ধরে ফান্ডের আকার বাড়াতে। ইরান যুদ্ধের কারণে ব্যবসায় ব্যয় বেড়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের নীতি সহায়তার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
সভায় পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করার বিষয়টি আলোচনা হয় জানিয়ে আলমগীর হোসেন বলেন, আমরা বলেছি, আমানতকারী ও ঋণ গ্রহীতা ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য। ব্যাংকিং খাতে যে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা ছিল তা ঠিক করা দরকার। একক গ্রাহক ঋণ সীমা তুলে দেওয়ার দাবি তুলে এফবিসিসিআইর পক্ষ থেকে বলা হয়, এখন তো ব্যবসার খরচ অনেক বেড়ে গেছে। তাই এই সীমা বাড়িয়ে দেওয়া দরকার।
এর আগে বেলা ১১টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকে দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় সুদের হার কমিয়ে এক অঙ্কে নামানো, বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার দাবিসহ একগুচ্ছ প্রস্তাব দিয়েছে এফবিসিসিআই।
এফবিসিসিআই জানায়, বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে বিনিয়োগ ও উৎপাদন ধরে রাখতে জরুরি নীতিগত সমর্থন প্রয়োজন। বৈঠকে সংগঠনটি ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানায়।
সংগঠনটি দাবি করে, অতীতে বিপুল অঙ্কের অর্থ বিদেশে পাচার হওয়ায় অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। সংগঠনটি বিনিয়োগ ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে সুদের হার ধাপে ধাপে তা এক অঙ্কে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করে।
ডলার সংকট মোকাবিলায় বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার ওপর জোর দেয় ব্যবসায়ীরা। ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে ডলার অপব্যবহার ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যের মধ্যে সমন্বয় আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, পুনঃতফসিলকরণ এবং প্রণোদনা প্যাকেজ কার্যকর করার দাবি জানানো হয়। বিশেষ করে ঋণ পুনঃতফসিলের সময়সীমা তিন মাস থেকে বাড়িয়ে ছয় মাস করার প্রস্তাব দেয় এফবিসিসিআই। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ায় উদ্বেগ জানিয়ে সংগঠনটি বলেন, সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বেশি থাকায় উৎপাদন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এমন অবস্থায় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার রয়েছে।
খেলাপি ঋণ কমাতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অনিচ্ছাকৃত খেলাপিদের জন্য পুনর্বাসনমূলক নীতি সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়। প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বাড়াতে প্রণোদনা অব্যাহত রাখা এবং বিদেশগামী শ্রমিকদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার সুপারিশ করে এফবিসিসিআই। একইসঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকিং সুবিধা সম্প্রসারণের দাবি জানানো হয়। শিল্প খাতের ব্যাংকিং সমস্যার দ্রুত সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ডেপুটি গভর্নরের নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেয় সংগঠনটি। এ ছাড়া জ্বালানি ব্যয় কমাতে সোলার শক্তির মতো গ্রিন এনার্জিতে স্বল্প সুদের ঋণ, একক ঋণসীমা ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা এবং রপ্তানিমুখী খাতের জন্য ইডিএফ তহবিলের পরিসর বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়।

নিজস্ব প্রতিবেদক