বছরজুড়ে আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
গত বছরজুড়েই নানা ঘটনায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাস। শুরুতে ব্লগার হত্যা এবং শেষে শিক্ষকদের সম্মান রক্ষার আন্দোলনসহ নানা ঘটনার জন্ম দিয়ে বিদায় নিয়েছে ২০১৫ সাল।
বছরের শুরুতে অভিজিৎ রায় হত্যা, পয়লা বৈশাখে যৌন হয়রানি, দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ বাতিল, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা এবং বছরের শেষে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘটনা দেশ-বিদেশে আলোচনা সমালোচনার ঝড় তোলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতিও ছিল অনেকটা নীরব। সবখানেই ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগের একক আধিপত্য। আর গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় ছাত্রদল ছিল ক্যাম্পাসে কোণঠাসা। ছাত্রলীগের আতঙ্কে তাঁরা ছিল ক্যাম্পাসছাড়া।
অভিজিৎ রায় হত্যা
২০১৫ সালের শুরুতে নিরুত্তাপ থাকলেও ফেব্রুয়ারি মাসে অমর একুশে বইমেলায় টিএসসি এলাকায় ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যার ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে অমর একুশে বইমেলা থেকে ফেরার পথে রাজু ভাস্কর্যের পাশে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী এই ব্লগার সস্ত্রীক দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন। গুরুতর আহত হন তাঁর স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা। সেখান থেকে তাঁদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে অভিজিৎকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়। এই হত্যার ঘটনায় দেশে-বিদেশে সমালোচনার ঝড় ওঠে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় শিক্ষক ও গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা আন্দোলন শুরু করেন। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের সদস্যরাও এ ঘটনার তদন্তে ঢাকায় আসেন।
বর্ষবরণ উৎসবে নারীদের যৌন হেনস্তা
অভিজিৎ হত্যার ঘটনার পরিসমাপ্তি হতে না হতেই টিএসসিতে ঘটে আরেকটি ন্যক্কারজনক ঘটনা। ১৪ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় পয়লা বৈশাখের উৎসবে গিয়ে যৌন নিপীড়ন, হয়রানি এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হন নারীরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনেই এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনার জন্য দেশ-বিদেশ থেকে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। দোষীদের শাস্তির দাবিতে বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে। আর বাম ছাত্র সংগঠনগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আমজাদ আলীর বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ এনে তাঁর পদত্যাগ দাবি করেন। এ ঘটনায় পৃথকভাবে তদন্ত শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি ও পুলিশ। নববর্ষে যৌন হয়রানির ভিডিওচিত্র দেখে দোষীদের গ্রেপ্তার করা উচিত ছিল এমন প্রতিবেদন দেয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কমিটি। ভবিষ্যতে পয়লা বৈশাখের দিন ওই এলাকার নিরাপত্তায় পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েনসহ আট দফা সুপারিশ সংবলিত প্রতিবেদন হাইকোর্টে জমা দেওয়া হয়। এই ঘটনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় এবং পুলিশের ওপর অনেকাংশে দায় চাপানো হয়। মামলার কোনো আসামিকে শনাক্ত করা যায়নি বলে পুলিশ প্রতিবেদন দেয়, যার প্রতিবাদ জানায় বিভিন্ন সংগঠন।
পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন
বছরের শেষে এসে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এক জরুরি সিন্ডিকেট সভায় পাকিস্তানের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিষয়টি দেশ-বিদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে। সংবাদ সম্মেলনে এ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সাংবাদিকদের অবহিত করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। পাকিস্তানের সঙ্গে করা সব ধরনের চুক্তি এবং একাডেমিক সম্পর্ক স্থগিত করার সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি। একই সঙ্গে সরকারকেও পাকিস্তানের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানান উপাচার্য।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সন্ধ্যার পর প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা
গত বছরের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসংলগ্ন ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সন্ধ্যার পর শিক্ষার্থীদের প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ। সন্ধ্যা নামলেই এই উদ্যানে শুরু হয় নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। এসব ঘটনার বেশির ভাগেরই দায় চাপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর। এ অস্বস্তি থেকে মুক্তি পেতেই সন্ধ্যার পর এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থী সমস্যায় পড়লে তার দায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নেবে না বলেও হলে হলে নোটিশ টাঙিয়ে দেওয়া হয়।
দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ বাতিল
২০১৫ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা নতুন নিয়মে শুরু হয়েছে। ২০১৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ বাতিল করে। সে অনুযায়ী ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে এ নিয়ম চালু হয়েছে। এর বিরুদ্ধে দ্বিতীয়বার ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করলেও কোনো লাভ হয়নি। এমনকি আন্দোলনকারীরা উচ্চ আদালতে গেলে সেখানেও রায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষেই যায়।
আলাদা বেতন স্কেলের দাবিতে শিক্ষকদের আন্দোলন
প্রস্তাবিত অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামোতে বৈষম্য সৃষ্টি করে শিক্ষকদের অসম্মান করা হয়েছে এমন অভিযোগ তুলে আন্দোলন শুরু করে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন। এর নেতৃত্বে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। পরে সারা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে শিক্ষকদের দফায় দফায় বৈঠক হয়, আন্দোলনে বিরতি দেন শিক্ষকরা। কিন্তু এই বেতন কাঠামোর গেজেট প্রকাশ হওয়ার পর বছরের শেষ দিকে আবারও আন্দোলনে নামেন শিক্ষকরা। সেখানে তাঁদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করা হয়নি অভিযোগ করে বছরের শেষে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা এবং অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করা হয়েছে। শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন স্কেল ও গ্রেড সমস্যা নিরসনের দাবি আদায় না হলে বাংলাদেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় একত্রে বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দেন শিক্ষকরা।
ছাত্রলীগের একক আধিপত্য
বছরজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতিও ছিল নিরুত্তাপ। সবখানেই ছাত্রলীগের একক আধিপত্য। ভিন্ন মতাদর্শের অনেককেই হল থেকে বের করে দিতে দেখা গেছে। বছরের মাঝামাঝি সময়ে পুরোনো কমিটি বিদায় নিলেও এখনো গঠিত হয়নি ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি। বছরের শেষের দিকে এসে হলে ছাত্র ওঠানো নিয়ে গ্রুপে গ্রুপে সংঘর্ষে জড়াতে দেখা গেছে।
কোণঠাসা ছিল ছাত্রদল
ছাত্রদল গত বছরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছিল কোণঠাসা। গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এ বছরও তারা ক্যাম্পাসে আসতে পারেনি। এখনো গঠিত হয়নি বিশ্ববিদ্যালয় ও হল কমিটি। ফলে দিন দিন ক্যাম্পাসে দুর্বল হচ্ছে ছাত্রদল। এ বছর বাম ছাত্র সংগঠনগুলোরও দৈন্যদশা কাটেনি। তাদের কর্মসূচি ছিল একেবারেই হাতেগোনা। তাদের কর্মী সংকটের বিষয়টিও ছিল লক্ষণীয়। অভিজিৎ হত্যা এবং টিএসসির যৌন হয়রানির ঘটনায় তাদের সরব আন্দোলন লক্ষ করা গেলেও বছর শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হলে আইডি কার্ড নবায়নে তিন হাজার ৬০০ টাকা ফি নির্ধারণের বিরুদ্ধে জোরালো আন্দোলন করতে ব্যর্থ হয় তারা।
ভর্তি পরীক্ষায় সক্রিয় ছিল জালিয়াতচক্র
এ বছরের ভর্তি পরীক্ষাও জালিয়াতিমুক্ত করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। প্রথম দিনের ‘খ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা জালিয়াতিমুক্ত হলেও পরবর্তী পরীক্ষাগুলোতে সক্রিয় হয়ে ওঠে জালিয়াতচক্র। ভর্তি-ইচ্ছুক থেকে শুরু করে বেশ কয়েকজন জালিয়াতচক্রের সদস্যকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা