নববর্ষ
আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ
আমি আশা করছি এবার অত্যন্ত নিরাপদে নববর্ষ পালিত হবে। কারণ সাম্প্রতিক কিছু আত্মঘাতী জঙ্গি হামলার পরিপ্রেক্ষিতে আমার একটা ভীতি কাজ করছে, একটা আশঙ্কা কাজ করছে। কিন্তু আমার এ বিশ্বাসটাও আছে, যেহেতু মানুষের ভেতর একটা সচেতনতা এসেছে যে আমাদের সমাজ এত সহিংস নয়। আমরা অনেকেই মিলেমিশে থাকি এবং এই সমাজে বহুমত, বহুপথের একটা সম্মেলন বহু আগে থেকেই ঘটেছে। আর পয়লা বৈশাখে আমরা এই বিষয়টাই উদযাপন করি।
আমার মনে হচ্ছে এ বছর অনেক বেশি প্রত্যয় নিয়ে মানুষ নববর্ষ উদযাপন করবে। এটা আমার প্রত্যাশা। আমি এটাই আশা করছি। কারণ এ রকম মাত্র কয়েকটি দিন আছে আমাদের, যে দিনগুলোতে আমরা সকলে মিলে একটা অভিন্ন জায়গায় দাঁড়িয়ে উদযাপন করি, আনন্দ করি। আর এই দিনটা হচ্ছে তারুণ্যের দিন। আমি ঘর থেকে হয়তো বের হব না। কিন্তু অসংখ্য তরুণ ঘর থেকে বেরোবে এবং সারা দিন তারা একটা উদযাপন করবে। তাদের একত্র হওয়ার যে একটা শক্তি আছে, একটা জায়গায় দাঁড়ানোর যে একটা শক্তি আছে।
পয়লা বৈশাখটা কিন্তু প্রকৃতিরই একটা চক্র। ঋতু চক্রের আবর্তনে দিনটা আসে। আমরা প্রকৃতি ভুলে যাই এবং গিয়েছিও আমরা। প্রকৃতি নিধনে আমরা ব্যস্ত। এবার পয়লা বৈশাখে আমার প্রত্যাশা, প্রকৃতি সমন্ধে মানুষের ভেতরে যেন একটু সচেতনতা আসে। এই প্রকৃতি হারিয়ে গেলে আমরা একেবারে অসহায় হয়ে পড়ব। এটা যেন মানুষ বুঝতে পারে।
আমাদের দেশের রাজনীতি, সমাজনীতি কোনো কিছুই রঙের পক্ষে থাকে না। আমাদের রাজনীতি আমাদের কোনো স্বপ্ন দেখায় না। এই পয়লা বৈশাখটা যেন মানুষকে একটু রং দেয়, একটু উজ্জ্বলতা দেয় এবং স্বপ্ন দেখায়। এটিই আমি চাই।
আর রবীন্দ্রনাথ তাঁর বর্ষশেষ কবিতায় বলেছিলেন যে, পুরোনো যা আছে সব যেন উড়ে যায়। আমার কেন যেন প্রতিবছর মনে একটা আশা জাগে যে এবার মানুষ আরেকটু বেশি জাগছে, আরেকটু বেশি জাগছে। এটি হোক। আমি আশা করি যে সমাজের যত সদস্য আছেন, রক্ষণশীল বলুন আর উগ্রবাদী বলুন সবাইকে বুঝতে হবে যে এই বাংলাদেশটা আমাদের সবার। আমরা যে যাই করি, যে মতাদর্শেই বিশ্বাস করি, আমাদের থাকতে হবে বাংলাদেশের ভেতরেই। আমাদের থাকতে হবে সব মানুষকে সঙ্গে নিয়ে। আমাদের থাকতে হবে মানবতার চর্চা করে। আর পয়লা বৈশাখটা হচ্ছে এই বিষয়গুলো আমাদেরকে জানিয়ে দেয় বা ঘোষণা দেয় যে আমরা সবাই এক।
আজকে যদি বাংলাদেশ, সামনে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া চ্যাম্পিয়ন ট্রফিতে কোনো বড় দলকে হারাতে পারে বা ট্রফি জিততে পারে তাহলে রাস্তায় কি শুধু মুসলমানরা বের হবে, নাকি শহরের মানুষ বেরোবে, নাকি শুধু কালো মানুষ বেরোবে, নাকি শুধু লম্বা মানুষ বেরোবে। এ রকম বিভাজন তো আমরা করি না। জয়ের আনন্দে মাদ্রাসার ছাত্ররা বেরিয়ে আসবে। এমনকি বুড়ো মানুষগুলোও রাস্তায় বেরোতে পারে। কারণ একটা জায়গায় আমরা অহংকার চাই। ওই পয়লা বৈশাখটা আমাদের কাছে অহংকারের জায়গা।
আমরা তো আমাদের আপন শক্তি নিয়ে দারিদ্র্য জয় করেছি, আমরা পদ্মা সেতু তৈরি করছি। আমাদের মেয়েরা কাজে ঝুঁকছে। আমাদের গন্ড গ্রামের বা অজপাড়াগাঁয়ের ১৬ বছরের নিচের বাচ্চা মেয়েগুলো আত্মবিশ্বাস নিয়ে ফুটবল খেলে অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। অর্থনীতিতে আমাদের ছেলেমেয়েরা ভালো করছে। এশিয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা একটা শক্তি হয়ে গেছি। এটি তো আমাদের অহংকার। আমি আশা করব, প্রতিবছর পয়লা বৈশাখে আমরা সেই অহংকারটা ঘোষণা করব। অহংকারটি আমাদের আত্মবিশ্বাসী করবে এবং আমাদের সারা বছরের জন্য কিছু পাথেয় দিয়ে যাবে। এইটুকু হলো আমার প্রত্যাশা।
মঙ্গল শোভাযাত্রা যে ইউনেসকো থেকে স্বীকৃতি পেল, এটা আমাদের কাছে বিশাল একটা অর্জনের বিষয়। এই মঙ্গল শোভাযাত্রা পৃথিবীর অনেক জায়গায় হয়। আমি প্রায়ই শুনি, একটা গোষ্ঠী আছে কেন জানি তারা এই বিষয়টা নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ায়। এই বাঙালিত্বকে তারা কিছুতেই গ্রহণ করতে পারছে না। মুসলমান যে বাঙালি হতে পারে এটা তাদের মাথায় আসে না। এই যে মঙ্গল শোভাযাত্রা হচ্ছে এটাকে বলা হচ্ছে হিন্দুদের শোভাযাত্রা। তাহলে কেন ভারতের কোনো শোভাযাত্রা ইউনেসকো থেকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি? বাংলাদেশি শোভাযাত্রাকে কেন স্বীকৃতি দেওয়া হলো? এটা কোনো ধর্মীয় শোভাযাত্রা নয়। এটা হচ্ছে বাঙালির চিরন্তন একটা আনন্দ প্রকাশের এবং নববর্ষকে বরণ করার জন্য শোভাযাত্রা। আমরা সবাই একাত্ম হই এর মাধ্যমে, আমরা সবাই একটা জায়গায় মিলিত হই এবং প্রকৃতিকে আমরা বরণ করি। প্রকৃতির যত প্রতীক আছে এই প্রতীকগুলোকে ভুলভাবে পড়ার কোনো অবকাশ নেই।
চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা শোভাযাত্রা বের করে, প্রতীক তৈরি করে। তাদের মনের মতো পবিত্র মন নিয়ে আপনারা আসুন। এই প্রতীকগুলো আপনাদের কোনোদিনই অন্য কোনো অর্থ বহন করবে না। আমি দেখেছি, কেউ কেউ বলছেন, এটা নাকি হিন্দু ধর্মের হাবিজাবি কী কী প্রতীক। আমি শুধু এ কথাগুলোই বলি, যে বাচ্চাগুলি এই ছবিগুলি তৈরি করে, ওদের সঙ্গে আপনারা কাজ করুন, ওদের মনের খবরটা রাখুন। দেখবেন ওদের মধ্যে অনেক বেশি পবিত্রতা আছে। আপনাদের মতো কূপমণ্ডূক ওরা নয়। এই বিষয়টাই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হয়েছে, যে বাংলাদেশ উদারনৈতিক।
আমাদের রংকে যে আমরা উদযাপন করি, প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের যে সংযোগ, আমরা সবাই যে একটা জায়গায় সমস্ত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে এক হতে পারি, এই বিষয়টাই আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রধান বৈশিষ্ট্য। এটাকেই ইউনেস্কো গ্রহণ করেছে।
কোনো ধর্মকে করলে তো ভারতকেই আগে করত। নেপালে তো আমি অনেক শোভাযাত্রা দেখেছি। ভুটানেও দেখেছি। মিয়ানমারেও তো হয়। কিন্তু সেই শোভাযাত্রাকে তারা গ্রহণ করেনি। কারণ সেগুলো ধর্মীয় শোভাযাত্রা। ধর্মীয় শোভাযাত্রা ইউনেসকোর গ্রহণ করার কথা নয়। ইউনেস্কো তো সাংস্কৃতিক একটা সংস্থা। এই শোভা যাত্রাটা আমাদের সংস্কৃতিরই একটি শক্তি। এটাকেই তো উদযাপন করতে বলছি।
আমরা তো বিশ্ব ইতিহাসে কিছু দিলাম, বিশ্ব সংস্কৃতিতে কিছু দিলাম। এটা তো আমাদের অহংকারের একটা জায়গা। আমি ওইভাবে জিনিসটাকে দেখি। আমি ওই জিনিসটাকে অন্য কোনো মোড়কে দেখতে রাজি নই। যেহেতু ইউনেসকো এটিকে গ্রহণ করেছে, এটি সাংস্কৃতিক একটি ঘটনা এবং ধর্মীয় ঘটনা হলে সেটি ভারতের বা নেপালের বা ভুটানের বা শ্রীলঙ্কার বা মিয়ানমারের যেকোনো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে তারা গ্রহণ করত। এই মঙ্গল কোনো ধর্মগোষ্ঠীর মঙ্গল নয়। এই মঙ্গল সকল বাঙালির। ধনী, দরিদ্র্য, গ্রামের, শহরের সকল বাঙালির জন্য এই দিনটা মঙ্গল নিয়ে আসুক। এই জন্য শোভাযাত্রা।
পৃথিবীতে কত শোভাযাত্রা হয়, সেগুলোর অনেকগুলোতে নগ্নতা থাকে। আমাদের সেটি নেই। আমাদের এই উদযাপনে দুই একবার বাধা এসেছে, কিছু বখাটে, কিছু বদমাস, কিছু কুরুচি সম্পন্ন মানুষ আছে, তারা জঘন্য কাজ করেছে। কিন্তু সার্বিকভাবে আমি মনে করি, এই শোভাযাত্রা বা আমাদের নববর্ষের উদযাপন অত্যন্ত শ্লীল, অত্যন্ত সুন্দর, অত্যন্ত সুস্থ একটা উদযাপন। আমরা তো বলতেই পারি যে আমরা কত সুসংহত একটা জাতি, কত সংযত একটা জাতি, কত রুচিশীল একটা জাতি। এটাই তো আমর মনে হয় যে মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রধান একটা বিষয়।
লেখক : অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাবি

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম