ভিশন-২০৩০
গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কি হবে এবার?
আগামী সংসদ নির্বাচন আসতে আর খুব বেশি সময় নেই। ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপি চেয়ারপারসনের রূপকল্প, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রচারণা সবাইকে নির্বাচনী ভাবনার মধ্যে নিয়ে এসেছে। অনেক রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের আশ্বাস দিয়ে দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ‘ভিশন-২০৩০’ তুলে ধরেছেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তিনি প্রতিহিংসা বাদ দিয়ে ভবিষ্যৎমুখী রাজনীতির ঘোষণা দেন। এই রূপকল্পে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা, বিচার বিভাগ, পুলিশ ও প্রশাসনে সংস্কার; সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠা; প্রতিহিংসা বাদ দিয়ে ভবিষ্যৎমুখী রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলাসহ বিভিন্ন আশ্বাস দেন তিনি। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে ক্ষমতায় যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। কারণ, কিছু আশ্বাস পূরণ করতে শুধু সরকার গঠন করলেই হবে না, জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হবে অথবা বিরোধী দলের সমর্থন পেতে হবে। কারণ, অনেক প্রস্তাব বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন করতে হবে।
খালেদা জিয়ার এই ভিশন-২০৩০ অনেকটাই নির্বাচনী ইশতেহারের মতো। নির্বাচনের প্রায় দেড় বছর আগে ইশতেহারের মতো এই ভিশন তুলে ধরা নিয়ে বিএনপির নেতাদের অনেকের মধ্যে প্রশ্ন আছে। বিশেষ করে গণমাধ্যম সূত্রে জানতে পেরেছি, গত ৫ মে দলটির স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও এ প্রশ্ন তুলেছিলেন কেউ কেউ। তবে যাই হোক, আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচন যে অংশগ্রহণমূলক হতে যাচ্ছে, তা আমরা অনেকটা অনুধাবন করতে পারছি। কারণ, খালেদা জিয়ার ঘোষিত এই রূপকল্প নির্বাচনী রাজনীতির অন্যতম উপাদান।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক নেতাদের একটি বিশেষ চরিত্র রয়েছে। সেটি হলো একদল বক্তব্য দিলে অন্যদল সমালোচনা করে। কোনো বিষয়েই তারা ঐকমত্যে আসতে চায় না। বিশেষ করে আমরা লক্ষ করেছি গত দশম সংসদ নির্বাচনে সংবিধান অনুযায়ী সর্বদলীয় সরকার গঠন ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আন্তরিক আগ্রহ থাকলেও বিএনপির পক্ষ থেকে বিন্দুমাত্র ইতিবাচক সাড়া চোখে পড়েনি; বরং নানা অজুহাত সৃষ্টি করে রাজনৈতিক পরিস্থিতি সংকটময় করার চেষ্টা করেছিল তৎকালীন বিরোধী দল। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে বিরোধী দলের নেতাকে টেলিফোনে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ এবং সর্বদলীয় সরকারে পছন্দমতো যেকোনো মন্ত্রণালয় গ্রহণ করার আহ্বান জানানো সত্ত্বেও কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি সে সময়। ফলে নির্বাচন প্রক্রিয়াটি অনেকটা হুমকির মুখে পড়ে যায়। নির্বাচনী টানাপড়েনের একটি সুষ্ঠু সমাধানের উদ্যোগ স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে থাকলেও তৎসময়ের নেতিবাচক রাজনীতির পুঞ্জীভূত একগুঁয়েমিতাই বিএনপিকে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে রেখেছিল।
বাংলাদেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক টানাপড়েনের সূত্রপাত হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংবিধান থেকে মুছে যাওয়ায়। ওই সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংবিধানে পুনর্বহালের দাবিতে তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল বিএনপি রাজনীতির মাঠে সক্রিয় ছিল। তাদের সঙ্গে আন্দোলন-সংগ্রামে একাত্ম ছিল জামায়াত। এ অবস্থায় ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে সংসদে এসে সব সংকট নিরসনের আলোচনা করতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু খালেদা জিয়া তখনো প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া না দিয়ে মতিঝিলে হেফাজতের সমাবেশের সুযোগটাকে কাজে লাগাতে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছিলেন। কিন্তু সে হুমকি রাজনৈতিকভাবে বুমেরাং হয়েছিল।
এখন বিএনপির পক্ষ থেকে আগামী সংসদ নির্বাচন ও চলমান রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে একাধিকবার সংলাপের আহ্বান জানানো হয়েছে। এমনকি বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচনী যে রূপকল্প দাঁড় করিয়েছেন, তাতে বিএনপিকে নির্বাচনমুখী মনে হচ্ছে। যদিও রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিবেচনায় এনে স্বাভাবিকভাবেই এ বিষয়ে সরকারের কাছ থেকে খুব বেশি সাড়া পাওয়ার কথা নয়। কারণ, রাজনীতির মাঠে সময়-অসময় বলতে একটি কথা আছে। বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, সময়ের এক ফোঁড় আর অসময়ের দশ ফোঁড়। কাজেই বিএনপির সাম্প্রতিক সময়ের আহ্বান এবং নানাভাবে নির্বাচনমুখী হওয়ার প্রবণতা রাজনীতির ব্যাকরণে আওয়ামী লীগের সাড়া না দেওয়ার বিষয়টি অস্বাভাবিক কিছু নয়। এর আগে সংকট নিরসনে তথা সুষ্ঠু সমাধানের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ থাকলেও বিএনপি সেগুলো ইচ্ছাকৃত অবহেলা করেছে। এখন সময় এসেছে ভুল বুঝতে পারার। যেকোনোভাবেই আগামী নির্বাচনে বিএনপিকে অংশগ্রহণ করতে হবে। কৌশলগত কারণে বিএনপির আগামী নির্বাচন বর্জন করা কঠিন।
অন্যদিকে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বিবেচনায় আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনটি অংশগ্রহণমূলক হওয়াটা বাঞ্ছনীয়। কারণ, পরপর দুটি নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক না হলে গণতন্ত্র প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বিএনপির ঘোষিত রূপকল্প বিবেচনা করলে লক্ষ করতে পারি যে, আগামী নির্বাচনে যেকোনো মূল্যে বিএনপি অংশগ্রহণ করতে চায়। আর সে কারণে দেশের গণতন্ত্র যাতে অধিক স্মার্ট হয়, সেদিকটাও বিবেচনা নিয়েছে দলটি। ঘোষিত রূপকল্পে তা প্রতিফলন ঘটেছে। যদিও সমালোচনা রয়েছে, রূপকল্পে আওয়ামী লীগকে অনুকরণ করা হয়েছে, তারপরও এটিকে ইতিবাচকভাবে দেখাটাই রাজনৈতিক দূরদর্শিতা বলে মনে করি।
এসব কারণ বিবেচনায় রেখেই দুটি বড় রাজনৈতিক দলকে শেষবারের মতো টানাপড়েন বন্ধে ছাড় দেওয়ার মানসিকতার সময় এসেছে। এ ক্ষেত্রে নতুন করে একগুঁয়েমি ভাব রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সৃষ্টি হোক, এমনটি আমরা চাই না। প্রয়োজনে কোনো দলকে একটু বেশি কম্প্রোমাইজ মনোভাব দেখাতে এগিয়ে আসতে হবে।
নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সমস্যা সমাধানে বিবদমান দুই রাজনৈতিক দলকে পর্দার অন্তরালে আলোচনা করতে হবে। তবে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে এই আলোচনা করলে সমাধান বেরিয়ে আসবে। এ ক্ষেত্রে আমি মনে করি, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে পর্দার আড়ালে আলোচনার কোনো সুযোগ তৈরি হলেও সাংবিধানিক পদ্ধতিতেই একটি গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। আর এ বিষয়ে স্থায়ী কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারলে নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে টানাপড়েন যুগে যুগে চলতেই থাকবে।
লেখক : ড. সুলতান মাহমুদ রানা, সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

ড. সুলতান মাহমুদ রানা