ইরান-যুক্তরাষ্ট্র
যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হবে তো?
২০২৫ সালের জুন! সে সময় ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে তৈরি হয়েছিল ভয়াভয় যুদ্ধ পরিস্থিতি। এক সময় বেঁধেও গিয়েছিল তাদের মধ্যে। তারপর টানা ১২ দিনের সংঘাতের অবসান হয় যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের মধ্যস্থতায়। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় ২৪ জুন। আর এবার তো খোদ যুক্তরাষ্ট্রই দু’দেশে যুদ্ধ পরিস্থিতি আর ঘোলাটে রাখার মূল উসকানিদাতা হিসেবে কাজ করে চলেছে। একপর্যায়ে নিজেও এই যুদ্ধে জড়িয়েও পড়েছে। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথভাবে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে বড় আকারের সামরিক অভিযান শুরু করে। সেই থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত ৩৮ দিনের টানা হামলা-পাল্টা হামলার মধ্যে প্রাণ গেছে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লা আলী খোমেনিসহ হাজারও মানুষের। এরমধ্যে রয়েছে নারী, শিশু, বৃদ্ধও। যারা আর দেখবে না পৃথিবীর আলো, ভেঙেচুড়ে নিঃশেষ অনেকের আয়ের উৎস। আর আহত যে কতো, তার হিসাব মেলানো দায়!
এই ৩৮ দিনেই হরমুজ প্রণালী এমন একটি পরিস্থিতিতে নিয়ে গেছে, যেখানে বিশ্ববাসী বুঝেছে—যুক্তরাষ্ট্র মোড়ল রাষ্ট্র হলেও ইরান কম যায় না। তারা মাথা উঁচিয়ে অন্যায়ের সামনে ডাটো হয়ে ছিল, আছে, থাকবেও।
ইরান শক্তি প্রদর্শন কৌশল থেকে অনেকটাই সরে এসে বুদ্ধিবৃত্তিক পরিকল্পনা হাতে নেয়। হামলার পাল্টা জবাব দিতে অবরোধ করে হরমুজ প্রণালী। এতে বিশ্বের অনেক দেশ জ্বালানি তেল সরবরাহে রেশনিং পদ্ধতিতে যেতে বাধ্য হয। তারা অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকে—কবে শেষ হবে এই যুদ্ধের। আর ট্রাম্পের অবস্থা পড়ে উভয় সংকটে—যুদ্ধ থেকে সরে এলে থাকে না মোড়লত্ব, আবার যুদ্ধ চালিয়ে গেলে ধসে পড়ার উপক্রম তার লালসার মসনদ। এরইমধ্যে এসেছে যুদ্ধবিরতির সুখবর। যদিও দুই দেশই বিজয়ী বলে দাবি করেছে। আর এই যুদ্ধবিরতি নিয়েও আছে নানা সংশয়—আসলে কি এই যুদ্ধ বিরতি টিকবে? কারণ, ইরানি সভ্যতার অস্তিত্ব বিলীনে যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির বাকি ছিলো আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা, তারই মধ্যে এমন ঘোষণার তথ্য আসে। ফলে প্রশ্ন ওঠে, কী এমন ঘটেছে যে সিদ্ধান্ত থেকে বের হয়ে আসতে হলো ট্রাম্পকে? ইরানই বা কেন তাদের যুদ্ধের এককালীন ক্ষতিপূরণ না পেয়েই সরে এলো তাদের অবস্থান থেকে?
ট্রাম্পের ‘অপমানজনক পিছু হটা’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের অনুরোধে ইরানের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত বিমান হামলা দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। ওয়াশিংটন সময় সন্ধ্যা ৬টা ৩২ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রুথ সোস্যালে লেখেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি ‘চূড়ান্ত’ শান্তি চুক্তির ‘খুব কাছাকাছি’ পৌঁছেছে এবং আলোচনা এগিয়ে নিতে তিনি দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। এই ঘোষণা আসে ট্রাম্প ঘোষিত নির্ধারিত হামলার মাত্র দেড় ঘণ্টা আগে। ট্রাম্পের শর্ত ছিল, ইরান অবিলম্বে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে না দিলে এই হামলা হবে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, দুই পক্ষই অস্থায়ী সমঝোতায় সম্মত হয়েছে এবং আগামী দুই সপ্তাহে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত হবে। তবে যুদ্ধবিরতির এই ঘোষণা হরমুজ প্রণালিতে বাস্তবিক নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে যথেষ্ট হয়নি।
বিরতির নেপথ্যে
ট্রাম্পকে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হতে বাধ্য করেছিল আন্তর্জাতিক ও অর্থনৈতিক চাপ। আছে দেশের মধ্যকার রাজনীতিও। তেলের দাম ১১০ ডলারের বেশি হওয়ায় নতুন সামরিক ঝুঁকি নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। এ ছাড়া পারস্য উপসাগরীয় মিত্রদের নিরাপত্তা এবং বিশ্ব তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখাই ছিল তার প্রধান অগ্রাধিকার। হরমুজ প্রণালী খোলা হয়ে ওঠে তাদের প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু ইরান যখন কিছুতেই পিছু হটছিল না, তখন সমঝোতা ছাড়া কী আর করার ছিল ট্রাম্পের! যদিও তা দুই সপ্তাহের। আর এই যুদ্ধবিরতি শুধু সাময়িক শান্তি প্রদান করেছে, তবে স্থায়ী সমাধান এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নির্ভর করছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ইসলামাবাদে আলোচনার ফলাফলের ওপর। আগামী ১০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হবে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে হবে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের এই বৈঠক। সেখানে ইরানের ১০ দফা পরিকল্পনার বাস্তবায়ন এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হবে। যদিও এর আগেই ফের ইসরায়েলি বাহিনীর হামলার কথা জানা গেছে। মূলত মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এবং নানা সময়ে যুদ্ধবিরতি ও তারপর ফের হামলা-যুদ্ধ বলছে, কূটনীতি ও সামরিক শক্তির মধ্যে সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করা কতটা জরুরি।
চাপ ছিল নিজ দেশের
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানবিরোধী হুমকিপ্রবণ বক্তব্যের পর মার্কিন সিনেট ও হাউসের ডেমোক্র্যাট নেতারা তার ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছেন। সিনেটের ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার ট্রাম্পকে ‘অত্যন্ত অসুস্থ ব্যক্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তার কাণ্ডজ্ঞানহীন আগ্রাসী অবস্থানের বিরুদ্ধে রিপাবলিকান পার্টিকে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। শুমারের মতে, এই অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে যারা ভোট দিতে অস্বীকার করছেন, তাদের প্রতিটি রিপাবলিকান সদস্যকে ভয়াবহ পরিণতির দায়ভার নিতে হবে। হাউসের ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিসও এই অবস্থানকে সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, কংগ্রেসকে ট্রাম্পের উন্মাদ নেতৃত্বে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার আগে ইরানের সাথে যুদ্ধে বাধা দিতে হবে এবং প্রতিটি রিপাবলিকান সদস্যকে দেশপ্রেমের পরিচয় দিতে হবে। ট্রাম্পের বিতর্কিত হুমকির পর ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বন্ধ করলেও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ১০ এপ্রিল আলোচনার পথ তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও রাজনৈতিক প্রভাব
যদিও ট্রাম্পের সমর্থনে ইসরায়েলও যুদ্ধবিরতি মেনে নিয়েছে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যুদ্ধবিরতির ফলে তেলের দাম কমেছে এবং শেয়ারবাজারে উত্থান দেখা দিয়েছে। কিন্তু উসকানি যদি সামনে আসে, তাহলে থামবে কি ইসরায়েল?
এরইমধ্যে ইসরায়েলের বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিদ বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতি মেনে নিলেও নেতানিয়াহু জানিয়ে দিয়েছেন, লেবাননের ক্ষেত্রে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে না। তার প্রমাণও মিলেছে, সেখানে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ট্রাম্পের জন্য যুদ্ধবিরতি ছিল একমাত্র বিকল্প
ট্রাম্পের জন্য এই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ছিল একমাত্র বিকল্প। কুইন্সি ইনস্টিটিউটের ইরান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ত্রিতা পারসি জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিকে ধ্বংস করতে পারত। তেলের দাম ইতোমধ্যে ১১০ ডলার অতিক্রম করায় নতুন কোনো সামরিক ঝুঁকি নেওয়া আর অসম্ভব ছিল। এ ছাড়া পারস্য উপসাগরের মিত্রদের নিরাপত্তা ও বিশ্ব তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখাই ট্রাম্পের প্রধান অগ্রাধিকার। অবশ্য বিশ্বপরিস্থিতি বলছে, যুদ্ধবিরতি মানেই যে স্থায়ী শান্তি, তা কিন্তু নয়।
কোন ১০ শর্তে সরে এলো ইরান
ইরান পাল্টা হামলা থেকে ১০ শর্তে সরে এসেছে। তারা হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরোধ অক্ষের সুরক্ষা, মধ্যপ্রাচ্যের সব সামরিক ঘাঁটি থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের কথা বলেছে। এ ছড়া নিরাপদ ট্রানজিট প্রটোকল, সাম্প্রতিক যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পূরণ, পূর্বের সকল নিষেধাজ্ঞা ও আইএইএ সম্পর্কিত নেতিবাচক প্রস্তাব বাতিলসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আটকে থাকা রাষ্ট্রীয় সম্পদ মুক্ত করা, হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারীদের থেকে নির্দিষ্ট ফি আদায়ের ক্ষমতা, বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ বন্ধের নিশ্চয়তা, জাতিসংঘের মাধ্যমে আইনি ভিত্তি চেয়েছে। এগুলো মানা কি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহজ হবে?—এই প্রশ্ন থেকেই শঙ্কা শুরু, এই যুদ্ধ বিরতি কি আদতে যুদ্ধ বিরতিতে পৌঁছবে?
যুদ্ধবিরতির হরমুজ প্রণালী
যুদ্ধবিরতির ঘোষণা হয়েছে, কিন্তু এখনও হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল স্বাভাবিক হয়নি। নিরাপত্তা ও বীমার অনুমোদন ছাড়া বড় বাণিজ্যিক জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে সাহস করছে না। এটিকে ‘অপেক্ষার পালা’ হিসেবে বর্ণনা করা যেতে পারে। এদিকে, হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারীদের থেকে নির্ধারিত ফি আদায়ের মাধ্যমে ইরান অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে এসেছে। এই টোল নিয়ন্ত্রণে যৌথভাবে ওমানও থাকবে। এটি ইরানের জন্য অর্থনৈতিক ও কৌশলগত জয় হিসেবে ধরা হচ্ছে। ফলে যুদ্ধবিরতি হলেও সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি। এরই মধ্যে ইরানের ১৯টি জাহাজে হামলার ইতিহাস রয়েছে। ফলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও এই গুরুত্বপূর্ণ রুটে পূর্ণ স্বাভাবিকতা ফেরাতে কিছুটা সময় লাগবে।
শেষ কথা
দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতি ট্রাম্পকে সম্ভাব্য বড় যুদ্ধ থেকে বের হয়ে আসার সুযোগ দিয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক কূটনীতি, অর্থনীতি, তেল বাজার ও আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য রক্ষার জন্য বাস্তব চ্যালেঞ্জ এখনো বহাল। ট্রাম্পের ‘অপমানজনক পিছু হটা’ এবং ইরানের কৌশলগত জবাব, এই দুই সপ্তাহের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যতের রূপরেখা নির্ধারণ করবে। তবে স্থায়ী সমাধান নির্ভর করছে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আলোচনার ফলাফলের ওপর। আর সেটি যেন সফলতার পথে এগোয়, এটাই সবার প্রত্যাশা। আর সেজন্য শান্তি ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতির দাবিতে হোয়াইট হাউসের সামনে বিক্ষোভ হতে দেখা গেছে আজও।

সৈয়দ আহসান কবীর