তিন মাস ধরে অনলাইনে ক্লাস করছে ইরানের শিক্ষার্থীরা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রতি বিকেলে শারা তার সাত বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে অনলাইন ক্লাসে বসেন। কেননা যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইরানের স্কুলগুলো এখনো বন্ধ রয়েছে। এই নতুন রুটিন শারার পারিবারিক জীবনকে ওলটপালট করে দিয়েছে।
৩৮ বছর বয়সী এই মা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিলেন যখন ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পাঠদান অনলাইনে সরিয়ে নেওয়া হয়। প্রায় ৪০ দিনের সেই লড়াইয়ে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি স্কুলসহ বেসামরিক অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
শারার নতুন রুটিনের অর্থ ছিল ছেলের ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট এবং তাকে ব্যস্ত রাখার পাশাপাশি ঘরের দৈনন্দিন কাজকর্মের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। কারণ স্কুল থেকে এই বাধ্যতামূলক বিরতি তার ছেলের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটিয়েছে এবং সহপাঠী ও শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত করে দিয়েছে।
এখন খালি শ্রেণিকক্ষে শুধু শিক্ষকই বসেন, কম্পিউটারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলার সময় তার কণ্ঠস্বর সেখানে প্রতিধ্বনিত হয়। আর বাড়িতে মায়েদের নিশ্চিত করতে হয় যেন তাদের সন্তানরা নিজেদের কম্পিউটারের সামনে বসে মনোযোগ দেয়, এমনকি তারা যখন ঘরের অন্যান্য কাজে ব্যস্ত থাকেন তখনও।
এ প্রসঙ্গে শারা বলেন, ‘আমরা এই পরিস্থিতি এবং অনলাইন ক্লাস দীর্ঘায়িত হোক তা চাই না। কারণ স্কুল এমন একটি পরিবেশ যা শিশুদের শিক্ষাগত এবং সামাজিক দক্ষতা শেখার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। সবচেয়ে কঠিন বিষয় হলো, প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে মায়েদের তাদের সন্তানদের পাশে বসে থাকতে হয়। ক্লাসে কাটানো এই দুই ঘণ্টা আমাদের জন্য খুবই ক্লান্তিকর।’
তবে শারা কৃতজ্ঞও, কারণ শিক্ষামন্ত্রী আলিরেজা কাজেমি-র মতে, এই লড়াইয়ে অন্তত ২০টি স্কুল সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়েছে এবং ২৭৯ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে।
এর মধ্যে একটি হামলা ছিল বিশেষভাবে ভয়াবহ। ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধের শুরুর দিকে দক্ষিণ ইরানের শহর মিনাবের একটি স্কুলে হামলা চালানো হয়, যার ফলে ১৫০ জনেরও বেশি নিহতের মধ্যে অন্তত ৭৩ জন ছেলে শিশু এবং ৪৭ জন মেয়ে শিশু ছিল।
যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে এর দায় স্বীকার করেনি, তবে নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের উপসংহার টানা হয়েছে এভাবে যে, একটি মার্কিন টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র সেই প্রাথমিক বিদ্যালয়টিতে আঘাত হেনেছিল।
‘অনিশ্চিত অবস্থা’
তেহরানের ৪৫ বছর বয়সী মা এবং সম্পাদক ওয়াহিদেহ গিতিফার্ড বলেন, তার মধ্যেও মিশ্র অনুভূতি কাজ করছে—সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে স্বস্তি, কিন্তু অনলাইন শিক্ষার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ।
গিতিফার্ড বলেন, ‘এত দীর্ঘ সময় ধরে বাড়িতে থাকার অনেক অসুবিধা রয়েছে। স্কুলে তারা যে ধরনের শারীরিক পরিশ্রম বা খেলাধুলা করত, তা এখন আর পারছে না... শিক্ষকের সাথে তাদের সরাসরি কোনো যোগাযোগও হচ্ছে না।’
গত ৮ এপ্রিল থেকে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়া সত্ত্বেও এবং তেহরান ও ওয়াশিংটন সংঘাতের অবসানের লক্ষ্যে একটি রূপরেখার দিকে অগ্রসর হচ্ছে বলে মনে হলেও, স্কুলগুলো এখনো খোলেনি।
শনিবার (২৩ মে) ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা একটি চুক্তির ভিত্তি তৈরি করার উদ্দেশ্যে একটি রূপরেখা চূড়ান্ত করছে।
তবে গিতিফার্ড বলেন, এই অনিশ্চয়তার মধ্যে যুদ্ধ শেষ হওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত তিনি তার সন্তানকে স্কুলে পাঠাবেন না। এবং তিনি নিশ্চিত যে অন্য মায়েরাও ঠিক একই রকম অনুভব করছেন।
তেহরানের তোলু সাবজ স্কুলের শিক্ষিকা ফায়েজেহ হেসারাকিজাদ বলেন, শিক্ষার্থীরা সশরীরে ক্লাসে না থাকলেও শিক্ষকরা তাদের সাথে একটি আত্মিক সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, ‘ক্লাস চলাকালীন আমরা ওয়েবক্যাম চালু রাখি, কাউন্সেলিং সেশনের ব্যবস্থা করি এবং চেষ্টা করি যেন আমরা একে অপরের থেকে দূরে সরে না যাই। আমরা দূরত্বের কারণে ব্যবধান তৈরি হতে দিইনি’
ইন্টারনেট সমস্যা
ইরানে শিক্ষাবর্ষ সাধারণত সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলে। তবে যুদ্ধ, ইন্টারনেট বিভ্রাট এবং ডিসেম্বরে শুরু হয়ে জানুয়ারিতে চরম রূপ নেওয়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভের কারণে এ বছর বারবার পাঠদান ব্যাহত হয়েছে।
ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে যখন যুদ্ধ শুরু হয়, তখন দেশটিতে কঠোর ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট আরোপ করা হয়। ফলে লাখ লাখ মানুষ কেবল ইরানের অভ্যন্তরীণ ‘ইন্ট্রানেট’ ব্যবহারের সুযোগ পায়।
শিক্ষকদের ক্লাস নেওয়া, হোমওয়ার্ক দেওয়া এবং পরীক্ষা পরিচালনার জন্য স্থানীয় অ্যাপগুলোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তবে অনেক অভিভাবকই ক্রমাগত প্রযুক্তিগত সমস্যার অভিযোগ করছেন।
১৫ বছর বয়সী এক মেয়ের মা লিডা জানান, কিছু অ্যাপ খুবই ধীরগতির এবং ফাইল লোড হতে সমস্যা হয়। তিনি বলেন, ‘কিশোর-কিশোরীরাও খুব একাকী হয়ে পড়েছে এবং তারা একে অপরের সঙ্গে খুব একটা দেখাও করতে পারছে না। যেহেতু তারা একটি সংবেদনশীল বয়সে আছে, তাই তাদের একা বাইরে যেতে দেওয়াও কঠিন।’
পশ্চিম ইরানের একটি গ্রামে কর্মরত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সিনা জানান, গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম হওয়ায় অনলাইন শিক্ষা কিছুটা সহজ হয়েছে, তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এতে দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার মান কমে যাবে।
সিনা আরও বলেন, ‘অনলাইন শিক্ষার অবকাঠামো এখনও অসম্পূর্ণ এবং ইন্টারনেট নির্ভরযোগ্য নয়।’ কিছু কিছু গ্রামে তো ইন্টারনেটের কোনো সুবিধাই নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তেহরানে থাকা শিক্ষিকা হেসারাকিজাদ জানান, তিনি পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন। তবে তিনিও সশরীরে ক্লাসের ফেরার দিন গুনছেন। নিজের শিক্ষার্থীদের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা সত্যিই ওদের খুব মিস করছি।’

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক