সিঙ্গাপুরের সেই অশ্রুসজল দিন ও বাংলাদেশের সম্ভাবনা
১৯৬৫ সালের ৯ আগস্ট। বিশ্ব মানচিত্রে একটি ক্ষুদ্র বিন্দুর মতো জেগে থাকা দ্বীপরাষ্ট্র সিঙ্গাপুরের জন্য দিনটি ছিল চরম অনিশ্চয়তার। মালয়েশিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে এক প্রকার বাধ্য হয়েই স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে হয়েছিল লি কুয়ান ইউ-কে। সেদিন টেলিভিশনের পর্দায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে গিয়ে এই লৌহমানবের চোখেও জল চলে এসেছিল। কারণ তার হাতে তখন এমন এক ভূখণ্ড, যার কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ নেই, নেই পর্যাপ্ত খাবার জল বা কৃষিজমি। জাতিগত দাঙ্গায় জর্জরিত, বস্তি আর মশার উপদ্রবে ভরা এক বন্দর নগরী কীভাবে টিকে থাকবে, তা নিয়ে খোদ পশ্চিমা অর্থনীতিবিদরাও সন্দিহান ছিলেন। কিন্তু ঠিক তিন দশক পর, ১৯৯৫ সালের দিকে বিশ্ব অবাক হয়ে দেখল, সেই ‘জেলেপল্লি’ বা মশার অভয়ারণ্যটিই এখন বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র, যার মাথাপিছু আয় অনেক উন্নত রাষ্ট্রকেও ছাড়িয়ে গেছে।
সিঙ্গাপুরের এই অবিশ্বাস্য রূপান্তরের প্রধান কারিগর লি কুয়ান ইউ-এর উন্নয়ন মডেল আজ উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য এক মহাগ্রন্থের মতো। বাংলাদেশ আজ যখন উন্নয়নের একটি নতুন স্তরে উপনীত হতে চাইছে, তখন লি কুয়ান ইউ-এর রাষ্ট্রদর্শন আমাদের জন্য হতে পারে গাইডম্যাপ।
লি কুয়ান ইউ-এর প্রথম এবং প্রধান শিক্ষাটি ছিল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের অবিচ্ছিন্নতা। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য ‘আনলিমিটেড ডেমোক্রেসি’ বা অবারিত রাজনীতির চেয়ে ‘ডিসিপ্লিন’ বা শৃঙ্খলা অনেক বেশি জরুরি। সিঙ্গাপুর যখন স্বাধীন হয়, তখন সেখানে চীন, মালয় এবং ভারতীয়দের মধ্যে চরম সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বিরাজ করছিল। লি কুয়ান ইউ জানতেন, এই বিভাজন দূর করতে না পারলে কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না। তিনি কঠোর হাতে দাঙ্গা দমন করেছিলেন এবং এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন যেখানে ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের মৌলিক নীতিগুলো অপরিবর্তিত থাকে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সরকারের পরিবর্তনের সাথে সাথে উন্নয়ন নীতির পরিবর্তন। লি কুয়ান ইউ শিখিয়েছেন যে, রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি হতে হবে দলমতের ঊর্ধ্বে এবং দীর্ঘমেয়াদী। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য এটি একটি বড় পাঠ হতে পারে—কীভাবে জাতীয় স্বার্থে দলমত নির্বিশেষে একটি অভিন্ন উন্নয়ন লক্ষ্যের ওপর ঐক্যবদ্ধ থাকা যায়। যদি প্রতিটি সরকার এসে আগের সরকারের ভালো প্রকল্পগুলো বাতিল করে দেয়, তবে জাতি হিসেবে আমরা কখনোই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব না। সিঙ্গাপুর আমাদের শেখায় যে, উন্নয়নের জন্য নূন্যতম ২০ থেকে ৩০ বছরের একটি নিরবচ্ছিন্ন স্থিতিশীলতা প্রয়োজন।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে লি কুয়ান ইউ-এর ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ছিল আধুনিক সিঙ্গাপুর গড়ার ইস্পাতকঠিন ভিত্তি। তিনি জানতেন, দুর্নীতি হলো উন্নয়নের ঘুণপোকা যা রাষ্ট্রের জীবনীশক্তি শুষে নেয়। দুর্নীতি দমনে তিনি দুটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
প্রথমত, তিনি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং স্বাধীন দুর্নীতি দমন সংস্থা (CPIB) গড়ে তোলেন, যাদের কাজ ছিল সরকারের মন্ত্রী থেকে শুরু করে চুনোপুঁটি পর্যন্ত সবার ওপর নজর রাখা। এমনকি তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের কেউ দুর্নীতিতে জড়ালে তাকেও ছাড় দেওয়া হয়নি।
দ্বিতীয়ত, তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন ও সামাজিক মর্যাদা এমন এক ঈর্ষণীয় পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন যাতে তারা অভাবের তাড়নায় বা লোভে পড়ে অনৈতিক পথে পা না বাড়ান। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা দেখি যে, বিশাল সব মেগা প্রজেক্টের কাজ যখন শুরু হয়, তখন দুর্নীতির কারণে ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সিঙ্গাপুরের এই মডেল থেকে আমরা শিখতে পারি যে, কেবল আইন দিয়ে নয়, বরং নৈতিকতা এবং সঠিক পারিশ্রমিকের সমন্বয়ে একটি স্বচ্ছ প্রশাসন গড়ে তোলা সম্ভব। যখন প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়, তখন তার প্রভাব একেবারে তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছায়। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ছাড়া আগামীর উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন অসম্ভব।
লি কুয়ান ইউ-এর উন্নয়নের দর্শনে মানুষই ছিল একমাত্র এবং প্রধান পুঁজি। যেহেতু সিঙ্গাপুরের কোনো খনিজ সম্পদ ছিল না, তাই তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, ‘আমাদের একমাত্র সম্পদ আমাদের মানুষ।’ তিনি শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমনভাবে ঢেলে সাজান যাতে প্রতিটি শিক্ষার্থী কেবল পুঁথিগত বিদ্যা অর্জন না করে, বরং বৈশ্বিক বাজারের জন্য একজন দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে ওঠে। তিনি কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
বাংলাদেশ আজ ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক লভ্যাংশের এক স্বর্ণযুগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমাদের বিশাল তরুণ সমাজকে যদি সঠিক শিক্ষা এবং কারিগরি দক্ষতায় পারদর্শী করা না যায়, তবে এই বিপুল জনসংখ্যা আশীর্বাদের চেয়ে দেশের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। লি কুয়ান ইউ আমাদের শিখিয়েছেন যে, একটি জাতিকে শিক্ষিত করার চেয়ে বড় বিনিয়োগ আর কিছু হতে পারে না। বাংলাদেশের উচিত সাধারণ উচ্চশিক্ষার চেয়ে কর্মমুখী এবং প্রযুক্তিগত শিক্ষায় অর্থায়ন বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া, যাতে আমাদের তরুণরা কেবল দেশের ভেতরেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সমাদৃত হয়। সিঙ্গাপুরের প্রতিটি নাগরিক আজ একেকটি সম্পদে পরিণত হয়েছে কারণ তাদের রাষ্ট্র তাদের দক্ষতাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেছে।
একটি ক্ষুদ্র ভূখণ্ডকে কীভাবে গ্লোবাল বিজনেস হাবে রূপান্তর করতে হয়, তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ লি কুয়ান ইউ-এর সিঙ্গাপুর। সত্তরের দশকে যখন এশিয়ার অনেক দেশ জাতীয়করণের পথে হাঁটছিল এবং বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে সন্দিহান ছিল, লি কুয়ান ইউ তখন বিশ্বের বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে সিঙ্গাপুরে আসার জন্য লাল গালিচা বিছিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য সম্পূর্ণ নির্মূল করেছিলেন এবং এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছিলেন যেখানে কোনো বিনিয়োগকারীকে একটি দপ্তরেও হয়রানির শিকার হতে হতো না। বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের কার্যকর অভাব প্রায়ই আলোচনায় আসে। সিঙ্গাপুর থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি আমরা আমাদের বন্দরগুলোর আধুনিকায়ন এবং বিনিয়োগ-সংক্রান্ত সেবাগুলো ডিজিটাল ও ঝামেলামুক্ত করতে পারি, তবে আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে পারে। এটি কেবল অর্থনীতির চাকা সচল করবে না, বরং দেশের লাখ লাখ শিক্ষিত বেকারের কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দেবে।
লি কুয়ান ইউ-এর শাসনব্যবস্থার অন্যতম শক্ত খুঁটি ছিল মেধাভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা বা ‘মেরিটক্রেসি’। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি রাষ্ট্রকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে হলে তার আমলাতন্ত্র এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দেশের শ্রেষ্ঠ মেধাবীদের স্থান দিতে হবে। সিঙ্গাপুরে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ বা পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়, আত্মীয়তা বা স্বজনপ্রীতির কোনো স্থান নেই। সেখানে একজন সাধারণ ঘরের সন্তানও যদি অত্যন্ত মেধাবী হয়, তবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছাতে তার কোনো বাধা নেই।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা প্রায়ই দেখি যে, মেধাবী তরুণরা দেশের সরকারি ব্যবস্থায় কাজের সুযোগ বা সঠিক মূল্যায়ন না পেয়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন, যাকে আমরা ‘ব্রেইন ড্রেইন’ বলি। লি কুয়ান ইউ আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে রাষ্ট্রের মেধাকে রাষ্ট্রের কাজে লাগাতে হয়। তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা এমন পর্যায়ে রেখেছিলেন যে, প্রাইভেট সেক্টরের বড় বড় চাকরি ছেড়ে মেধাবীরা দেশ সেবায় যুক্ত হতে গর্ব বোধ করত। বাংলাদেশ যদি তার সিভিল সার্ভিস এবং পাবলিক সেক্টরে প্রকৃত মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে পারে, তবে প্রশাসনিক গতিশীলতা কয়েকগুণ বেড়ে যাবে।
আধুনিক সিঙ্গাপুরের রূপান্তরের পেছনে লি কুয়ান ইউ-এর ‘সবুজ ও পরিষ্কার’ নগর দর্শনের ভূমিকা অপরিসীম। সত্তরের দশকে যখন তিনি সিঙ্গাপুরকে একটি ‘গার্ডেন সিটি’ হিসেবে গড়ার ঘোষণা দেন, তখন অনেকেই বিষয়টিকে বিলাসিতা মনে করেছিলেন। কিন্তু লি কুয়ান ইউ-এর চিন্তা ছিল সুদূরপ্রসারী। তিনি জানতেন, কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারী বা পর্যটক যখন একটি দেশে পা রাখেন, তখন সেই দেশের পরিচ্ছন্নতা এবং পরিবেশ দেখেই তারা প্রথম ধারণা তৈরি করেন। তিনি নিজে গাছ লাগাতেন এবং নগরীর প্রতিটি প্রান্তে পর্যাপ্ত উদ্যান নিশ্চিত করেছিলেন। যত্রতত্র ময়লা ফেলা বা আইন অমান্যকারীদের জন্য তিনি অত্যন্ত কঠোর জরিমানার ব্যবস্থা করেছিলেন, যা আজও কার্যকর।
বাংলাদেশে আমাদের শহরগুলো বিশেষ করে ঢাকা আজ দূষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকটে ভুগছে। সিঙ্গাপুর থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা যদি আমাদের নগরগুলোকে পরিবেশবান্ধব ও পরিচ্ছন্ন করে গড়ে তুলতে পারি, তবে তা কেবল জনস্বাস্থ্যই ভালো রাখবে না, বরং আমাদের পর্যটন শিল্পকেও বিশ্বমানের করে তুলবে। শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্য যে একটি জাতির শৃঙ্খলার প্রতীক, তা সিঙ্গাপুর বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে।
লি কুয়ান ইউ-এর পররাষ্ট্রনীতি ছিল অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ এবং বাস্তবধর্মী। একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হিসেবে সিঙ্গাপুরকে টিকে থাকতে হতো বড় বড় শক্তির মাঝখানে। লি কুয়ান ইউ এমন এক নীতি গ্রহণ করেছিলেন যাতে সবার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকে কিন্তু দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বার্থের বিষয়ে কোনো আপোষ না হয়। তিনি সিঙ্গাপুরকে একটি বৈশ্বিক সংযোগস্থলে পরিণত করেছিলেন। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানও অত্যন্ত কৌশলগত। ভারত ও চীনের মতো দুটি বড় শক্তির মাঝখানে এবং বঙ্গোপসাগরের কূলে আমাদের অবস্থান আমাদের বিশাল ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা এনে দিয়েছে। লি কুয়ান ইউ-এর সেই বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে বাংলাদেশ নিজেকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি ‘ইকোনমিক হাব’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। বড় শক্তিগুলোর দ্বন্দ্বে না জড়িয়ে অর্থনৈতিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে আমাদের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ। সিঙ্গাপুরের সাফল্য আমাদের শেখায় যে, আদর্শিক লড়াইয়ের চেয়ে অর্থনৈতিক বাস্তববাদ একটি ছোট জাতির জন্য বেশি ফলদায়ক।
নগরায়ণ এবং সামাজিক সংহতির ক্ষেত্রে লি কুয়ান ইউ-এর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত গভীর। তিনি মনে করতেন, মানুষের যদি নিজের থাকার একটি নিরাপদ জায়গা থাকে, তবে সে রাষ্ট্রের প্রতি এবং সমাজের প্রতি অধিকতর দায়বদ্ধতা অনুভব করবে। তার ‘Housing and Development Board’ (HDB) প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি সিঙ্গাপুরের প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষকে সরকারি আবাসনের আওতায় নিয়ে আসেন। এটি কেবল আবাসন সমস্যা সমাধান করেনি, বরং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে একই ভবনে বসবাসের সুযোগ দিয়ে সামাজিক বিভেদ দূর করেছিল। বাংলাদেশের ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো শহরগুলো আজ অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং যানজটে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় রয়েছে। সিঙ্গাপুরের সেই পরিকল্পিত নগরায়ণ, গণপরিবহন ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থান রাখার নীতিগুলো আমাদের জন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আধুনিক সিঙ্গাপুর প্রমাণ করেছে যে, সীমিত স্থানেও কীভাবে সুশৃঙ্খল এবং পরিবেশবান্ধব নগরজীবন নিশ্চিত করা সম্ভব।
লি কুয়ান ইউ-এর আরও একটি বড় শিক্ষা হলো প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া। যখন বিশ্ব অ্যানালগ থেকে ডিজিটালের দিকে যাত্রা শুরু করে, তখন সিঙ্গাপুর ছিল তার অগ্রভাগে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, ভৌত অবকাঠামোর চেয়েও ডিজিটাল অবকাঠামো ভবিষ্যতের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হবে। আজ বাংলাদেশ যখন নিজেকে ভিন্নভাবে গড়ার স্বপ্ন দেখছে, তখন আমাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবটিক্স এবং ফিনটেকের মতো আধুনিক প্রযুক্তিগুলোতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। লি কুয়ান ইউ কেবল পরিকল্পনা করতেন না, বরং তার নিখুঁত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতেন। আমাদের দেশে পরিকল্পনার অভাব নেই, কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা একটি বড় সমস্যা। সিঙ্গাপুরের সেই ‘এক্সিকিউশন মডেল’ বা সঠিক সময়ে কাজ শেষ করার সংস্কৃতি আমাদের গ্রহণ করতে হবে। প্রতিটি প্রকল্পের সময়সীমা এবং মান নিশ্চিত করা গেলে উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছাবে।
লি কুয়ান ইউ-এর উন্নয়ন দর্শনে সামাজিক নিরাপত্তা এবং জনগণের সঞ্চয় ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ‘সেন্ট্রাল প্রভিডেন্ট ফান্ড’ (CPF)-এর মতো বাধ্যতামূলক সঞ্চয় প্রকল্প চালু করেছিলেন, যা নাগরিকদের অবসর জীবন, চিকিৎসা এবং আবাসন নিশ্চিত করেছিল। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে যেখানে বিশাল জনগোষ্ঠী বার্ধক্য বা অসুস্থতায় অসহায় হয়ে পড়ে, সেখানে এই ধরণের একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং বাধ্যতামূল সঞ্চয় ব্যবস্থা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। এটি কেবল মানুষের ব্যক্তিগত সুরক্ষা দেয় না, বরং রাষ্ট্রের জন্য বিশাল এক অভ্যন্তরীণ মূলধন জোগাড় করে যা বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহৃত হতে পারে। সিঙ্গাপুর প্রমাণ করেছে যে, জনগণের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় কীভাবে জাতীয় অর্থনীতির ভিত্তি মজুত করতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, লি কুয়ান ইউ-এর সাফল্য কোনো অলৌকিক ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল কঠোর পরিশ্রম, আপোষহীন দেশপ্রেম এবং সঠিক কর্মপরিকল্পনার ফলাফল। বাংলাদেশ একটি বিশাল সম্ভাবনার দেশ। আমাদের উর্বর জমি, বিপুল জনসংখ্যা এবং বঙ্গোপসাগরের বিশাল উপকূলরেখা রয়েছে। আমরা যদি লি কুয়ান ইউ-এর সেই মূলমন্ত্র—শৃঙ্খলা, মেধা এবং স্বচ্ছতা—আমাদের জাতীয় জীবনে এবং প্রশাসনে প্রয়োগ করতে পারি, তবে বাংলাদেশ খুব শীঘ্রই সিঙ্গাপুরের মতো একটি উন্নত ও আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত হবে। আমাদের প্রয়োজন কেবল একতাবদ্ধ হওয়া এবং উন্নয়নের মহাসড়কে অবিচল থাকা। লি কুয়ান ইউ দেখিয়ে গেছেন কীভাবে শূন্য থেকে শিখরে পৌঁছানো যায়; এখন সময় আমাদের সেই শিক্ষা কাজে লাগিয়ে স্মার্টলি ইতিহাস গড়ার। আগামীর নতুন উন্নত বাংলাদেশ গড়ার পথে সিঙ্গাপুরের এই মডেল হবে আমাদের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।
লেখক পরিচিতি: সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন।

জাহিদ ইকবাল