বিশ্বকাপের বিদায়ী কিংবদন্তিদের গল্প
প্রতিটি বিশ্বকাপে বেশ কিছু খেলোয়াড় তাদের পারফরম্যান্সে আমাদের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেন। কারও নিখুঁত পাস, কারও দুর্দান্ত গোল, কারও অবিশ্বাস্য সেভ কিংবা নেতৃত্ব বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি মানুষের মনে আজীবন স্মৃতি হিসেবে রয়ে যায়। একসময় তারা মাঠ থেকে অবসরে যান, কিন্তু আমাদের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যান না; তাদের গল্প কখনো শেষ হয় না।
এবারের বিশ্বকাপের পরে বেশ কিছু তারকা খেলোয়াড়কে আমরা ভবিষ্যতে মিস করবো। যেমন: নেইমার, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, লুকা মদরিচ, হয়তোবা লিওনেল মেসি ও হ্যারি কেইন। এরা সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে সেরাদের সেরা। ১৯৯০ বিশ্বকাপ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত অবসরে যাওয়া কিছু বিখ্যাত ফুটবল কিংবদন্তিকে নিয়েই আমাদের আজকের এই বিশেষ আয়োজন, যারা নিজেদের প্রতিভা, আবেগ আর লড়াই দিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন।
১৯৯০ – ইতালি বিশ্বকাপ
- সালভাতোরে শিল্লাচি (ইতালি): ক্যারিয়ারে মাত্র একটিই বিশ্বকাপ খেলেছিলেন, আর সেটি ছিল ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপ। ঘরের মাটিতে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপে তিনি ৬ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা (গোল্ডেন বুট) এবং সেরা খেলোয়াড় (গোল্ডেন বল) নির্বাচিত হয়েছিলেন।
- গ্যারি লিনেকার (ইংল্যান্ড): ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে ৬ গোল দিয়ে গোল্ডেন বুট অর্জন করেছিলেন। ১৯৯০ সালের আসরেও তিনি ইংল্যান্ডের হয়ে দুর্দান্ত পারফর্ম করেন এবং দলকে সেমিফাইনালে নিয়ে যান।
- ওয়াল্টার জেঙ্গা (ইতালি): স্বাগতিক ইতালির এই গোলরক্ষক টানা ৫ ম্যাচে বা ৫১৯ মিনিট কোনো গোল হজম না করার রেকর্ড গড়েন। ৩৬ বছর পর ২০২৬ সালে এবার তার রেকর্ড ভাঙলেন স্পেনের উনাই সিমোন।
- রুড গুলিত (হল্যান্ড/নেদারল্যান্ডস): ১৯৮৭ সালে তিনি বিশ্বের সেরা ফুটবলার হিসেবে ব্যালন ডি'অর লাভ করেছিলেন। তার ফুটবল ক্যারিয়ারের শেষ ও একমাত্র ফিফা বিশ্বকাপ ছিল ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপ।
- মার্কো ফন বাস্তেন (নেদারল্যান্ডস): ইনজুরির কারণে এরপর আর তিনি বিশ্বকাপ খেলতে পারেননি।
১৯৯৪ – যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপ
- দিয়েগো ম্যারাডোনা (আর্জেন্টিনা) : ১৯৮৬ বিশ্বকাপে দলকে একক নৈপুণ্যে শিরোপা জেতানো এই কিংবদন্তি 'হ্যান্ড অব গড' গোল দিয়ে আলোচনার শীর্ষে ছিলেন। পরবর্তীতে ড্রাগ টেস্টে পজিটিভ আসায় ১৯৯৪ বিশ্বকাপে মাঝপথেই নিষিদ্ধ হয়ে বিদায় নেন এই কিংবদন্তি।
- সের্হিও গয়কোচিয়া (আর্জেন্টিনা) : ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক হিসেবে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। দ্বিতীয় গোলরক্ষক হওয়া সত্ত্বেও টাইব্রেকারে দুর্দান্ত সেভ করে দলকে ফাইনালে তোলেন এবং ১৯৯৪ সালের আসরেও আর্জেন্টিনা দলের স্কোয়াডে ছিলেন।
- ফ্রাঙ্কো বারেসি (ইতালি) : ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপ জয়ী ইতালি দলের সদস্য ছিলেন। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে দলকে ফাইনালে নিয়ে যান, যদিও ব্রাজিলের কাছে ট্রাইবেকারে ইতালির স্বপ্নভঙ্গ হয়।
- রোমারিও (ব্রাজিল) : বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ও সর্বকালের অন্যতম গোলদাতা। ব্রাজিলের চতুর্থ বিশ্বকাপ জয়ে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বল জিতেছিলেন। ক্লাব ও দেশের হয়ে ক্যারিয়ারে তিনি ৭০০-এরও বেশি গোল করেছেন।
- রজার মিল্লা (ক্যামেরুন) : ১৯৯০ বিশ্বকাপে ৩৮ বছর বয়সে তিনি সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমে ৪টি গোল করেন এবং ক্যামেরুনকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে গিয়ে তাঁর নাচানাচি করে গোল উদ্যাপনের স্টাইলটি দারুণ জনপ্রিয় ছিল।
- ক্লদিও তাফারেল (ব্রাজিল) : ১৯৯৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে ব্রাজিলের অবিসংবাদিত নায়ক ছিলেন। টুর্নামেন্টের ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে টাইব্রেকারে রবার্তো ব্যাজিওর শটটি আটকে দিয়ে তিনি ব্রাজিলকে শিরোপা এনে দেন।
১৯৯৮ – ফ্রান্স বিশ্বকাপ
- লোথার ম্যাথাউস (জার্মানি) : ১৯৯০ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অধিনায়ক। তিনি ১৯৮২ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচটি বিশ্বকাপে রেকর্ড ২৫টি ম্যাচ খেলে অনন্য রেকর্ডের অধিকারী হন। তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে অসাধারণ নেতৃত্ব ও চার গোলের ওপর ভর করে পশ্চিম জার্মানির তৃতীয়বার বিশ্বকাপ জয়। টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের জন্য তিনি 'গোল্ডেন বল' অর্জন করেন।
- রবার্তো ব্যাজিও (ইতালি) : তিনি ইতালির হয়ে তিনটি বিশ্বকাপে (১৯৯০, ১৯৯৪, ১৯৯৮) গোল করা একমাত্র ইতালীয় খেলোয়াড়। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে টাইব্রেকারে তার মিস করা পেনাল্টিটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিষণ্ণ মুহূর্ত। সেই আসরেই অসাধারণ পারফরম্যান্সের জন্য তিনি 'গোল্ডেন বল' জিতেছিলেন।
- ইয়ুর্গেন ক্লিন্সম্যান (জার্মানি) : সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অর্জন হলো ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপ জয় এবং ক্যারিয়ারে মোট ১১টি বিশ্বকাপ গোল করা। নব্বইয়ের দশকের অন্যতম সেরা এই স্ট্রাইকার পশ্চিম জার্মানির হয়ে ১৯৯০ সালের ফিফা বিশ্বকাপ এবং ১৯৯৬ সালের উয়েফা ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জয় করেন।
- বেবেতো (ব্রাজিল) : ১৯৯৪ বিশ্বকাপে রোমারিওর সাথে তাঁর জুটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা জুটি হিসেবে পরিচিত। তাঁর বিখ্যাত 'বেবি সেলিব্রেশন' উদ্যাপনটি আজও ফুটবল ভক্তদের মনে দাগ কেটে আছে।
- মাইকেল লাউড্রপ (ডেনমার্ক) : এই কিংবদন্তি ফুটবলার ক্যারিয়ারে মাত্র দুটি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৯৮ সালের এই বিশ্বকাপে ডেনমার্ক কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছেছিল এবং টুর্নামেন্ট শেষে তিনি ফিফার 'ওয়ার্ল্ড কাপ অল-স্টার টিম'-এ জায়গা পান।
- ডেনিস বার্গক্যাম্প (নেদারল্যান্ডস) : ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে শেষ মুহূর্তে তাঁর করা আইকনিক গোলটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম সেরা গোল হিসেবে বিবেচিত হয়।
- ডেভিস সুকের (ক্রোয়েশিয়া) : ৬৮ ম্যাচে ৪৫ গোল নিয়ে তিনি ক্রোয়েশিয়ার সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে ৬ গোল করে তিনি গোল্ডেন বুট জেতেন এবং ক্রোয়েশিয়াকে ৩য় স্থান অর্জনে সহায়তা করেন।
২০০২ – জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বকাপ
- পাওলো মালদিনি (ইতালি) : তিনি ইতালির সর্বকালের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার এবং অধিনায়ক। জীবনে চারটি বিশ্বকাপে মোট ২৩টি ম্যাচ খেলেছেন, যা ইতালির ইতিহাসে সর্বোচ্চ এবং বিশ্বমঞ্চে তৃতীয় সর্বোচ্চ।
- রিভালদো (ব্রাজিল) : ১৪টি ম্যাচ খেলে ৮ গোল এবং ৩টি অ্যাসিস্ট করেন। বিখ্যাত 'থ্রি আর' গড়ে ব্রাজিলের পঞ্চম বিশ্বকাপ জয়ে অসামান্য অবদান রাখেন। তিনি ২০০২ সালের বিশ্বকাপ জয়ী ব্রাজিল দলের অন্যতম প্রধান তারকা ছিলেন।
- হাকান শুকুর (তুরস্ক) : জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত এই টুর্নামেন্টের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে মাত্র ১০.৮৯ সেকেন্ডে গোল করেছিলেন, যা ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে আজও দ্রুততম গোলের রেকর্ড হিসেবে টিকে আছে।
- মার্ক উইলমটস (বেলজিয়াম) : তিনি চার বিশ্বকাপে ৫ গোল করে বেলজিয়ামের পক্ষে সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে রেকর্ড গড়েছিলেন।
২০০৬ – জার্মানি বিশ্বকাপ
- জিনেদিন জিদান (ফ্রান্স) : ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফরাসি কিংবদন্তি। তিনি নিখুঁত বল কন্ট্রোল, ড্রিবলিং এবং দূরদৃষ্টির জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তিনবার (১৯৯৮, ২০০০, ২০০৩) ফিফা ওয়ার্ল্ড প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার এবং ১৯৯৮ সালে ব্যালন ডি'অর অর্জন করেন। বিশ্বকাপ ফাইনালে ইতালির ডিফেন্ডার মার্কো মাতেরাজ্জিকে মাথা দিয়ে গুঁতো দেওয়ার ঘটনাটি তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আলোচিত বিতর্ক।
- রোনালদো (ব্রাজিল) : সর্বকালের অন্যতম সেরা ও বিধ্বংসী স্ট্রাইকার। তিনি ব্রাজিলের ১৯৯৪ ও ২০০২ সালের বিশ্বকাপ জয়ী দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন। 'দ্য ফেনোমেনন' ও 'আর ৯' ডাকনামে খ্যাত এই তারকা ২০০২ সালের বিশ্বকাপে ৮ গোল করে 'গোল্ডেন বুট' জেতেন এবং ফাইনালে জোড়া গোল করে দলকে শিরোপা এনে দেন। তিনি দীর্ঘদিন বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা (১৫ গোল) ছিলেন।
- রবার্টো কার্লোস (ব্রাজিল) : ইতিহাসের অন্যতম সেরা এবং সর্বকালের অন্যতম আক্রমণাত্মক 'লেফট-ব্যাক' ফুটবলার। অবিশ্বাস্য গতি এবং বুলেট গতির (১০৫ মাইল বা ১৬৯ কিমি/ঘণ্টা) বাঁকানো ফ্রি-কিকের জন্য তিনি 'দ্য বুলেট ম্যান' হিসেবে বিশ্বজুড়ে তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করেন।
- পাভেল নেদভেদ (চেক প্রজাতন্ত্র) : এই কিংবদন্তি মিডফিল্ডার তাঁর ফুটবল ক্যারিয়ারে মাত্র একবারই বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন এবং মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছেন।
- লুইস ফিগো (পর্তুগাল) : তিনি পর্তুগালের সর্বকালের অন্যতম সেরা ও কিংবদন্তি ফুটবলার। ২০০০ সালে ব্যালন ডি'অর এবং ২০০১ সালে ফিফা ওয়ার্ল্ড প্লেয়ার অফ দ্য ইয়ার পুরস্কার জয় করেন।
- অলিভার কান (জার্মানি) : তিনি একমাত্র গোলরক্ষক যিনি বিশ্বকাপে সেরা খেলোয়াড় হিসেবে "অ্যাডিডাস গোল্ডেন বল" ও সেরা গোলরক্ষক হিসেবে "লেভ ইয়াসিন অ্যাওয়ার্ড" জয় করেছেন।
২০১০ – দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ
- কার্লেস পুয়োল (স্পেন) : তিনি স্পেনের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ও নির্ভীক ডিফেন্ডার। ক্যারিয়ারের পুরোটা সময় বার্সেলোনায় কাটিয়ে তিনি ৬টি লা লিগা এবং ৩টি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন। এছাড়া স্পেনের জার্সিতে ২০১০ বিশ্বকাপ এবং ২০০৮ ইউরো জয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন।
- জোয়ান ক্যাপডেভিলা (স্পেন) : তিনি মূলত 'লেফট-ব্যাক' হিসেবে খেলতেন। স্পেনের সর্বকালের সেরা সোনালী প্রজন্মের এই ডিফেন্ডার ২০১০ সালের বিশ্বকাপ এবং ২০০৮ সালের ইউরো জয়ী স্প্যানিশ স্কোয়ডের অন্যতম প্রধান খেলোয়াড় ছিলেন।
২০১৪ – ব্রাজিল বিশ্বকাপ
- মিরোস্লাভ ক্লোসা (জার্মানি) : তিনি জার্মানির ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার এবং বিশ্বকাপ ফুটবলের অন্যতম কিংবদন্তি। তিনি ২০০২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত চার বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে মোট ১৬ গোল করেন, যা দীর্ঘ ১২ বছর ধরে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড ছিল।
- ডেভিড ভিলা (স্পেন) : তিনি স্পেন ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। ৯৮ ম্যাচে ৫৯ গোল করা এই স্ট্রাইকার ২০১০ বিশ্বকাপ ও ২০০৮ ইউরো জয়ী স্প্যানিশ দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন।
- দিয়েগো ফোরলান (উরুগুয়ে) : তিনি উরুগুয়ের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা কিংবদন্তি এবং প্রাক্তন ফরোয়ার্ড। ২০১০ সালের বিশ্বকাপে অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শন করে তিনি আসরের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে 'গোল্ডেন বল' জিতেছিলেন এবং উরুগুয়েকে সেমিফাইনালে নিয়ে যান।
- ফিলিপ লাম (জার্মানি) : ২০০৪ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জার্মানি জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন। ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে তাঁর অধিনায়কত্বেই জার্মানি চ্যাম্পিয়ন হয়। ক্যারিয়ারে তিনি অবিশ্বাস্য পর্যায়ের ফেয়ার প্লে বজায় রেখেছিলেন; পুরো ফুটবল জীবনে তিনি কোনোদিন লাল কার্ড দেখেননি।
- জাবি আলোনসো (স্পেন) : তিনি একজন কিংবদন্তি ফুটবলার। স্পেনের জার্সিতে ১১৪টি ম্যাচ খেলেছেন। ২০১০ সালের বিশ্বকাপ এবং ইউরো ২০০৮ ও ইউরো ২০১২ জয়ে তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন।
- দিদিয়ের দ্রগবা (আইভরি কোস্ট) : সর্বকালের অন্যতম সেরা আফ্রিকান খেলোয়াড়। তিনি মোট তিন বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছেন। জাপানের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়া ম্যাচে বদলি হিসেবে মাঠে নামার পরপরই তাঁর আইভরি কোস্ট দ্রুত ২ গোল করে ম্যাচটি জিতে নেয়, যা বিশ্বকাপে তাঁর লিডারশিপের বড় প্রমাণ।
- স্টিভেন জেরার্ড (ইংল্যান্ড) : তিনি ইংল্যান্ডের হয়ে ১১৪টি ম্যাচ খেলেছেন এবং ২১ গোল করেছেন। ২০১০ ও ২০১৪ এর ফিফা বিশ্বকাপ এবং ২০১২ এর উয়েফা ইউরোতে জাতীয় দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৮ – রাশিয়া বিশ্বকাপ
- আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা (স্পেন) : ২০০৮ ও ২০১২ সালে উয়েফা ইউরো এবং ২০১০ সালের ফিফা বিশ্বকাপ জয়ী স্পেনের মিডফিল্ডের মূল স্তম্ভ ছিলেন। বার্সেলোনার হয়ে কাটানো এই কিংবদন্তি ২০১০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের হয়ে জয়সূচক গোলটি করেছিলেন।
- মেসুত ওজিল (জার্মানি) : তুর্কি বংশোদ্ভূত বিশ্বখ্যাত জার্মান ফুটবলার, যিনি তাঁর প্রজন্মের অন্যতম সেরা অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার ও প্লেমেকার হিসেবে স্বীকৃত। নিখুঁত পাসিং ও অসাধারণ অ্যাসিস্ট করার দক্ষতার কারণে তাঁকে 'অ্যাসিস্ট-কিং' বলা হয়ে থাকে।
- জাভিয়ের মাশ্চেরানো (আর্জেন্টিনা) : 'এল জেফেসিটো' (ছোট বস) ডাকনামে পরিচিত এই তারকা মূলত ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার বা সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হিসেবে খেলতেন।
- রাফায়েল মার্কেজ (মেক্সিকো) : তিনি মেক্সিকোর হয়ে মোট ৫টি বিশ্বকাপ খেলেছেন এবং অধিনায়ক হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি 'এল কাইজার' নামেও পরিচিত। একজন ডিফেন্ডার হওয়া সত্ত্বেও তিনি ২০০৬, ২০১০ এবং ২০১৪ বিশ্বকাপে মেক্সিকোর হয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোল করেন।
২০২২ – কাতার বিশ্বকাপ
- ইডেন হ্যাজার্ড (বেলজিয়াম) : তিনি মূলত উইঙ্গার বা অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে খেলতেন। দুর্দান্ত ড্রিবলিং, ক্ষিপ্রতা এবং পাসিংয়ের জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ছিলেন। বিশ্বকাপে হ্যাজার্ডের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপ, যেখানে তিনি বেলজিয়ামকে তৃতীয় স্থানে নিয়ে যান, যা দেশটির বিশ্বকাপের ইতিহাসে সেরা সাফল্য।
- গ্যারেথ বেল (ওয়েলস) : বাঁ পায়ের দুর্দান্ত শট, ক্ষিপ্র গতি এবং অসাধারণ হেড করার দক্ষতার জন্য পরিচিত। গ্যারেথ বেলের নেতৃত্বেই ওয়েলস ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে।
- লুইস সুয়ারেজ (উরুগুয়ে) : তিনি উরুগুয়ের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা (১৪৩ ম্যাচে ৬৯ গোল) এবং আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার। তবে বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের পাশাপাশি তিনি মাঠে বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্যও আলোচিত ছিলেন (যেমন কোয়ার্টার ফাইনালে ঘানার বিপক্ষে ইচ্ছাকৃত হ্যান্ডবল)।
- পেঁপে (পর্তুগাল) : জন্মসূত্রে ব্রাজিলীয় হলেও তিনি পর্তুগাল জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। সেন্টার-ব্যাক হিসেবে খেলা এই তারকার নেতৃত্বে পর্তুগাল ২০১৬ সালে প্রথমবার উয়েফা ইউরো শিরোপা জেটে। তিনি ৩৯ বছর ২৮৩ দিন বয়সে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে গোল করা ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড় হওয়ার বিশ্বরেকর্ড গড়েন।
- সার্জিও বুসকেটস (স্পেন) : ২০১০ সালের বিশ্বকাপ এবং ২০১২ ইউরো জয়ী দলের অবিচ্ছেদ্য সদস্য ছিলেন। নিখুঁত পাসিং এবং ট্যাকল ছাড়াই বল কেড়ে নেওয়ার অনন্য ক্ষমতার জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন।
- হুগো লরিস (ফ্রান্স) : ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ জয়ী দলের অবিসংবাদিত অধিনায়ক। ফ্রান্স জাতীয় দলের হয়ে তিনি ১৪৫টি ম্যাচ খেলেছেন এবং ১২১ বার অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর নেতৃত্বেই ফ্রান্স বিশ্বকাপ জয় করে এবং ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠে।
- থমাস মুলার (জার্মানি) : ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকে জার্মানির বিদায়ের পর, ২০২৪ সালে উয়েফা ইউরোর কোয়ার্টার ফাইনাল শেষে তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে পুরোপুরি অবসর ঘোষণা করেন।
২০২৬ – যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো বিশ্বকাপ : বিদায়ের দোড়গোড়ায় যারা
- নেইমার জুনিয়র (ব্রাজিল) : ব্রাজিলীয় পক্ষে সর্বকালের সর্বোচ্চ ৮০টি আন্তর্জাতিক গোল নিয়ে জাতীয় দলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। তিনি তার ড্রিবলিং, গতি এবং ফিনিশিংয়ের জন্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত।
- মানুয়েল নয়্যার (জার্মানি) : জার্মানির ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক এবং বায়ার্ন মিউনিখের নিয়মিত গোলরক্ষক। এই তারকা ২০১৪ সালে জার্মানিকে বিশ্বকাপ জেতান এবং গোল্ডেন গ্লাভস অর্জন করেন।
- নিকোলাস ওতামেন্দি (আর্জেন্টিনা) : ২০২২ সালের বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা দলের একজন অন্যতম ডিফেন্ডার। মাঠের খেলায় তিনি তার শারীরিক দৃঢ়তা, ট্যাকলিং ক্ষমতা এবং হেডে দক্ষতার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।
এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর ঘোষণা না দিলেও ২০২৬ বিশ্বকাপকেই অনেকেই যাদের শেষ বিশ্বকাপ হিসেবে দেখছেন :
- লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা)
- ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো (পর্তুগাল)
- লুকা মদরিচ (ক্রোয়েশিয়া)
ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, এটি কোটি মানুষের আবেগ ও অনুভূতির এক অপূর্ব মিলনমেলা। দশক পেরিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ফুটবল তার রূপ বদলালেও মাঠের সবুজ ঘাসে কিংবদন্তিদের সৃষ্টি করা জাদুকরী মুহূর্তগুলো চিরকাল অম্লান হয়ে থাকে। ১৯৯০ থেকে শুরু করে ২০২৬ বিশ্বকাপ পর্যন্ত কত তারকার জন্ম হয়েছে, কত ইতিহাসের পাতা ওল্টানো হয়েছে! সময়ের বিবর্তনে এই মহাতারকারা একে একে মাঠ ছেড়ে বিদায় নিচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু তাদের ঘাম, রক্ত আর লড়াইয়ে গড়া সোনালী ইতিহাস ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবে। নতুন প্রজন্ম আসবে, নতুন তারা ফুটবে, কিন্তু এই কিংবদন্তিদের রেখে যাওয়া গল্পগুলোর আবেদন কোনোদিন ফুরোবে না।
লেখক : সাংবাদিক

শাহরিয়ার ইসলাম