ভবদহে জলাবদ্ধতা নিরসনে নতুন মহাপরিকল্পনায় কি স্থায়ী মুক্তি মিলবে?
উঠানে হাঁটু সমান স্থির জল, ওপরে ভাসছে শ্যাওলা। প্রথম দর্শনে পরিত্যক্ত মনে হলেও এটিই রেখা হালদারের সংসার। গত সাত মাস ধরে স্বামী-সন্তান নিয়ে এই জল-কাদার মাঝেই বসবাস করছেন তিনি। যশোরের কেশবপুর উপজেলার মনোহরনগরের এই চিত্রটি আজ ভবদহ অঞ্চলের লাখো মানুষের চরম দুর্দশার এক খণ্ডচিত্র মাত্র।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভবদহ অঞ্চলের গ্রামগুলোতে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম এখন বাঁশের সাঁকো। অধিকাংশ বাড়ির রান্নাঘর ও গোয়ালঘর কর্দমাক্ত, টিউবওয়েল আর টয়লেট তলিয়ে আছে নোংরা জলে।
স্থানীয় বাসিন্দা গৌরী হালদার আক্ষেপ করে বলেন, ‘কতদিন যে উঠানে শুকনা মাটি দেখিনি, তার হিসেব নেই। বাচ্চাদের খেলার জায়গা নেই, গবাদি পশু নিয়ে বর্ষাকালে রাস্তায় আশ্রয় নিতে হয়।’
যশোরের অভয়নগর, মণিরামপুর, কেশবপুর এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত ভবদহ অঞ্চল। স্থানীয়দের মতে, মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদী পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। গত চার দশক ধরে এই স্থায়ী জলাবদ্ধতায় বন্দি প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ।
নতুন তিন মেগা প্রকল্প: শুরু হয়েছে তোড়জোড়
বিগত সময়ে হাজার কোটি টাকার ২১টি প্রকল্প নিলেও ভবদহবাসীর ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। বারংবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল ভবদহ প্রকল্প। তবে এবার পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) নতুন করে তিনটি বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে:
* নদী ও খাল খনন: সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮১.৫ কিলোমিটার নদী এবং ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৪টি খাল খননের কাজ শুরু হয়েছে।
* সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ: ৪৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা ব্যয়ে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
* আমডাঙ্গা খাল সংস্কার: বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ৪৯ কোটি ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে অভয়নগরের আমডাঙ্গা খাল সংস্কারের প্রক্রিয়া চলছে।
এ ছাড়া আপৎকালীন পানি সরাতে আটটি শক্তিশালী পাম্প স্থাপনের কাজও চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন পাউবো যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী।
টিআরএম ছাড়া সুফল নিয়ে সংশয়
প্রকল্পগুলো শুরু হলেও সাধারণ মানুষ ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কাজ নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে। ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, ‘টিআরএম (জোয়ারাধার) চালু না করে শুধু নদী কাটলে দুই পূর্ণিমার জোয়ারেই নদী আবার পলিতে ভরাট হয়ে যাবে। এটি কেবল অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়।’
ভুক্তভোগীদের দাবি, স্থায়ী সমাধানের জন্য নদী খননের পাশাপাশি চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় মাথাভাঙ্গা নদীর সঙ্গে ভৈরব নদের পুনঃসংযোগ দিতে হবে। তবে পাউবো বলছে, পলি ব্যবস্থাপনার জন্য ২৮০ কোটি টাকার আরও একটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে যা বাস্তবায়িত হলে জলাবদ্ধতা দূর হবে।
ভবদহ সমস্যা সমাধানে সম্প্রতি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পর্যালোচনা সভার ডাক দিয়েছেন বিদ্যুৎ, খনিজ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। উক্ত সভায় চলমান প্রকল্পগুলোর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং স্থায়ী সমাধানের পথে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে আশা করছেন পানিবন্দি মানুষ।
লেখক: এনটিভি অনলাইন প্রতিনিধি; (যশোর) মনিরামপুর, কেশবপুর।

এনামুল হাসান