তিল্লীর পাল পাড়া: বিলুপ্তির পথে মৃৎশিল্প
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। আর এই পার্বণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উৎসব বাংলা নববর্ষ। বৈশাখ মানেই শুধু নতুন ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টানো নয় এ যেন মাটির গন্ধে ভেজা শৈশবে ফিরে যাওয়া। একসময় বৈশাখী মেলা মানেই ছিল লাল মাটির সুনিপুণ কারুকাজে গড়া খেলনা, রঙিন পুতুল, ছোট্ট হাঁড়ি-পাতিল আর বাঁশির সুর। কিন্তু কালের বিবর্তনে প্লাস্টিক আর ধাতব পণ্যের ঝলমলে আধিপত্যে সেই শৈশবের রঙিন স্বপ্নগুলো আজ ফিকে হয়ে আসছে। হারিয়ে যাচ্ছে এক প্রাচীন ঐতিহ্য, স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে চাকার ঘোরার শব্দ।
মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার তিল্লী ইউনিয়নের তিল্লী পাল পাড়া। একসময় এই গ্রামটি পরিচিত ছিল মৃৎশিল্পের এক সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে। বৈশাখ আসার কয়েকমাস আগে থেকেই এখানে শুরু হতো উৎসবের প্রস্তুতি। প্রতিটি পাল পরিবারের উঠোন ভরে উঠত নিপুণ হাতের জাদুতে। তৈরি হতো মাটির ডুগি, ফুলদানি আর বাহারি সব খেলনা। প্রতিটি শিল্পকর্ম যেন কারিগরের ভালোবাসা আর আবেগের এক একটি গল্প বলত।
স্থানীয় মৃৎশিল্পী সুমন্ত পাল নস্টালজিক হয়ে বলেন, "ছোটবেলায় দেখতাম, পরিবারের সবাই মিলে কত আনন্দ নিয়ে মেলার জন্য জিনিস তৈরি করত। এখন মানুষ মাটির জিনিস ভুলে গেছে সবাই ঝুঁকছে প্লাস্টিকের দিকে।"
একসময় তিল্লী এলাকায় ৭০-৮০টি পরিবার এই শিল্পের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করলেও এখন সেই সংখ্যা হাতে গোনা। পেশাটি ছেড়ে অনেকেই বাঁচার তাগিদে অন্য কাজে যুক্ত হচ্ছেন। মৃৎশিল্পের এই পতনের পেছনে বেশ কিছু সংকটকে দায়ী করছেন কারিগররা:
১. উপযুক্ত মাটির অভাব: নদী-খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় আগের মতো মানসম্মত মাটি পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। মাটি কেনা থেকে শুরু করে উৎপাদন পর্যন্ত খরচ এখন আকাশচুম্বী।
২. বাজারের অসম প্রতিযোগিতা: প্লাস্টিক, স্টিল ও সিলভারের তৈরি পণ্য টেকসই এবং সস্তা হওয়ায় সাধারণ মানুষ এখন আর মাটির জিনিসের কদর করতে চায় না।
৩. আধুনিকতার ছোঁয়া: প্লাস্টিকের খেলনা বা শো-পিসের ভিড়ে মাটির সরল সৌন্দর্য আধুনিক প্রজন্মের কাছে আবেদন হারাচ্ছে।
কিরণচন্দ্র পাল হতাশা মাখা কণ্ঠে বলেন, "এই কাজ শুধু আমাদের পেশা নয়—এটা আমাদের ঐতিহ্য। কিন্তু এখন মনে হয়, আমরা হয়তো আর বেশিদিন টিকতে পারব না।"
এত সীমাবদ্ধতার মাঝেও উপেন্দ্রনাথ পালের মতো কেউ কেউ এখনো আশার আলো দেখেন। তাদের মতে, সরকারি বা বেসরকারিভাবে যদি সহজে মাটি পাওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া হয় এবং আধুনিক প্রযুক্তির সাথে কারিগরদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়, তবে এই শিল্প আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। যথাযথ প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বাজারে এই পরিবেশবান্ধব পণ্যের প্রচার বাড়ানো সম্ভব।
তিল্লীর মৃৎশিল্প শুধু একটি পেশা নয়, এটি বাংলার হাজার বছরের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের শৈশবের সেই মাটির গন্ধ মেশানো বৈশাখী স্বপ্নগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে আজই এই শিল্পীদের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন। সঠিক উদ্যোগ আর পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে অচিরেই এই বর্ণিল শিল্পটি কেবল ইতিহাসের পাতায় বা জাদুঘরের ধুলোমাখা তাকে স্থান পাবে।

আহমেদ সাব্বির সোহেল, মানিকগঞ্জ