ফুটবল রোমান্সে বাংলা ছোঁয়া: ফিফার ওয়ালে ‘ওস্তাদ হাজির’ আর ‘মায়ার জাদু’
বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে মাঠের লড়াই শুরুর আগেই মাঠের বাইরের এক অন্যরকম লড়াইয়ে মেতেছে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। তবে এবার কোনো গোল বা ট্রফির লড়াই নয়, এই লড়াই মন জয়ের। আর সেই মন জয়ের বড় এক অস্ত্র হিসেবে ফিফা এবার বেছে নিয়েছে আমাদের প্রাণের ভাষা বাংলা।
বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষাভাষী ফুটবল ভক্তদের বিশাল উন্মাদনাকে এবার বেশ ভালোভাবেই আমলে নিয়েছে ফিফা। আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে যেখানে ইংরেজি বা স্প্যানিশ ভাষার জয়জয়কার, সেখানে ফিফার অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে একের পর এক খাঁটি বাংলা সংলাপ, লোকজ গানের লাইন আর চলতি ট্রেন্ডে পোস্ট আসাটা যেমন চমকপ্রদ, তেমনি কোটি বাঙালি ফুটবল প্রেমীর জন্য দারুণ গর্বের।
সম্প্রতি আমাদের দেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি সংলাপ বেশ ভাইরাল হয়েছে “কি প্রতিপক্ষ রাগ করলা!”। সাধারণ কোনো কনটেন্ট থেকে উঠে আসা এই ট্রেন্ডকে ফিফা যেভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে লুফে নিয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। ব্রাজিল তারকা নেইমারের চোট ও ফর্ম নিয়ে নানা অনিশ্চয়তা কাটিয়ে অবশেষে যখন তিনি চূড়ান্ত দলে জায়গা পেলেন, তখন তার একটি উচ্ছ্বসিত ছবির ওপর এই সংলাপটি বসিয়ে দেয় ফিফা। ছবিতে নেইমারের হাসির সাথে এই দেশি সংলাপ যেন প্রতিপক্ষ দলগুলোকে এক চিলতে খোঁচা আর এক বুক ভরসা উপহার দিয়েছে, যার ক্যাপশনে লেখা ছিল “অপেক্ষার অবসান... ফুটবল রাজপুত্রের প্রত্যাবর্তন।” বিশ্বমঞ্চের অফিশিয়াল পেজে এমন চেনা ট্রেন্ডের ছোঁয়া দেখে স্বাভাবিকভাবেই বাঙালি নেটিজেনদের উচ্ছ্বাস এখন আকাশচুম্বী।
শুধু নেইমারই নন, ফুটবলের দুই মহাতারকা লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকেও ফিফা বরণ করেছে চিরচেনা বাঙালি ঢঙে। বিশ্বকাপ ইতিহাসের রেকর্ড গড়ার পর লিওনেল মেসির আকাশের দিকে হাত তোলা সেই চেনা উদযাপনের ছবির সাথে ফিফা জুড়ে দিয়েছিল বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের বিখ্যাত গানের লাইন “কী যাদু করিয়া মেসি মায়ার লাগাইছে!”। বাংলার লোকসংগীতের এই লাইনটি যখন বিশ্ব ফুটবলের রাজপুত্রের ছবির সাথে মিশে যায়, তখন তা কেবল একটি সাধারণ পোস্ট থাকে না; হয়ে ওঠে সংস্কৃতি ও ফুটবলের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। অন্যদিকে কলম্বিয়ার বিপক্ষে পর্তুগালের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে নিয়ে করা পোস্টে ছবির ওপর বড় করে লেখা হয় “যখন দরকার, তখনই ওস্তাদ হাজির” এবং ক্যাপশনে ছিল খাঁটি স্টেডিয়ামের উন্মাদনা “আজ রাতে রোনালদোর খেলা হবে।”
ফিফার এই ‘বাংলা’ প্রচারণা শুধু কিছু লাইক-কমেন্ট বা রিঅ্যাকশন পাওয়ার সাময়িক কৌশল নয়, এটি বিশ্বমঞ্চে বাংলা ভাষার বিশাল বাজার এবং এর গভীর আবেগের এক নীরব ও বড় স্বীকৃতি। ফুটবল নিয়ে বাঙালির যে চিরকালীন পাগলামি আর হুল্লোড়, তাকে ফিফা এখন সমীহ করতে বাধ্য হচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ফুটবল সমর্থকগোষ্ঠীকে নিজেদের পরিমণ্ডলে ধরে রাখতে আন্তর্জাতিক একটা সংস্থার পেজে নিজের ভাষার এমন নিখুঁত ও প্রাণবন্ত ব্যবহার দেখে ফুটবলপ্রেমীরাও আপ্লুত। এটি দিনশেষে প্রমাণ করে যে আবেগ আর ফুটবলের কোনো নির্দিষ্ট সীমানা বা কাঁটাতার নেই, আর সেই বিশ্বজনীন আবেগের অন্যতম সেরা এক মাধ্যম হয়ে উঠেছে আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষা।

ফিচার ডেস্ক