মহানায়িকা সুচিত্রা সেন: রূপ, প্রতিভা ও রহস্যে মোড়া এক কালজয়ী অধ্যায়
‘এমন বন্ধু আর কে আছে তোমার মতো মিস্টার’—এই কালজয়ী গানটি আজও বাঙালির আবেগে অনুরণিত হয়। ১৯৫৯ সালের চলচ্চিত্র ‘দ্বীপ জ্বেলে যাই’-এ রাধা চরিত্রে সুচিত্রা সেনের অভিনয় বাংলা চলচ্চিত্রে মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। প্রেয়সী যেমন, তেমনি একজন সেবিকা হিসেবেও তার অভিনয় ছিল গভীর, সংযত ও আবেগময়। মহাকালের কষ্টিপাথরে সুচিত্রা সেন অভিনীত চলচ্চিত্রগুলো আজ খাঁটি সোনার মতোই দীপ্ত।
বাংলা ও ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসে সুচিত্রা সেন এক অনন্য নাম। আপামর বাঙালির মানসে উত্তম-সুচিত্রা জুটি আজও অবিস্মরণীয়। ‘মহানায়িকা’ উপাধিটি যেন কেবল তার জন্যই মানানসই—রূপ, প্রতিভা ও ব্যক্তিত্বের এক দুর্লভ সমন্বয়ে।
জন্ম ও পারিবারিক জীবন
সুচিত্রা সেনের জন্ম ১৯৩১ সালের ৬ এপ্রিল, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রদেশের পাবনা জেলার বেলকুচিতে। তার প্রকৃত নাম রমা দাশগুপ্ত। বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত ছিলেন স্কুল শিক্ষক এবং মা ইন্দিরা দাশগুপ্ত গৃহিণী। শৈশব ও প্রাথমিক শিক্ষা পাবনাতেই সম্পন্ন হয়। পরবর্তীতে পরিবার কলকাতায় স্থানান্তরিত হয়।
১৯৪৭ সালে অল্প বয়সেই তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন বিখ্যাত সেন পরিবারের সন্তান, শিল্পপতি আদিনাথ সেনের পুত্র দিবানাথ সেনের সঙ্গে। তাদের একমাত্র কন্যা মুনমুন সেন পরবর্তীতে জনপ্রিয় অভিনেত্রী হন। নাতনি রাইমা সেন ও রিয়া সেনও চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে পাবনায় সুচিত্রা সেনের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে সংরক্ষিত এবং সেখানে একটি জাদুঘর দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত।
অভিনয় জীবনের সূচনা ও উত্থান
সুচিত্রা সেনের অভিনয় জীবন শুরু হয় ১৯৫২ সালে ‘শেষ কোথায়’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। যদিও তার মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম ছবি ছিল ‘সাত নম্বর বাড়ি’। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করেন।
বাংলা চলচ্চিত্রে রোমান্টিক ধারাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে উত্তম কুমারের সঙ্গে তার যুগলবন্দির ভূমিকা অনস্বীকার্য। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ (১৯৫৩) থেকে ‘প্রিয় বান্ধবী’ (১৯৭৫) পর্যন্ত প্রায় ৩০টি ছবিতে এই জুটি একসঙ্গে কাজ করে বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক স্বর্ণযুগের সূচনা করে। তার অভিনয়ে ছিল নারীত্বের শক্তি, সৌন্দর্য, আত্মমর্যাদা ও আবেগের সূক্ষ্ম প্রকাশ। শুধু বাংলা নয়, হিন্দি চলচ্চিত্রেও তিনি নিজের অভিনয় দক্ষতার উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে গেছেন।
দর্শকপ্রিয় চলচ্চিত্র ও সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ
দ্বীপ জ্বেলে যাই (১৯৫৯)
এক মানসিক হাসপাতালের নার্স হিসেবে সুচিত্রা সেনের মানবিক অভিনয় প্রমাণ করে, তিনি কেবল রোমান্টিক নায়িকা নন—গভীর, সংবেদনশীল চরিত্রেও সমান দক্ষ।
সপ্তপদী (১৯৬১)
প্রেম ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার দ্বন্দ্বে উত্তম-সুচিত্রার রোমান্টিক রসায়ন বাংলা চলচ্চিত্রকে উপহার দেয় চিরকালীন আবেদন।
সাত পাকে বাঁধা (১৯৬৩)
আধুনিক ও স্বাধীনচেতা নারীর চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেত্রীর রৌপ্য পুরস্কার অর্জন করেন।
আন্ধি (১৯৭৫)
একজন নারী রাজনীতিকের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের টানাপোড়েন সুচিত্রা সেন অত্যন্ত সংযত ও বাস্তবধর্মী অভিনয়ে তুলে ধরেন। ছবিটি তৎকালীন ভারতে রাজনৈতিক বিতর্কও সৃষ্টি করেছিল।
দেবদাস (১৯৫৫)
বিমল রায় পরিচালিত এই হিন্দি ক্ল্যাসিকে পার্বতী (পারো) চরিত্রে তার আবেগঘন অভিনয় তাকে সর্বকালের সেরা অভিনেত্রীদের কাতারে নিয়ে যায়।
কালজয়ী গান ও সাংস্কৃতিক প্রভাব
সুচিত্রা সেন অভিনীত চলচ্চিত্রের গানগুলো আজও সমান জনপ্রিয়—‘এই পথ যদি না শেষ হয়’, ‘তুমি যে আমার’, ‘গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু’, ‘এই রাত তোমার আমার’, ‘ঝনক ঝনক কনক কাকন বাজে’, ‘তেরে বিনা জিন্দেগি সে’—এমন অসংখ্য গান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শ্রোতাদের আবেগে জড়িয়ে আছে।
অবসর, নির্জনতা ও প্রয়াণ
১৯৭৮ সালে ‘প্রণয় পাশা’ চলচ্চিত্রের পর সুচিত্রা সেন অভিনয় জগৎ থেকে অবসর নেন। ধীরে ধীরে তিনি জনসম্মুখ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। জীবনের শেষ তিন দশক প্রায় সম্পূর্ণ নির্জনবাসে কাটান, যা তার ব্যক্তিত্বকে আরও রহস্যময় করে তোলে।
দীর্ঘ অসুস্থতার পর ১৭ জানুয়ারি ২০১৪ কলকাতায় তার মৃত্যু হয়। তার প্রয়াণে বাংলা ও ভারতীয় চলচ্চিত্র জগৎ গভীর শোক প্রকাশ করে।
সম্মাননা ও স্বীকৃতি
অভিনয়শিল্পে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সুচিত্রা সেন দেশি-বিদেশি নানা সম্মান অর্জন করেন। তিনি ছিলেন প্রথম ভারতীয় অভিনেত্রী, যিনি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অভিনয়ের জন্য পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৬৩ সালে ‘সাত পাকে বাঁধা’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেত্রীর রৌপ্য পদক অর্জন তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।
ভারত সরকার ১৯৭২ সালে তাকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে। পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০১২ সালে চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতিতে আজীবন অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে বঙ্গবিভূষণ প্রদান করে। ২০০৫ সালে ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারের জন্য তাকে মনোনীত করা হলেও দীর্ঘদিন ধরে জনসম্মুখে অনুপস্থিত থাকার নীতিগত অবস্থানের কারণে তিনি এ সম্মান গ্রহণ করেননি।
এই সব সম্মান ও স্বীকৃতি শুধু তার অভিনয় দক্ষতারই প্রমাণ নয়, বরং বাংলা ও ভারতীয় চলচ্চিত্রে তার স্থায়ী প্রভাব ও কালোত্তীর্ণ অবস্থানের স্বীকৃতিও বহন করে।
চরিত্র নির্বাচন, পরিচালক ও সহ-অভিনেতা বাছাইয়ে সুচিত্রা সেন ছিলেন অত্যন্ত খুঁতখুঁতে। সত্যজিৎ রায়ের ‘ঘরে বাইরে’ ছবিতে কাজের প্রস্তাব তিনি একচেটিয়া চুক্তিগত কারণে ফিরিয়ে দেন। রাজ কাপুরের সঙ্গেও ব্যক্তিত্বগত কারণে কাজ করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।
রূপ, অভিনয় ও দৃঢ় ব্যক্তিত্বে সুচিত্রা সেন হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির চিরকালের মহানায়িকা। স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতীয় সিনেমার পরিবর্তিত ধারার মধ্যেও তিনি নিজের লাবণ্য ও অভিনয়গুণে জনপ্রিয়তার শীর্ষে অধিষ্ঠিত ছিলেন। মহানায়িকার দ্বাদশ প্রয়াণ দিবসে বাংলা চলচ্চিত্রের এই চিরসবুজ নক্ষত্রের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধার্ঘ্য।
লেখক: ড. জাকিয়া সুলতানা, গণমাধ্যমকর্মী ও শিক্ষক।

ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশ (ইউএনবি)