হলি ক্রসের ৭৫ বছর পূর্তিতে নবীন ও প্রবীণের মিলনমেলা
রাজধানীর হলি ক্রস গার্লস হাই স্কুল বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যা দীর্ঘদিন ধরে নারী শিক্ষার প্রসার, নারীর ক্ষমতায়ন ও সমাজে শিক্ষিত নারীদের গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিদ্যালয়টি ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে সিস্টার অগাস্টিন মেরী ও হলি ক্রস সংঘের নিবেদিতপ্রাণ সিস্টারদের দ্বারা মাত্র দু‘জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে ইংরেজি মাধ্যম কিন্ডারগার্টেন দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। এরপর তা দ্রুত বিস্তৃত হয়ে পূর্ণাঙ্গ বালিকা বিদ্যালয়ে পরিণত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি মর্যাদাপূর্ণ ও আদর্শ শিক্ষা কেন্দ্রে পরিণত হয়। এই স্কুলে শিক্ষা, শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়ে ছাত্রীদের যোগ্য ও আত্মবিশ্বাসী নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।
শিক্ষা, ঐতিহ্য ও গৌরবের সঙ্গে যাত্রা শুরু করে আজ ৭৫ বছর বয়সে পৌঁছেছে হলি ক্রস গার্লস হাই স্কুল। বর্ণাঢ্য আয়োজনে উদযাপিত দেশের এই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৭৫ বছর পূর্তি উৎসব। এই উপলক্ষে তিন দিনের বিশেষ আয়োজনে বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) প্রথম দিনের অধিবেশনের শুরুতেই পবিত্র ক্রুশ সংঘের ফাদার বাসিল আন্তনী মেরী মরো, হলি ক্রস গার্লস হাই স্কুলের প্রথম প্রধান শিক্ষক সিস্টার আগষ্টিন মারীর ম্যুরাল এবং বিদ্যালয়ের হিস্ট্রি ওয়াল উন্মোচন করা হয়।
পরে বিদ্যালয় সংগীত, বিদ্যালয় প্রার্থনা, জুবলির প্রার্থনা, জাতীয় পতাকা ও বিদ্যালয় পতাকা উত্তোলন এবং জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়।
প্রার্থনার মধ্য দিয়ে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সিস্টার কল্পনা কস্তা উক্ত অনুষ্ঠানের উদ্বোধন ঘোষণা করেন। এরপরে ছিল প্রদীপ প্রজ্জ্বলন, চার ধর্মের প্রার্থনা ও কেক কাটা। উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মহাধর্ম প্রদেশের মহামান্য আর্চবিশপ বিজয় এন ডি ক্রুজ।
বিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় ছিল মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এ ছাড়া ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে বর্তমান শিক্ষার্থীদের আঁকা চিত্রকর্মের প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের বিশিষ্ট ব্যান্ডদল ফ্রাঙ্কলিন ও শিরোনামহীন এর পরিবেশনা ছিল মনোমুগ্ধ কর।
তিন দিনের বিশেষ আয়োজনের দ্বিতীয় দিনের প্রথম অধিবেশনে ছিল সৃষ্টিকর্তার প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপনের জন্য পবিত্র খ্রিষ্টযাগ। খ্রিষ্টযাগে পৌরহিত্য করেন ঢাকা মহাধর্ম প্রদেশের মহামান্য আর্চবিশপ বিজয় এন ডি ক্রুজ। এরপর জুবিলি প্রার্থনা, জাতীয় সংগীত ও প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা হয়।
উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভ্যাটিকানের রাষ্ট্রদূত মহামান্য আর্চবিশপ কেভিন স্টুয়ার্ট রেনডল । ( His Excellency Archbishop Kevin Stuart Randall, Apostolic Nuncio to Bangladesh) বিশেষ অতিথিবৃন্দের মূল্যবান বক্তব্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দ্বিতীয় দিনের প্রথম অধিবেশন ।
দ্বিতীয় অধিবেশনে হলি ক্রসের ৭৫ বছরের অনুষ্ঠানের উচ্ছ্বাসে মেতেছেন শিক্ষার্থীরা। দ্বিতীয় অধিবেশনে প্রার্থনা, জাতীয় সংগীত ও প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা হয়। এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. খন্দোকার এহসানুল কবীর।
অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ ছিল বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্য ‘চিত্রাঙ্গদা’ পরিবেশন। বাংলাদেশের খ্যাতনামা নৃত্যশিল্পী শিবলি মোহাম্মদ ও শামীম আরা নিপার পরিবেশিত নৃত্য অনুষ্ঠানকে আরো প্রাণবন্ত করে তুলে।
জীবনের সোনাঝরা দিনের সাথী ছিল প্রিয় প্রাঙ্গন। দীর্ঘদিন পর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, কলরবে স্মৃ্তির ঝাঁপি খুলে বসেন প্রাক্তনরা। হারিয়ে যান অতীতের দিনগুলোতে। কেউ ঘুরে দেখছেন প্রিয় ক্যাম্পাস, কেউ বা প্রিয় বন্ধুদের সঙ্গে তুলছেন ছবি। গল্প-আডডায় হারিয়ে যান অতীতের সোনাঝরা দিনগুলোতে। অনেকে আবেগ ছড়িয়েছেন পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণায়। সকলের কন্ঠেই ছিল গৌরবময় অতীত ধরে রাখার আশাবাদ। দলগত আড্ডায় পুনরায় নবীন রূপ ফিরে পায় হলি ক্রস প্রাঙ্গণ।
তিন দিনব্যাপী বিশেষ আয়োজনের তৃতীয় দিনের অধিবেশনে প্রার্থনা, জাতীয় সংগীত ও প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা হয়। কেউ তারুণ্য পেরিয়ে যৌবনে, আবার কেউ জীবনের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে–সবাই যেন মিশেছে ৭৫ বছরের পথ চলার এক স্রোতে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হলি ক্রস সংঘের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট সিস্টার জয়ও গ্রেডি। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, সাবেক-বর্তমানের এই মিলনমেলা ভবিষ্যতে শিক্ষা ক্ষেত্রে আরও কার্যকর অবদান রাখবে। আড্ডা-স্মৃ্তিচারণের ফাঁকে ছিল সাবেক- বর্তমানদের সংগীত আয়োজন। কর্মজীবনের ব্যস্ততাকে ছুটি দিয়ে এই আয়োজনে মেতে ওঠেন সবাই। এমন আয়োজন নিয়মিত প্রয়োজন বলে মনে করেন সাবেক শিক্ষার্থীরা। যেখানে অগ্রজদের অভিজ্ঞতা চলার পথের পাথেয় হবে নবীনদের। বিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রায় পাশে থাকারও আশ্বাস দেন প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা।
সমাজের বড় বড় ব্যক্তিত্বরা পেরিয়েছেন এর চৌকাঠ। অর্জনের খাতায় প্রতি বছর যোগ হচ্ছে কৃতি শিক্ষার্থীদের সেরা ফলাফলের গল্প। প্রাক্তনদের অর্জনের গর্বের ঝুলি মেলে ধরেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সিস্টার কল্পনা কস্তা। সমাজের বিশেষ ক্ষেত্রে অবদানের জন্য তাদের সম্মাননা প্রদান করা হয়। প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী স্নাতা শেহরিনের প্রযোজনায় পরিবেশিত হয় মনোমুগ্ধকর কথক নৃত্য। অনুষ্ঠানে নাদিয়া ডোরা ও প্রীতম হাসানের কনসার্ট পরিবেশিত হয়। শেষদিনে দিনভর নানা আয়োজনের অংশ হিসেবে র্যাফেল ড্রও ছিল।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সিস্টার কল্পনা কস্তা সষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে তিন দিনব্যাপী চলা অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক