রাজনৈতিক চাপমুক্ত সাংবাদিকতা চায় তরুণ প্রজন্ম
‘শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ গঠন : মানবাধিকার, উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রসার’ -এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আজ বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি নিয়ে প্রতিবছর নতুন করে গুরুত্ব পায় দিনটি।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে দিবসটি। এ উপলক্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা গেছে ভিন্নধর্মী ভাবনা ও প্রত্যাশা। বিশেষ করে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন, স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং গণমাধ্যমের জবাবদিহিতা নিয়ে তারা নিজেদের মতামত তুলে ধরেছেন।
শিক্ষার্থীদের মতে, একটি গণতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম ভিত্তি হলো স্বাধীন গণমাধ্যম। তবে বাস্তবতায় রাজনৈতিক চাপ, বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাব এবং সরকারঘনিষ্ঠ এজেন্ডা বাস্তবায়নের কারণে অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিকতা তার নিরপেক্ষতা হারায়।
আইন বিভাগের শিক্ষার্থী জিহাদ হোসেন বলেন, আমরা এমন একটি গণমাধ্যম চাই, যেখানে সত্য প্রকাশে কোনো বাধা থাকবে না। সেখানে তরুণ সমাজের কণ্ঠও গুরুত্ব পাবে। ডিজিটাল যুগে তথ্যপ্রবাহ যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি ভুয়া খবর ও বিভ্রান্তির ঝুঁকিও বেড়েছে। তাই স্বাধীন সাংবাদিকতার পাশাপাশি দায়িত্বশীলতাও জরুরি।
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী রায়হান আহমেদ বলেন, সাংবাদিকতা বলতে আমরা বুঝি নিরপেক্ষভাবে তথ্য প্রচার, যেখানে কারও স্বার্থ নয়, সত্যই হবে প্রধান বিষয়। কিন্তু বাস্তবে তা সবসময় দেখা যায় না। এর বড় কারণ, অধিকাংশ সংবাদমাধ্যমের মালিকানা থাকে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও বড় ব্যবসায়ীদের হাতে। ফলে অনেক সময় তাদের স্বার্থ অনুযায়ী সংবাদ প্রচারিত হয়।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী মিরাজ হোসেনের মতে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। মিডিয়া স্বাধীন না হলে সমাজের প্রভাবশালী ও মাফিয়া শ্রেণির লোকেরা রাষ্ট্র ও সমাজকে শোষণের সুযোগ পায়। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত না হলে প্রকৃত স্বাধীনতা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে গণমাধ্যমকে আরও গতিশীল ও বহুমাত্রিক করা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মমিন সরকার বলেন, মালিকপক্ষ ও রাজনৈতিক চাপের কারণে সাংবাদিকরা পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন না। প্রতিনিয়ত এই সীমাবদ্ধতাগুলো প্রত্যক্ষ করতে হয়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আইন সংস্কার, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা, মিডিয়া মালিকানায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশ্লেষকদের মতে, সাংবাদিকতা পেশা পুরোপুরি স্বাধীন না হলে ভবিষ্যতে এ পেশা আরও বড় হুমকির মুখে পড়বে। একই সঙ্গে গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকেও বাংলাদেশের অবস্থান আরও নিচে নেমে যেতে পারে। তাই দেশজুড়ে স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক মো. খাদেমুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যম পুরোপুরি স্বাধীন নয়। কারণ এর ওপর নানা ধরনের চাপ থাকে। এসব চাপ অতিক্রম করে স্বাধীনভাবে কাজ করা অত্যন্ত কঠিন। বাংলাদেশের গণমাধ্যম এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি, যাকে আমরা পুরোপুরি স্বাধীন বা মুক্ত বলতে পারি।
মো. খাদেমুল ইসলাম আরও বলেন, সাংবাদিকদের অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। কোনো একটি প্রতিবেদন করতে গেলে অনেক সময় তাদের পেশিশক্তির মুখোমুখি হতে হয়, ভয়ভীতি দেখানো হয়। এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় যে সুরক্ষা প্রয়োজন, তা অনেক সময় তারা পান না।
সাংবাদিকদের সুরক্ষার বিষয়ে মো. খাদেমুল ইসলাম বলেন, সরকারের উচিত এমন আইন প্রণয়ন করা, যা সাংবাদিকদের কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা দেবে। পাশাপাশি চাকরির নিশ্চয়তা, উপযুক্ত বেতন এবং সাংবাদিকতা পেশাকে যথাযথ সম্মান দেওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। এসবের ঘাটতির কারণেই সাংবাদিকরা সবসময় এক ধরনের চাপের মধ্যে থাকেন।
উল্লেখ্য, ইউনেস্কোর ২৬তম সাধারণ অধিবেশনের সুপারিশের ভিত্তিতে ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘর সাধারণ সভায় ৩ মে-কে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এরপর থেকেই বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এ দিনে সাংবাদিকতার স্বাধীনতার মৌলিক নীতিমালা পুনর্ব্যক্ত করা, বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মূল্যায়ন, স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ প্রতিহত করার অঙ্গীকার এবং দায়িত্ব পালনে জীবন উৎসর্গকারী সাংবাদিকদের স্মরণ করা হয়।

আবু ছালেহ শোয়েব, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়