উত্ত্যক্তে কমেছে অতিথি পাখি
প্রতিবছর শীতকালে হাজার হাজার মাইল দূরের শীতপ্রধান অঞ্চল থেকে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে অতিথি পাখি। কিন্তু শীত থেকে মুক্তি পেলেও এখানে এসে নানাভাবে উত্ত্যক্ত হতে হচ্ছে তাদের। এ কারণে ক্যাম্পাসের লেকগুলোতে কমছে অতিথি পাখির সংখ্যা।
যে লেকগুলোতে অতিথি পাখি অবস্থান করছে, সেগুলোর আশপাশে কোনো ধরনের উচ্চ শব্দ না করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্দেশনা থাকলেও মানছে না কেউ। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই ক্যাম্পাসে কোনো না কোনো বিভাগ, বিভাগের অ্যালামনাই, হল বা সংগঠনের আনন্দ শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। এ সব শোভাযাত্রায় উচ্চশব্দে বাজানো হয় ঢোল-তবলা-বাঁশি-ভুভুজেলা। লেকের আশপাশ দিয়েই চলে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য উচ্চ শব্দে মাইকিং। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও হর্ন বাজিয়ে মোটরসাইকেল শো-ডাউন দিতে দেখা যায় লেকের পাশের রাস্তাগুলোতে।
গত দুই মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রান্সপোর্ট চত্বরে উচ্চ শব্দে সাউন্ড বক্স, মাইক বাজিয়ে অনুষ্ঠান করতে দেখা গেছে বেশ কয়েকটি সংগঠনকে। অথচ ট্রান্সপোর্ট চত্বরের একেবারে কাছেই যে লেকটি রয়েছে, তাতেই অতিথি পাখির বসবাস সবচেয়ে বেশি।

এ ছাড়া আগে এখানকার শিক্ষার্থীরা অতিথি পাখিদের ব্যাপারে অনেক বেশি সচেতন থাকলেও এখন এটা কমেছে বলে মনে করছেন শিক্ষকরা।
দর্শনার্থীরাও মানছেন না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নির্দেশনা। গাড়ির হর্ন বাজাতে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ঘুরতে আসা অধিকাংশ দর্শনার্থীই মানছেন না এটি। এমনকি লেকের পাড়ে গাড়ি রেখে উচ্চশব্দে গান শুনতেও দেখা যায় কখনো কখনো। দর্শনার্থীরা সঙ্গে আসা শিশুদের কিনে দিচ্ছেন ভুভুজেলা। এগুলো বাজিয়েও অতিথি পাখিদের বিরক্ত করতে দেখা গেছে শিশুদের। লেকের পাড়ে তারকাটার বেড়া থাকলেও বেড়া ডিঙিয়ে অনেকেই চলে যাচ্ছেন পাখির একেবারে কাছাকাছি। পাখিদের উড়ন্ত ছবি তুলতে হাততালি দেওয়া ও ঢিল ছোড়ার ঘটনাও ঘটছে।
এসব বিষয়ে ক্ষোভ জানিয়ে ছাত্র ইউনিয়ন জাবি সংসদের সহসাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম মিতুল বলেন, যে ক্যাম্পাসে পাখিদের প্রতি সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রতিবছর পাখিমেলা হয়, সে ক্যাম্পাসই বিভিন্ন কাণ্ডজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ডে পাখিদের জন্য দিনকে দিন অনিরাপদ হয়ে উঠছে, এটা আসলে মেনে নেওয়া যায় না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাখি-বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এ বছর আগের তুলনায় পাখি অনেক কম এসেছে। লেক ঘুরেও পাওয়া গেছে এর প্রমাণ। গত বছর বোটানিক্যাল গার্ডেন সংলগ্ন লেকটিতে প্রচুর পাখি এলেও এবার এ লেকটিতে পাখি নেই বললেই চলে। ট্রান্সপোর্ট চত্বরসংলগ্ন দুটি লেকের একটিতে অনেক পাখি থাকলেও অন্যটিতে রয়েছে কম।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো শব্দ আমরা যতটুকু তীব্রতায় শুনি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার চেয়ে পশুপাখিরা শুনে কয়েক হাজার গুণ বেশি তীব্রতায়। এ জন্য যে কোনো বিরক্তিকর উচ্চ শব্দ মানুষের চেয়ে পশুপাখির জন্য কয়েক হাজার গুণ বেশি ক্ষতিকর। কারণ তাদের শ্রাব্যতার পাল্লা মানুষের চেয়ে অনেক বেশি।
এ ব্যাপারে এনটিভি অনলাইনের কথা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক পাখি-বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোস্তফা ফিরোজের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমাদের লেকগুলোতে এ বছর আগের চেয়ে অনেক কম পাখি আছে। এ বছর পাখিদের ডিস্টার্বও করা হয়েছে আগের চেয়ে অনেক বেশি। আমাদের প্রধান যে দুইটা লেক আছে- রেজিস্ট্রার ভবনের পূর্বে এবং পশ্চিমে, শুক্র-শনিবারে ওদিকে গাড়িগুলো যায়, এতে প্রচণ্ড ডিস্টার্বেন্স হয়। এ কারণে ওদিকে এখন পাখির সংখ্যা খুবই কম। এতে কোনো দ্বিমত নেই যে, ডিস্টার্বেন্সের কারণেই পাখির সংখ্যা কমছে। লেকের আশপাশে দোকানপাট বসিয়ে এখন রীতিমতো বাজার বসে। এসবের কারণেও পাখিদের সমস্যা হচ্ছে।’
পাখিকে উত্ত্যক্ত করার জন্য শোভাযাত্রাকে দায়ী করে মোস্তফা ফিরোজ বলেন, এগুলো একেবারে বন্ধ করা দরকার। এমনিতে প্রোগ্রাম করুক, কিন্তু শোভাযাত্রা বন্ধ করা দরকার।

আক্ষেপ করে এ অধ্যাপক আরো বলেন, ‘আগে আমাদের শিক্ষার্থীরা পাখির ব্যাপারে অনেক সচেতন ছিল, তারা বাধা দিত পাখিকে কেউ বিরক্ত করলে। এখন আর দেখি না কাউকে প্রতিবাদ করতে।’
এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘আমরা সবাইকে বলেছি, কোনো অবস্থায়ই শোভাযাত্রা শহীদ মিনার অতিক্রম করতে পারবে না। আমরা যদি দেখি কেউ শহীদ মিনার অতিক্রম করছে, তাদের বাধা দেব। এত লোক আসছে এখন ক্যাম্পাসে, কী আর বলব! একটা ব্যবস্থা করতে তো সময় লাগবে। আমরা তো আগে এর সঙ্গে অভ্যস্ত ছিলাম না। আর গাড়িগুলো গেটের কাছে রেখে আসার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছি আমরা, যাতে দর্শনার্থীরা হেঁটে ক্যাম্পাস দেখে। দোকানগুলোও সরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে আমাদের চিন্তা আছে। আমরা এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে সভা ডেকেছি।’

জাবি সংবাদদাতা