লোডশেডিং কমবে কবে?
গরম এলেই বাংলাদেশের পুরোনো একটি সমস্যা ঘুরে ফিরে সামনে আসে। আর তা হলো ‘লোডশেডিং’। মহানগর থেকে শহর, শহর থেকে গ্রাম—সব জায়গাতেই এর প্রভাব পড়ে। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই, কোথাও আবার কিছুটা স্বস্তি। কেউ কেউ ট্রল করে বলেন, ‘বিদ্যুৎ মাঝে মাঝে আসে।’ কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই লোডশেডিং কেন? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্ন, তা হলো, এটি কবে কমবে?
আজকের পর্বে আমরা তথ্য, বাস্তবতা এবং নীতির আলোকে খুঁজে দেখার চেষ্টা করবো, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান অবস্থা এবং লোডশেডিংয়ের প্রকৃত চিত্র।
বিশ্বচোখে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত
বিশ্বচোখে বিদ্যুতের দিক দিয়ে বাংলাদেশ কেমন, আসুন সেটি দেখে আসি। বিদ্যুৎ একটি দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি অন্যতম সঞ্চালক ব্যবস্থা। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা উভয় ক্ষেত্রেই বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় এখনো বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত যথেষ্ট পিছিয়ে রয়েছে---বলছে, মুক্ত বিশ্বকোষ ‘উইকিপিডিয়া’। উইকিপিডিয়া আরও জানাচ্ছে, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম-ডব্লিউইএফ থেকে প্রকাশিত ‘এনার্জি আর্কিটেকচার পারফরম্যান্স ইনডেক্স-২০২৩’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুসারে বিদ্যুতের কাঠামোগত দক্ষতা সূচকে বিশ্বের ১২৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৮তম। ২০১৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশে বিদ্যুতের মাথাপিছু উৎপাদন হল ৪০৭ কিলোওয়াটআওয়ার, যা দক্ষিণ এশীয় দেশগুলো যেমন ভারত, পাকিস্তান কিংবা শ্রীলংকার মধ্যে সর্বনিম্ন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে বিদ্যুৎ খাতটি ‘বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে’ একীভূত অবস্থায় ছিল। এই খাতের সার্বিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে ১৯৯৮ সালে বিদ্যুৎ খাতটিকে, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পৃথক বিদ্যুৎ বিভাগে পরিণত করা হয়। এসব তথ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে, আর তা হলো, আমাদের শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, দক্ষতা ও ব্যবস্থাপনাও উন্নত করতে হবে। আসুন, বাংলাদেশ সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে জেনে নিই, ‘এক নজরে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত কেমন’ ?
সরকারি চিত্রে ‘এক নজরে বিদ্যুৎ খাত’
বাংলাদেশ সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগ ‘এক নজরে বিদ্যুৎ খাত’ নিয়ে যে তথ্য জানিয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংখ্যা ১৩৬টি, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে অবসরকৃত বা মেয়াদ উত্তীর্ণ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংখ্যা একটি, ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩২ হাজার ৩৩২ মেগা ওয়াট। সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ২০২৫ সালের ২৩ জুলাই ১৬,৭৯৪ মেগাওয়াট। মোট সঞ্চালন লাইন ১৭ হাজার ৯৯৫ সার্কিট কিলোমিটার। পাওয়ার ডিভিশন ডট গভ ডট বিডিতে এসব তথ্যের পাশাপাশি আরও বলা হয়েছে, গ্রিড সাবস্টেশন ক্ষমতা ৮৮ হাজার ৫৫৫ এমভিএ। বিদ্যুৎ আমদানি ক্ষমতা ২ হাজার ৬৯৬ মেগাওয়াট। ২০২৬ সালের মার্চে বিদ্যুতায়িত বিতরণ লাইন ৬ লাখ ৫৬ হাজার ২৯৭ কি.মি.। বিদ্যুৎ সুবিধাপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠী শতভাগ। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে তথ্য
বলছে, ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ মাথাপিছু বিদ্যুৎ উৎপাদন ৬৬১ কিলোওয়াট ঘন্টা। ২০২৬ সালের মার্চের হিসাব বলছে, বিদ্যুৎ গ্রাহক সংখ্যা ৪ কোটি ৯৬ লক্ষ ৮১ হাজার ৫৫৬। সেচ সংযোগ সংখ্যা ৪ লাখ ৯৮ হাজার। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের হিসাব বলছে, বিদ্যুতেবার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ ১৮ হাজার ৪০৯ দশমিক ৫২ কোটি টাকা। আর এই সময়ে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত বিতরণ সিস্টেম লস ৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান বলছে, কাঠামোগত দিক থেকে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে লোডশেডিং কেন?
লোডশেডিংয়ের প্রধান কারণ
কিন্তু কেন এই লোডশেডিং? সংশ্লিষ্টদের ব্যাখ্যা বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল উত্তেজনার কারণে জ্বালানি আমদানিতে সমস্যা হচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্মসচিব উম্মে রেহানাও বলেছেন সে কথা। যদিও বিভিন্ন সময়ে লোডশেডিংয়ের তথ্য বলছে, এর বাইরে আরও কিছু বাস্তব কারণ আছে, গ্রীষ্মকালে চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়া, সেচ মৌসুমে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ প্রয়োজন, গ্যাস সংকট যখন থাকে তখন বিদ্যুতের ওপর চাপ বেড়ে যাওয়া, কিছু বিদ্যুৎ কেন্দ্র আংশিক বা পূর্ণ সক্ষমতায় চালু না থাকা ইত্যাদি। অর্থাৎ, সমস্যা শুধু উৎপাদনের নয়, জ্বালানি সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনারও।
গ্রাম-শহর বৈষম্য ও নীতিগত পরিবর্তন
বর্তমানে একটি বড় আলোচনা, গ্রাম ও শহরের মধ্যে বিদ্যুৎ বৈষম্য। যখন গ্রামে দীর্ঘ সময় লোডশেডিং, তখন রাজধানীতে তুলনামূলক কম বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সংসদে তার বক্তব্যে বলছেন, এবার ঢাকাতেও লোডশেডিং হবে। প্রতিদিন প্রায় ১১০ মেগাওয়াট করে লোডশেডিংয়ের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। উদ্দেশ্য--গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানো। প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, সংসদে তিনি বলেন, ‘বৈষম্য মুক্ত করার জন্য আমরা শহরেও প্রয়োজনে লোডশেডিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি পরিবর্তন, যেখানে সমতা আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে, অনেকের আলোচনায় বারবার ফিরে ফিরে আসছে, এই রাজধানী ও তার আশপাশেই যে সব অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান--- তাতে প্রভাব পড়লে কি সেঁচের গুরুত্ব ব্যবসায় প্রভাব ফেলবে না?
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রশিদ খান একটি গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘যাতে কোনো জায়গায় এক ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং না হয়, আজ এখানে হলে যেন কাল ওখানে না হয়, এভাবে কী করা যায়, সেটা দেখা হবে। সবই যে শতভাগ এভাবে মানতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। এনএলডিসি ইচ্ছা করলে তার মতোও করতে পারবে। শিল্প যাতে বেশি এফেক্ট না হয়, এজন্য আমরা সব সময় অগ্রাধিকার দিয়ে থাকি শিল্প কারখানা এলাকায়।’
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম গণমাধ্যমকে বলেছেন, সেচের জন্য সর্বোচ্চ মাত্রায় যেন বিদ্যুৎ দেয়া যায়, সেটা সরকারের প্রথম প্রাধিকার হওয়া উচিত। দ্বিতীয়ত হচ্ছে, রপ্তানিমুখী শিল্প কারখানায় যেন বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা হয়। এছাড়া, হাসপাতালে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারের পরিকল্পনা ও বাস্তবতা
আগামী ৫ বছরে সরকার ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চায়। আগামী সপ্তাহ থেকে দেশে বিদ্যুতের অবস্থা ভালো হবে। কমে আসবে লোডশেডিং। আর বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিডার চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেছেন, আগামী বাজেটে ব্যাটারির উৎপাদন ও আমদানি পর্যায়ে শুল্ক সুবিধা দেয়া হবে। কিন্তু বাস্তবতা কী বলছে? যদি জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল হয়, নতুন বিদ্যুৎ যুক্ত হয়, চাহিদা নিয়ন্ত্রণে থাকে—তাহলেই লোডশেডিং কমতে পারে। কিন্তু এই তিনটি শর্ত কি নিশ্চিত করা সম্ভব?
আশার বার্তা
তীব্র লোডশেডিংয়ের মধ্যে আশার বাণী শোনা যাচ্ছে। এরই মধ্যে ভারতের আদানি পাওয়ার প্ল্যান্টের প্রায় ৯২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পেতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-বিপিডিবি সূত্র জানিয়েছে, আদানি প্ল্যান্টের দ্বিতীয় ইউনিটটি ২৭ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টা ৪৭ মিনিটে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সমন্বয় শুরু করে। বর্তমানে এটি ৯২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে।
বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ ধীরে ধীরে আরও বাড়বে। এই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সার্বিক উৎপাদন বৃদ্ধি করতে সহায়তা করছে এবং দেশব্যাপী লোডশেডিং কমাতে ভূমিকা রাখছে। এনটিভি অনলাইনের প্রতিবেদন বলছে, বিপিডিবির কর্মকর্তারা আরও জানান, ২৮ এপ্রিল থেকে এসএস পাওয়ার এবং আরএনপিএল থেকে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত ৬০০ মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা রয়েছে। আরএনপিএল হচ্ছে বাংলাদেশের রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড-আরপিসিএলের এবং চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান নরিনকোর যৌথ উদ্যোগ। প্রতিষ্ঠানটি ২৮ এপ্রিল থেকে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করবে।
বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার সন্ধ্যায় দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট, যেখানে আদানি প্ল্যান্টের বিদ্যুৎ ছাড়া সর্বোচ্চ উৎপাদন ছিল ১৪ হাজার ৭১২ মেগাওয়াট।
কবে কমবে লোডশেডিং?
কবে কমবে লোডশেডিং? প্রশ্নটা এখন জনমনে। যদিও আজ এসেছে, সুসংবাদ। আগামী সপ্তাহ থেকে দেশে বিদ্যুতের অবস্থা ভালো হবে এবং লোডশেডিং কমে আসবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। ২৭ এপ্রিল সিপিডি আয়োজিত বাংলাদেশ-চীন নবায়নযোগ্য জ্বালানি ফোরামের আলোচনায় তিনি এ কথা বলেন। এদিকে, বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর পথে। আজ ২৮ এপ্রিল গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ অতিক্রম করতে যাচ্ছে কেন্দ্রটি। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে আজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জ্বালানি হিসেবে ইউরেনিয়াম লোডিং কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। সব প্রস্তুতি শেষে আজ বিকেলে প্রথম ইউনিটে শুরু হতে যাচ্ছে পরমাণু জ্বালানি ইউরেনিয়াম লোডিং কার্যক্রম। এর ফলে দেশ প্রথমবারের মতো পরমাণু শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রবেশ করল। তবে আজ ইউরেনিয়াম লোডিং কার্যক্রম শুরু হলেও বিদ্যুৎ পেতে অপেক্ষা করতে হবে আরও ৩ মাস।
করণীয় হতে পারে যা
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত কাঠামোগতভাবে এগিয়েছে, কিন্তু সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। লোডশেডিং কমার আশ্বাস আছে, কিন্তু বাস্তবতা এখনো অনিশ্চিত। কারণ, লোডশেডিং কমানো শুধু উৎপাদন বাড়ানোর বিষয় নয়, এটি নির্ভর করে, জ্বালানি আমদানির সক্ষমতা, বৈদেশিক মুদ্রা পরিস্থিতি, ব্যবস্থাপনার দক্ষতা অর্থাৎ, এটি একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। তাই লোড শেডিং কমাতে সরকারকে বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়াতে হবে, পাশাপাশি জনগণকেও সচেতন হতে হবে। সোলার সিস্টেমকে ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রাইভেট সোলার সিস্টেম থেকেও জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের সংযোগ ও সাপ্লাইকারী ব্যক্তিকে বিশেষ ছাড়ের সুযোগ করে সেই দিকেও নজর দেওয়া যেতে পারে। তবে, সব সমস্যা একইসঙ্গে সমাধাধান হতে লম্বা একটি সময়েরও প্রয়োজন।
লেখক : কবি ও কথাসাহিত্যিক

সৈয়দ আহসান কবীর