বলেন্দ্র শাহ ও বদলে যাওয়া নেপালের গল্প
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নেপালে এক বিস্ময়কর পরিবর্তনের নাম হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন বলেন্দ্র শাহ। এই তরুণ নেতা রাজনীতির দীর্ঘদিনের পুরাতন দেয়াল ভেঙে নতুন এক আশার আলো দেখিয়েছেন।
কাঠমান্ডুর মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তার সাহসী সিদ্ধান্ত, নব পরিকল্পনা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান কেবল একটি শহরকেই নয়, বরং পুরো নেপালের শাসনব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। প্রথাগত রাজনীতির বাইরে থেকেও যে জনকল্যাণ ও মেধার সমন্বয়ে একটি রাষ্ট্রযন্ত্রকে সচল করা যায়, বলেন্দ্র শাহ তার জীবন্ত উদাহরণ।
নেপালের সাধারণ মানুষের মনে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে তিনি রূপান্তর করেছেন এক ইতিবাচক বিপ্লবে। আজ নেপাল মানেই কেবল পাহাড় আর ঐতিহ্যের দেশ নয়, বরং বালেন্দ্র শাহর হাত ধরে এক আধুনিক ও সংস্কারমুখী নতুন রাষ্ট্রের উদয়কাল।
প্রায় চার বছরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে নেপালের নতুন সরকারপ্রধান জনপ্রিয় র্যাপার ও কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র বালেন্দ্র শাহ। গানের তালে তালে দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং ২০২৫ সালের জেন-জি আন্দোলনে সমর্থন দিয়ে অল্প সময়ের মাঝেই নেপালি তরুণদের আইডল বনে যান বলেন্দ্র শাহ।
মাত্র কয়েক বছর আগেও রাজনীতির মাঠে যিনি ছিলেন একেবারে অচেনা, সেই বলেন্দ্র শাহকেই জেন-জিদের অভ্যুত্থান পরবর্তী নেপাল পুনর্গঠনে বেছে নিলেন দেশটির ভোটাররা।
তরুণদের আন্দোলনে সরকার পতনের ছয় মাস পর নেপালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। পরিবর্তনের দাবিতে তরুণ প্রজন্ম পুরোনো রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতৃত্বকে এই নির্বাচনে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে।
এবারের সাধারণ নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত নাম বালেন্দ্র শাহ। নিজের আসনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলিকে হারিয়ে নেপালের প্রধানমন্ত্রী হন তরুণ এই নেতা। তার ক্ষমতায় বসার পর হতেই নেপালের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ক্ষমতা ও বিলাসিতার ধারণাকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছেন দেশটিতে নতুন করে উঠে আসা এক তরুণ নেতা। মাত্র ৩৫ বছর বয়সী প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ-এর নেতৃত্বে নেপাল এখন এক ভিন্ন পথে হাঁটছে। তার সাহসী ও জনবান্ধব সিদ্ধান্তগুলো পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এক নতুন রাজনৈতিক মডেল হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র ১৩ দিনের মধ্যে বলেন্দ্র শাহ এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেন। নেপালের প্রচলিত ভিআইপি সংস্কৃতিকে তিনি কার্যত বিদায় জানিয়েছেন। আগে যেখানে মন্ত্রী বা বড় নেতাদের যাতায়াতের সময় সাধারণ মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকতে হতো, এখন সেই দৃশ্য বদলে গেছে।
ট্রাফিক পুলিশকে সর্বোচ্চ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে যেন প্রয়োজনে মন্ত্রী-এমপিদের গাড়ি থামিয়েও তল্লাশি করতে পারে। বালেন্দ্র শাহ দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির অভিযোগে তিনি নিজ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা জেন-জি নেতাদের নিয়োগও বাতিল করেছেন। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনের শাসনের প্রতি আস্থা বাড়ছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনীতিমুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছেন বলেন্দ্র শাহ। স্কুল ও কলেজে সকল প্রকার দলীয় রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে যেন শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোনিবেশ করতে পারে। স্বাস্থ্য খাতেও এসেছে বড় পরিবর্তন। দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের একটি বড় অংশের সেবা বিনামূল্যে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
নারীদের কর্মস্থল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিরাপদ যাতায়াতের জন্য 'ব্লু বাস' নামে বিশেষ পরিবহন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এই বাসগুলোতে নারীরা বিনামূল্যে ভ্রমণ করতে পারছেন, যা নেপালি সমাজে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।
কাজের গতি বাড়াতে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়েছে। সরকারি সেবা যেন মানুষের কাছে সহজে ও দ্রুত পৌঁছায়, সেটিই বলেন্দ্র শাহ-এর মূল লক্ষ্য। তরুণ বলেন্দ্র শাহ কেবল প্রতিশ্রুতি দিতেই নয়, দ্রুত বাস্তবায়নেও বিশ্বাস করেন। তার এই দৃঢ় নেতৃত্ব ও স্বচ্ছতা নেপালের সাধারণ মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে নেপাল এখন এক নতুন রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূতিকাগার হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
লেখক : সংবাদিক

মো: তরিকুল ইসলাম