সুন্দরবনে বাড়ছে বাঘ, তবে হরিণ শিকারে বাড়ছে উদ্বেগ
সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে নানা বয়সী বাঘের আনাগোনা বেড়েছে। ছয় বছরের ব্যবধানে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় আশার আলো দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে একইসঙ্গে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে বাঘের প্রধান খাদ্য হরিণের সংকট। অমাবস্যা ও পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে নিয়মিত হরিণ শিকারের ফলে বাঘের খাদ্যভিত্তি মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে।
বনবিভাগের তথ্য অনুসারে, ২০১৮ সালের জরিপে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ১১৪টি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জরিপে তা বেড়ে ১২৫টিতে দাঁড়িয়েছে। বাঘের মোট খাদ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে হরিণের মাংস থেকে। বাকি ২০ শতাংশ আসে শূকর, বনবিড়াল ও বানর থেকে। তবে নিয়মিত হরিণ শিকারের কারণে বনে বাঘের প্রয়োজনীয় শিকারের প্রাপ্যতা কমে যাচ্ছে।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা জানান, গহীন বনে পাতার ফাঁদ ও চেতনানাশক ট্যাবলেট ব্যবহার করে হরিণ শিকার করা হচ্ছে। এর ফলে চাঁদপাই, শরণখোলা, সাতক্ষীরা ও খুলনা রেঞ্জে বাঘের খাদ্যসংকট তীব্র হচ্ছে। খাদ্যের অভাবে বাঘ নদী ও খাল পেরিয়ে লোকালয়ে চলে আসার ঝুঁকিও বাড়ছে। একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘের সপ্তাহে কমপক্ষে ৫০ থেকে ৬০ কেজি মাংসের প্রয়োজন হয় বলে জানান তারা।
‘সুন্দরবন’ শীর্ষক প্রকাশনায় উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৩ সালের জরিপ অনুযায়ী বনে চিত্রা হরিণের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩১ হাজার ৬০৪টি।
সুন্দরবন (পূর্ব) বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬১ হাজার ৪০০টির বেশি বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে। অপরদিকে, সুন্দরবন (পশ্চিম) বিভাগ গত দুই বছরে তিন হাজার ১৪৮ ফুট ফাঁদ উদ্ধার করেছে। একই সময়ে শিকারীদের কাছ থেকে এক হাজার ১৪৮ কেজি হরিণের মাংস উদ্ধার করা হয়। এসব ঘটনায় ৭২টি মামলা হয়েছে এবং ১৯২ জনকে আসামি করা হয়েছে।
সুন্দরবন (পূর্ব) বন বিভাগীয় কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, পাথরঘাটা উপজেলার বিশ্বাসপাড়া, চরদুয়ানী, গ্যাংপাড়া ও শরণখোলা এলাকায় উদ্ধার হওয়া ফাঁদের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। একইভাবে সুন্দরবন (পশ্চিম) বিভাগের কালাবগি ও বানিয়াখালিতেও বিপুল ফাঁদ উদ্ধার হয়েছে।
বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের খুলনা বিভাগের বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল বলেন, চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জে বর্তমানে বাঘের আনাগোনা বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। এ প্রাণীর ৮০ শতাংশ খাদ্য হরিণের মাংস থেকে এবং বাকি ২০ শতাংশ শূকর, বনবিড়াল ও বানরের মাংস থেকে আসে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বাঘ বিশেষজ্ঞ এম এ আজিজ বলেন, পেতে রাখা ফাঁদ বাঘের জন্য বড় হুমকি। টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান (২০১৮–২০২৭)-এও বিষয়টির উল্লেখ আছে। অনেক বনজীবীর আয়ের দ্বিতীয় উৎস হিসেবে হরিণ শিকার গড়ে উঠেছে। স্থানীয় বাজারে হরিণের মাংসের চাহিদা বাড়ায় অমাবস্যা ও পূর্ণিমায় শিকার বেড়ে যায়। যে পরিমাণ হরিণ থাকা দরকার, সে পরিমাণ এখন নেই। পাশাপাশি ফাঁদে আটকা পড়ে বাঘের অঙ্গহানিসহ মৃত্যুঝুঁকিও বাড়ছে।
সম্প্রতি চাঁদপাই রেঞ্জের শরর্কির খাল এলাকা থেকে ফাঁদে আটকা পড়া একটি আহত বাঘকে উদ্ধার করা হয়। বর্তমানে সেটি খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশ (ইউএনবি)