শেকড়ের টানে
এক পশলা আবেগের নাম ‘বাড়ি’
ঈদে বাড়ি ফেরা মানে শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া নয়, এটি হলো যান্ত্রিক শহরের ইট-পাথর আর ব্যস্ততার দেয়াল ভেঙে নিজের অস্তিত্বের কাছে ফিরে যাওয়া। সারা বছর আমরা জীবিকার তাগিদে যে শহরে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটি, সেই শহর আমাদের সাময়িক আশ্রয় দিলেও প্রকৃত শান্তি দেয় না।
তাই ঈদের চাঁদ দেখার আগেই মনটা পড়ে থাকে সেই ধুলোমাখা মেঠো পথে, যেখানে শৈশবের হাজারো স্মৃতি আজও জীবন্ত। বাসের জানালার পাশে বসে যখন চেনা গ্রামের সীমানায় পা রাখি, তখন বুকের ভেতর যে প্রশান্তির ঢেউ খেলে যায়, তার কোনো বিকল্প পৃথিবীতে নেই।
বাড়ি ফেরার এই তীব্র আকুতির সবচেয়ে বড় কারণ হলো মা-বাবার সেই অপেক্ষার প্রহর। দরজার কড়া নাড়তেই যখন মায়ের ঝাপসা হয়ে আসা চোখে আনন্দের ঝিলিক দেখি, কিংবা বাবার সেই আশ্বস্ত করা হাতের স্পর্শ পাই, তখন সারা বছরের সব ক্লান্তি এক নিমেষে ধুয়েমুছে যায়। তাঁদের হাতের তৈরি সামান্য সেমাই বা পিঠা যে স্বাদ দেয়, তা শহরের কোনো নামী দামী রেস্তোরাঁর খাবারে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। বাবা-মায়ের দোয়ায় যে পরম তৃপ্তি লুকিয়ে থাকে, সেই টানেই আমরা শত বাধা, ট্রাফিক জ্যাম আর পথের কষ্ট উপেক্ষা করে নাড়ির টানে ছুটে চলি।
গ্রামের সেই পুরোনো ঘর, উঠোনের কোণে আমগাছটা, কিংবা পাড়ার সেই চিরচেনা বন্ধুদের আড্ডা এসব কিছুই আমাদের হৃদয়ের গহীনে এক গভীর ক্ষত উপশমকারী হিসেবে কাজ করে। শহরে আমরা হয়তো একে অপরের প্রতিবেশী হয়েও অচেনা, কিন্তু গ্রামে প্রতিটি মানুষই যেন নিজের আত্মার আত্মীয়। ঈদের সকালে পাড়ার ছোট-বড় সবার সাথে কোলাকুলি করা, পুরোনো বন্ধুদের সাথে কৈশোরের স্মৃতি রোমন্থন করা আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা আসলে কোথা থেকে এসেছি। এই একাত্মতা আমাদের যান্ত্রিক জীবনের একঘেয়েমি দূর করে এক নতুন প্রাণশক্তি দান করে।
বাড়ি ফেরা মানে নিজের কাছে নিজের ফিরে আসা। যেখানে কোনো কৃত্রিমতা নেই, নেই কোনো প্রটোকল বা আনুষ্ঠানিকতা। আছে শুধু অকৃত্রিম ভালোবাসা আর একরাশ আপন মানুষের মায়া। নিজের চেনা বিছানায় শুয়ে জানালার বাইরে জোনাকি পোকার আলো দেখা কিংবা সকালে পাখির ডাকে ঘুম ভাঙা এসবই আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে দিনশেষে আমাদের এক টুকরো শান্তির নীড় আছে। এই শেকড়ের টানেই আমরা বারবার ফিরে যাই, কারণ পৃথিবীজুড়ে ঘুরে বেড়ালেও দিনশেষে মায়ের আঁচলের নিচে আর বাবার ছায়ার মতো নিরাপদ আশ্রয় আর কোথাও নেই।

ফিচার ডেস্ক