সুন্দরবন দিবস আজ : দখল-দূষণ-শিকার বন্ধে উদ্যোগ নিতে হবে
আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি, দেশের উপকূল অঞ্চলে পালিত হচ্ছে সুন্দরবন দিবস। রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা না হলেও দুই দশক ধরে সুন্দরবন-সংলগ্ন উপকূলীয় জেলাগুলোতে ১৪ ফেব্রুয়ারি সুন্দরবন দিবস পালন করা হচ্ছে। দিবসটি জাতীয়ভাবে পালন করা এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনভূমি হিসেবে পরিচিত এই সুন্দরবন বহুবার দানবীয় প্রাকৃতিক দুর্যোগে বুক পেতে দিয়ে নিজের ক্ষতি করেও উপকূলের কোটি মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে। এটি কেবল একটি বনভূমি নয়, বরং বাংলাদেশের অস্তিত্বের এক অপরাজেয় রক্ষা প্রাচীর। অথচ আক্ষেপের বিষয় হলো, এক শ্রেণির অসাধু সুবিধাভোগী গোষ্ঠী দখল, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, পরিবেশ দূষণ, বন উজাড়, প্রাণী শিকারসহ নানাভাবে সুন্দরবনকে ধ্বংস করছে। এসব বন্ধ করতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
দুর্যোগে উপকূলবর্তী মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়ার পাশাপাশি সুন্দরবন ফুসফুসের মতো পুরো দেশকে অক্সিজেন সরবরাহ করে। দেশের বনজ সম্পদের একক বৃহত্তম উৎসের পাশাপাশি দেশের বন্যপ্রাণীর বৃহত্তম আবাসস্থল সুন্দরবন। বন বিভাগের তথ্যমতে, সুন্দরবনে ৫২৮ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৩৫৫ প্রজাতির পাখি, ১৪ প্রজাতির উভচর প্রাণী, ১২৫টি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, ৪৭ হাজার ৫১৫টি বন্যশুকর, ২৫ হাজার ১২৫টি গুঁইসাপ, ১৪০টি লোনা পানির কুমির ও ৪৫১টি ইরাবতী ডলফিনসহ মোট ৫০৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী, ৮৭ প্রজাতির সরীসৃপ, ৪৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী রয়েছে। এ ছাড়া হরিণ রয়েছে ১ লাখ ৫২ হাজার ৪৪৪টি, শজারু ১২ হাজার ২৪১টি, গাঙ্গেয় ডলফিন ২২৫টি এবং ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ রয়েছে। সুন্দরবনের মধু, গোলপাতা, মাছসহ আশেপাশের পর্যটন এলাকা থেকে সরকার বিপুল রাজস্ব আয় করে থাকে।
সুন্দরবনের অস্তিত্বের ওপর বড় আঘাত হয়ে দাঁড়িয়েছে লাগামহীন দখল। গত ২০০ বছরে সুন্দরবনের আয়তন প্রায় ১৬,৭০০ বর্গকিলোমিটার থেকে কমতে কমতে এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে, আর গত ১০০ বছরেই হারিয়েছে ৪৫১ বর্গকিলোমিটার বনভূমি। বর্তমানে পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে প্রভাবশালী মহলের সরাসরি মদদে বনের জমি দখল করে গড়ে তোলা হচ্ছে বিলাসবহুল রিসোর্ট ও ট্যুরিস্ট পয়েন্ট। মালঞ্চ নদীর তীরে বনের শ্বাসমূল ও গাছ কেটে সাবাড় করে পর্যটকদের জন্য পাকা আবাসস্থল, রাস্তা ও জেটি নির্মাণ করা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী ট্যুরিস্ট ব্যবসায়ীরা সামাজিক বনায়ন ও প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট বনভূমি ধ্বংস করে বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য গড়ছে, যা বনের বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য পুরোপুরি নষ্ট করে দিচ্ছে।
সুন্দরবন রক্ষায় বিষফোড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্রমবর্ধমান দূষণ। গত ১০ বছরে এই বনে দূষণের মাত্রা প্রায় ৭ গুণ বেড়েছে। বনের চারপাশের শিল্প-কারখানার বর্জ্য এবং পশুর নদীতে তেলের ছিটকানি জলজ প্রাণীদের জন্য মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, পশুর নদীতে বিষাক্ত পারদের মাত্রা অনুমোদিত সীমার চেয়ে ১০ গুণ বেশি। এর চেয়েও আশঙ্কাজনক তথ্য হলো, সুন্দরবন সংলগ্ন নদ-নদীর ১৭ প্রজাতির মাছের দেহে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। বঙ্গোপসাগর থেকে প্রতি বছর ৪ মিলিয়ন টন মাইক্রোপ্লাস্টিক এই বনের নদীগুলোতে ভেসে আসছে। এই দূষিত মাছ খেলে মানুষের লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধীতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তীব্র হচ্ছে। এছাড়া যথাযথ সচেতনতার অভাবে পর্যটকরা বনের যত্রতত্র প্লাস্টিক পলিথিনসহ নানা বর্জ্য ফেলে রাখে, যা মারাত্মক পরিবেশ দূষণ করছে।
সুন্দরবনের অহংকার রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও মায়াবী হরিণ আজ চোরা শিকারিদের নিয়মিত লক্ষ্যবস্তু। পাচারকারীদের হাতে প্রতি বছর গড়ে ৩ থেকে ৫টি বাঘসহ অসংখ্য বন্যপ্রাণী প্রাণ হারাচ্ছে। অবৈধভাবে শিকার করে প্রাণীদের চামড়া পাচার করা হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, কতিপয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে অভয়াশ্রমে বিষ দিয়ে অবৈধভাবে মাছ শিকার করা হচ্ছে। ফারাক্কা বাঁধের কারণে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে বনের লবণাক্ততাও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে, যা সুন্দরবনের প্রাণশক্তি ম্যানগ্রোভ গাছগুলোকে ধীরে ধীরে মেরে ফেলছে।
সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম নিরবচ্ছিন্ন জোয়ারধৌত ম্যানগ্রোভ বনভূমি। প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের সুন্দরবন পদ্মা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীত্রয়ের অববাহিকার বদ্বীপ অঞ্চলে অবস্থিত। এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার কিছু অংশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর চব্বিশ পরগনা ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলাজুড়ে বিস্তৃত। ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ইউনেস্কো সুন্দরবনকে বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ব্রিটিশ ভারত বিভাগের পর ১০ হাজার বর্গ কি.মি. এই বনের দুই-তৃতীয়াংশ বাংলাদেশে, বাকিটা ভারতে পড়েছে। ২০০ বছর আগে সুন্দরবনের এই অংশের আয়তন ছিল প্রায় ১৬,৭০০ বর্গ কি.মি.। প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণে কমতে কমতে বর্তমান আয়তন হয়েছে পূর্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের সমান।
২০০১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি খুলনায় প্রথমবার খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, রূপান্তর-বাপা সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে জাতীয় সুন্দরবন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘সুন্দরবন দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় এবং জাতীয়ভাবে ‘সুন্দরবন দিবস’ পালনে সরকারের কাছে দাবি জানানো হয়। ২০০২ সাল থেকে সুন্দরবন-সংলগ্ন জেলাগুলোতে ১৪ ফেব্রুয়ারি সুন্দরবন দিবস পালন করা হচ্ছে।
সুন্দরবনকে বাঁচাতে হলে কেবল দিবস পালনই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক টেকসই নিরাপত্তা ব্যবস্থা। রাষ্ট্রের কঠোর আইন বাস্তবায়ন ও নজরদারির পাশাপাশি পরিবেশবাদী সংগঠনকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। একইসাথে বিভিন্ন সভা-সেমিনার-প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পর্যটক ও সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে। স্যাটেলাইট, ড্রোন এবং রিয়েল-টাইম সেন্সর ব্যবহার করে নিয়মিত বন পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বন সংলগ্ন এলাকায় সব ধরনের পরিবেশবিরোধী শিল্প-কারখানা বন্ধ করতে হবে এবং আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, সুন্দরবন কেবল বনজ সম্পদের উৎস নয়, এটি আমাদের ফুসফুস যা সারা দেশকে অক্সিজেন সরবরাহ করে। এই বনকে টিকিয়ে রাখা মানেই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এক নিরাপদ পৃথিবী উপহার দেওয়া। মুনাফালোভী ও সকল বনবিনাশী কর্মকাণ্ড রুখে দিয়ে আমাদের এই সবুজ জননীকে চিরতরে সুরক্ষা দেওয়া হোক সুন্দরবন দিবসের এই হোক অঙ্গীকার।
লেখক : সাংবাদিক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

মো. সোহাগ রাসিফ