ছেলেটা আমাদেরকে সম্মানিত করে গেছে
আবু সাঈদ আমার চতুর্থ সন্তান। কিন্তু সব সন্তানের চেয়ে সাঈদ একটু অন্যরকম ছিল। স্কুল থেকে আসার পর তার খেলার দিকে কম মনোযোগ থাকতো, সর্বদা ঝোঁক ছিল পড়াশুনার দিকে।
প্রচন্ড অভাবের সংসার আমাদের। অনেকগুলো ছেলে-মেয়ে। নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। ওদের পড়ার খরচ যোগানো একরকম অসম্ভব ছিল। কিন্তু ছেলেটা পড়ালেখায় ভাল ছিল জন্য পেরেছে।
ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পাওয়ায় ছেলের সুবিধা হয়েছিল। ও নিজের বৃত্তির টাকায় নিজের খরচটা চালিয়ে নিয়েছিল। আমরা ওর টাকায় হাত দিইনি।
ছেলেটা আমার উঁচা-লম্বা হওয়ায় পাড়া-প্রতিবেশীরা আমাকে বলত, ছেলেকে যেন আমি আর্মিতে চাকরির জন্য দিই। সাঈদ একথা শুনে বিরক্ত হয়। বলে, সে এসব চাকরি করবে না। আমার ছেলের ইচ্ছে ছিল, বড় অফিসার হবে। সেই ভাবে সে প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
ছেলেটা একটু আলাদা ধরণের। কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফেরার সময় কিছু না কিছু নিয়ে আসত। খুবই সাধারণ কিছু, কিন্তু নিয়ে আসত। যেমন কখনও কলা, কখনও ডিম ইত্যাদি নিয়ে আসতো। বাড়িতে এসে কোন সমস্যা দেখলে সেটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ত। যেমন বাড়ি এসে দেখল যে একটা গরু অসুস্থ, সাঈদ সেটা করার জন্য উদ্যোগ নিলো।
ছেলেটা আমার এতটাই ভাল ছিল যে, ওকে নিয়ে আমার কোন চিন্তা করতে হয়নি কখনও। আমার অন্য সন্তানদের নিয়ে খুব চিন্তা হতো, সাঈদকে নিয়ে তেমন কোন চিন্তা ছিল না। আমার মনে হয়েছিল, ওর কাজের অভাব হবে না। সন্তানদের মধ্যে যাদেরকে নিয়ে চিন্তা করেছি, তারা আজ আমার কাছে আছে; আর যাকে নিয়ে কখনও চিন্তাই করিনি, সে-ই আজ নেই। সে-ই চলে গেছে! তাকে নিয়ে চিন্তা করি, ভাবি জীবন তো খুব ছোট, সবাইকে একদিন চলে যেতে হয়। জন্ম নিলে মানুষকে তো মরতেই হয়।
আর, কোন না কোন ভাবে মানুষ মারা যায়। তবে আমার জন্য গর্বের যে, ছেলেটা আমাদের এই দেশের জন্য মারা গেছে। মানুষের জন্য সে মারা গেছে। আমার ছেলের মৃত্যু সাধারণ কিছু নয়।
মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ছেলেটা আমাদের সম্মানিত করে গেছে।
লেখক : শহিদ আবু সাঈদের মা (লেখাটি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া)

মনোয়ারা বেগম