নানা চ্যালেঞ্জের মুখে বাজেট কঠিন পরীক্ষা নতুন সরকারের
নানামুখী চ্যালেঞ্জ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, তীব্র রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতাসহ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে স্থবিরতার মধ্যেই আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট ঘোষণা করেছে বিএনপি সরকার।
ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র চার মাসের মাথায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ জাতীয় বাজেট এটি। আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের ৫৫তম এ মেগা বাজেট আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন। জাতীয় সংসদে এই অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
দেশের অর্থনীতি চাপের মুখে থাকলেও প্রান্তিক জনগণের কষ্ট কমাতে এবারের বাজেটে বেশকিছু ভালো উদ্যোগসহ প্রত্যাশা থাকছে। এ কারণে আগের বাজেট থেকে এটা ব্যতিক্রমধর্মী বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
বাজেটের আকার ও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এটি বিগত অর্থবছরের বাজেটের (সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা) চেয়ে এক লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বা ১৯ শতাংশ বেশি। বিশাল এই বাজেটের ব্যয় মেটাতে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে রাজস্ব আহরণের প্রধান উৎস জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) একাই তুলতে হবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর বহির্ভূত কর থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং কর ব্যতীত প্রাপ্তি ৬৬ হাজার কোটি টাকা তুলতে হবে। এবারের বাজেটে ঘাটতি থাকছে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি পূরণে সরকার দেশের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এক লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা যোগাড় করবে। এর মধ্যে দেশের ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নেবে এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। বাকী অর্থের জন্য বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হবে। অন্যদিক আকাশচুম্বী জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে এনে মূল্যস্ফীতি সাত দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।
প্রান্তিক মানুষকে স্বস্তি দিতে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা তিন লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা করাসহ প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে করছাড়ের ঘোষণা থাকছে এবারের বাজেটে। থাকছে শিশুখাদ্য আমাদনিতে সুবিধা। দেশি শিল্পের উন্নয়নে থাকছে নানা সুবিধাসহ করছাড়। বৈদিশিক আয়ে রপ্তানিতে বিশেষ সুবিধাসহ ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, প্রযুক্তি ডিভাইজ, মোবাইল সিম, স্বর্ণালঙ্কার ও পরিবেশবান্ধব গাড়িতে থাকছে শুল্ক ছাড়। একইসঙ্গে দেশি শিল্প প্রসারে আমদানিতে থাকছে কঠোরতা। আমদানিকৃত বাইসাইকেল যন্ত্রাংশ, সিগারেট, নিকোটিন জাতীয় পণ্য, তেলচালিত গাড়ি, রডসহ বিলাসী পণ্যে থাকছে বাড়তি কর।
বাজেট পেশের আগে সংসদে প্রবেশের সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সীমাবদ্ধ সম্পদের মধ্যেও দেশের সব স্তরের মানুষের কথা মাথায় রেখে এবং জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফেরাতে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই এই বাজেট তৈরি করা হয়েছে। ভঙ্গুর অবস্থা থেকে অর্থনীতিকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য।
করমুক্ত আয়সীমা বাড়ছে
২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ অর্থবছরের করমুক্ত আয়সীমা রাখা হয়েছে তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা। ২০২৮-২৯ এবং ২০২৯-৩০ অর্থ বছরের করমুক্ত আয়সীমা রাখা হয়েছে চার লাখ টাকা। সবশেষ ২০৩০-৩১ অর্থ বছরের করমুক্ত আয়সীমা রাখা হয়েছে চার লাখ ৫০ হাজার টাকা। তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকার পরের তিন লাখ টাকা আয়ের ওপর কর দিতে হবে ১০ শতাংশ হারে। এরপরের চার লাখ আয়ের ওপর গুণতে হবে আরও ১৫ শতাংশ কর। পরের পাঁচ লাখের ওপর ২০ শতাংশ কর। পরবর্তী ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত মোট আয়ের ওপর ২৫ শতাংশ এবং পরবর্তী ৩৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকার বেশি অবশিষ্ট মোট আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ হারে আয়কর রাখা হয়েছে।
করপোরেট কর অপরিবর্তিত
করপোরেট করহার আগামী পাঁচ বছর অপরিবর্তিত থাকবে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে আগের মতোই পাঁচ শতাংশ ব্যবধান রেখে করপোরেট করহার প্রস্তাব করা হয়েছে। আইপিওর পাশাপাশি সরাসরি তালিকাভুক্ত হয়ে পরিশোধিত মূলধনের ন্যূনতম ১০ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করলে করহার হচ্ছে ২২ দশমিক ৫০ শতাংশ। তবে কোম্পানির সব আয় ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন সম্পন্ন করলে করহার হচ্ছে ২০ শতাংশ। বাজেটে অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার ধরা হয়েছে ২৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। তবে কোম্পানি সব লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে করলে করহার ২৫ শতাংশ। ব্যাংক, বীমা ও ফাইন্যান্স কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে করহার ৩৭ দশমিক ৫০ শতাংশ, তালিকাভুক্ত না হলে করহার হবে আগের মতো ৪০ শতাংশ।
যেসব পণ্যের দাম কমতে পারে
ল্যাপটপ, কম্পিউটার, কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা, ক্যানসারের ওষুধ, ওষুধের কাঁচামাল, বাদ্যযন্ত্র, মোবাইল সিম, স্বর্ণালঙ্কার, দেশীয়ভাবে তৈরি মোবাইল সেট, শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য উপকরণ, লিপস্টিক, মুখ ও ত্বকের ক্রিম, ফেসওয়াশ, প্রিন্টার, মনিটর (৩০ ইঞ্চি পর্যন্ত), ফ্ল্যাশ মেমোরি কার্ড, চার্জার ও চার্জিং স্টেশন, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ট্রাকের চেসিস, বৈদ্যুতিক ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান, সৌর প্যানেল ও যন্ত্রাংশ, পস মেশিন, কম্পোজিট কাগজ ও পেপারবোর্ড, স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট সরঞ্জাম, প্যাকেজিং উপকরণ, বায়োলজিক্যাল সেফটি ক্যাবিনেট, লিথিয়াম-আয়ন ও সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি, মর্গ সরঞ্জাম, কীটনাশক, পোলট্রি, ডেইরি ও মাছের খাদ্যের কাঁচামাল, আমদানিকৃত মাংস, মাছ ও সামুদ্রিক খাদ্যপণ্য, রাইস ব্র্যান তেল, দেশীয়ভাবে সংযোজিত মোটরগাড়ি, সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরা, ফ্লোট গ্লাস, রিফ্র্যাক্টরি সিমেন্ট, কার্পেটের উপকরণসহ শিল্পের কাঁচামাল।
যেসব পণ্যের দাম বাড়বে
আমদানিকৃত বাইসাইকেল ও যন্ত্রাংশ, সিগারেট, নিকোটিন পাউচ, তেলচালিত গাড়ি, ট্রান্সফরমার, ওয়াশিং মেশিন, রড, বিদেশি খাদ্য, বিদেশি আমদানি নির্ভর কাজুবাদাম, বিদেশি পাঙাশের ফিলেট, বিদেশি মধু, বিদেশি সুপারি, লিপ লাইনার, লিপ জেল ও সমজাতীয় পণ্য, বিদেশি গ্যাস সিলিন্ডার, বিদেশি টাইলস, স্যানিটারিওয়্যার ও বেসিন, মোটর, জিপসাম বোর্ড, বিদেশি ফোম, বিদেশি মাইক্রোওয়েভ ওভেন, খেলনা ইত্যাদি।
মূল্যস্ফীতি ও জনজীবনের স্বস্তি
বর্তমানে দেশের মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে চরম সংকটে রয়েছে। বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বিশাল আকারের বাজেটের পরোক্ষ চাপে পণ্যমূল্য আরও বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি থাকে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমিয়ে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় হ্রাস করা নতুন সরকারের জন্য প্রথম ও প্রধান অগ্নিপরীক্ষা।
কষ্টসাধ্য রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা
বাজেটে মোট আয়ের বা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। অথচ বিগত অর্থবছরগুলোতে এনবিআর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বড় অঙ্কের ঘাটতিতে ছিল। করের পরিধি না বাড়িয়ে করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ দিলে বাজেট কাঠামোই ভেঙে পড়তে পারে।
বড় ঘাটতি ও ঋণনির্ভরতা
প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য রেখেছে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংক থেকে সরকার অতিরিক্ত ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যায়। যা বিনিয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাধা সৃষ্টি করবে।
ঋণের সুদ পরিশোধের পর্বতপ্রমাণ চাপ
অতীতের অতিরিক্ত মেগা প্রকল্প এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের কারণে নতুন সরকারকে এই বাজেটে শুধু ঋণের সুদ পরিশোধের জন্যই এক লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে। এই বিশাল ব্যয় বাজেটের এক বড় অংশ গিলে খাবে।
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবায়ন
নতুন সরকারের ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং সামাজিক সুরক্ষার আওতা বাড়ানোর মতো জনপ্রিয় নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিগুলো বাজেটে পাইলট প্রকল্প আকারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু একদিকে জ্বালানি ও সার খাতে ভর্তুকির চাপ, অন্যদিকে পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় এই প্রতিশ্রুতিগুলো সফলভাবে বাস্তবায়ন করা কিছুটা কঠিন হবে।

মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান