যেসব অভিযোগে কেপি শর্মা অলির বিচারের সুপারিশ
নেপালের একটি তদন্ত কমিশন ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির বিচারের সুপারিশ করেছে। ফাঁস হওয়া একটি প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানা গেছে। ওই অভ্যুত্থানের ফলে অলির সরকার ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
২০২৫ সালের ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর নতুন প্রজন্মের নাগরিকদের দুর্নীতিবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ৭৭ জন নিহত হন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিষিদ্ধ করার একটি ছোট ঘটনা থেকে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হলেও এটি মূলত দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক দুর্দশার পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে সৃষ্টি হয়েছিল।
৭৪ বছর বয়সী মার্ক্সবাদী নেতা ও চারবারের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি দেশটিতে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে ৩৫ বছর বয়সী র্যাপার থেকে রাজনীতিবিদ হওয়া বলেন্দ্র শাহ’র কাছে পরাজিত হন। বলেন্দ্র শাহ’র দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) প্রবীণ এলিটদের হঠানো, দুর্নীতি দমন এবং অর্থনীতি সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভূমিধস জয়লাভ করে।
নেপালি গণমাধ্যমে ফাঁস হওয়া কমিশনের এই সুপারিশগুলো আজ বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের প্রাক্কালে সামনে এল। এএফপি প্রতিবেদনের একটি অনুলিপি দেখেছে যেখানে বলা হয়েছে, ‘তৎকালীন নির্বাহী প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির বিরুদ্ধে তদন্ত, জিজ্ঞাসাবাদ এবং বিচার প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য নেপাল সরকারকে সুপারিশ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
আন্দোলনের প্রথম দিনে দমন-পীড়নে অন্তত ১৯ জন তরুণ নিহত হন। তবে এখন পর্যন্ত এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কেউ দণ্ডিত হয়নি।
‘অবহেলামূলক আচরণ’
প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখক এবং সাবেক পুলিশ প্রধান চন্দ্র কুবের খাপুং-এর বিরুদ্ধেও তদন্ত ও বিচারের কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রমেশ লেখক স্বরাষ্ট্র প্রশাসন, নিরাপত্তা সংস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সামগ্রিক দায়িত্বে ছিলেন। এতে আরও বলা হয়েছে, তিনি এবং অলি সেই বিকেলে মানুষের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি রোধে কোনো প্রচেষ্টা চালিয়েছেন বলে মনে হয়নি।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গুলি করার সরাসরি কোনো নির্দেশ ছিল—এমনটি প্রমাণিত হয়নি, তবে গুলি চালানো বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করার কোনো চেষ্টাও করা হয়নি। তাদের এই অবহেলামূলক আচরণের কারণে নাবালকদেরও প্রাণ হারাতে হয়েছে।
ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়া ৬৩ জনের মধ্যে ৪৮ জনই বুলেটের আঘাতে মারা গেছেন এবং তাদের অধিকাংশের মাথায় বা বুকে গুলি লেগেছিল বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়। সেপ্টেম্বরের সেই দেশব্যাপী বিক্ষোভে সংসদ ভবন ও সরকারি অফিসগুলোতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে অলির পতন ঘটে।
সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কারকি অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং এই সহিংসতার তদন্তে একটি কমিশন গঠন করেন। এই মাসে কমিশনের রিপোর্ট জমা দেওয়া হয়েছে এবং বিক্ষোভকারীরা এর ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
কমিশনের সদস্য বিজ্ঞান রাজ শর্মা সাংবাদিকদের জানান, তারা ২০০-এর বেশি মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন এবং আট হাজার পৃষ্ঠার প্রমাণাদিসহ ৯০০ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। সুশীলা কারকির দপ্তর বুধবার জানিয়েছে, তারা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করবে, তবে আনুষ্ঠানিক সংস্করণটি এখনও প্রকাশিত হয়নি।
গত ৫ মার্চের নির্বাচনে ২৭৫ আসনের নিম্নকক্ষে আরএসপি ১৮২টি আসন পেয়ে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। বৃহস্পতিবার নবনির্মিত সংসদ ভবনে নতুন সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেন। শপথের আগে যখন জাতীয় সংগীত বাজছিল, তখন আরএসপি সভাপতি রবি লামিচানে এবং হবু প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিলেন।
শপথ অনুষ্ঠানে নিজের সিগনেচার কালো সানগ্লাস পরে থাকা বলেন শাহ জয়ের পর থেকে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক ভাষণ দেননি। ধারণা করা হচ্ছে, শুক্রবার দুপুরের দিকে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক