উৎসব
স্বস্তিতেই কাটল ঈদ
২৬ জুন(২০১৭) ঈদুল ফিতর উদযাপিত হলো। এ উৎসবে বাংলাদেশের সর্ব স্তরের মানুষের মনে স্বস্তি ছিল। বিশেষত প্রতি বছর ঢাকাসহ বড় বড় নগর থেকে প্রায় দেড় কোটি মানুষকে উৎসবে যোগ দিতে নিজের বাড়িতে যেতে হয়। এবারও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। তবে যানজট ও দুর্ঘটনার হাত থেকে মানুষ রেহাই পায়নি এবারও। গত চারদিনে ২০টি জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে কমপক্ষে ৪৪ জনের। (খবর : প্রথম আলো, ২৯ জুন ২০১৭ )
অন্যদিকে ঈদ উপলক্ষে বাড়তি নিরাপত্তার জন্য সারাদেশে মানুষ নিশ্চিন্তে চলাফেরা করতে পেরেছে। ঈদকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজি ও অজ্ঞান পার্টির দৌরাত্ম্যও অনেকটা দূর করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সব মিলে ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’ এই চেতনা জয়যুক্ত হয়েছে।
২.
ঈদ যাত্রা শুরু হয়েছিল ২২ জুন শেষ কর্মদিবস থেকে। ২৩ জুন শুক্রবার ছিল সবচেয়ে বেশি চাপ। সব বাস ও লঞ্চ টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও বিমানবন্দরে ছিল ঘরমুখো মানুষের ভিড়। প্রতিবছর যেমন অভিযোগ করা হয় ঈদের টিকেট কালোবাজারি হচ্ছে। এবার তা হয়নি। তবে বাসের টিকেটের বেশি মূল্য রাখা হয়েছে। ৬০০ টাকার ভাড়া এক হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সময় মতো যানবাহন ছেড়ে যাওয়া নিয়ে উৎকণ্ঠা থাকে, তাও এবার ছিল না। বরং ট্রেন যাত্রা সবাই উপভোগ করেছে। সড়ক পরিবহনের কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিল করা হয়েছিল। ঈদের দিনও সেতুমন্ত্রীকে সড়ক পথের তদারকিতে দেখা গেছে। এটা ঠিক যে কিছু ক্ষেত্রে বিড়ম্বনা ঘটেছে সড়ক পথে। বিশেষত দেশের সব রাস্তা এখনো ত্রুটি মুক্ত নয়।
ঢাকা থেকে বের হওয়ার সময় চৌরাস্তাগুলোতে যানজটে পড়তে হয়েছে। টাঙ্গাইল সড়কের কাজ চলায় গাড়ি ক্রসিংয়ে সময় লেগেছে। আর ঈদের আগে একটানা বৃষ্টিতে অনেক সড়ক যান চলাচলের অনুপযোগী ছিল। এ ছাড়া মহাসড়কে দ্রুত গতির যানের পাশে ধীর গতির রিকশা কিংবা অটো চলায় ভোগান্তির শিকার হন দূর পাল্লার যাত্রীরা। উপরন্তু মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা শিল্প-কারখানায় কাজ করা শ্রমিকদের বাড়ি ফেরার বাড়তি ভিড় থাকে। বাস পাওয়া কঠিন হয়ে যায় শ্রমিকদের জন্য। ফলে তারা ট্রাকে চেপে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়।
অন্যদিকে লঞ্চগুলোতে উপচেপড়া ভিড় থাকলেও ফিটনেসবিহীন জলযান নিয়ে যে শঙ্কা ছিল তা উতরে গেছে নৌপরিবহন বিভাগ। মানুষ এখন ঠিক মতোই ঢাকাসহ অন্যান্য শহরে ফিরছে নিশ্চিন্তে। যত্রতত্র পার্কিং, যাত্রী তোলা বন্ধ করলে মহাসড়কের দুর্ভোগ হয়তো আরো কমানো যেত। তবে সামগ্রিক দিক থেকে এবারের ঈদ যাত্রা ছিল স্বস্তির।
৩.
ঈদের সময় মহাসড়কগুলোতে যানজটের আরো কিছু কারণ আছে। যেমন, মেঘনা-গোমতী সেতুর টোল প্লাজা ওজন স্কেল এবং টোল আদায়ের ধীরগতির কারণে যানজট হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার কাঁচপুর সেতু থেকে মেঘনা সেতু পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার এলাকায় ধীরে ধীরে যানবাহন চলেছে। অবশ্য মানুষ গন্তব্যে পৌঁছেছে সুস্থ শরীরে। তা ছাড়া বিআরটিসির ৫০টি বাস সংরক্ষিত ছিল ঈদ উপলক্ষে। অন্যদিকে ট্রেনযাত্রীরা আনন্দে ভ্রমণ করেছে। ট্রেনের কামরায় নিজের আসন খুঁজে নিয়ে পরিবারসহ যাত্রা ছিল স্বস্তিদায়ক। সময়মতো ট্রেন স্টেশন ত্যাগ করেছে। এখন সময় মতো ট্রেন ফিরছে। এভাবে নির্দিষ্ট সময় মেনে চলায় ‘কয়টার ট্রেন কয়টায়’ আসে এই অপবাদ মুক্ত এখন রেল ব্যবস্থাপনা। তা ছাড়া রেলের কানেকটিভিটি বেড়েছে। ডাবল লাইন হয়েছে অনেক সিঙ্গেল লাইনের পাশে।
ট্রেন ছাড়া আকাশপথের যাত্রায় অসংখ্য যাত্রী পরিবহন করতে দেখা গেছে। তবে এয়ারলাইন্সগুলো টিকিটের মূল্য আরো কিছুটা কমাতে পারত। আমরা মনে করি ভবিষ্যতে রেল ও আকাশপথকে অধিক গুরুত্ব দিলে দেশে দুর্ঘটনার হার আরো কমে আসবে। তার আগে অবশ্য ঢাকা শহরের ওপরও চাপ কমাতে হবে।
৪.
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আয়কর রিটার্ন জমাদানকারী মোট উচ্চবিত্তের ৭৫ শতাংশই ঢাকায় বসবাস করে। তাদের প্রত্যেকের সর্বনিম্ন সম্পদের পরিমাণ সোয়া দুই কোটি টাকা। ঢাকার বাইরে মোট উচ্চবিত্তের একমাত্র চট্টগ্রাম বিভাগে ১৭ দশমিক ৫২ শতাংশ বসবাস করে। বাকি সব বিভাগে উচ্চবিত্তের হার শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
তবে বলা যায়, ঢাকায় বসবাসকারী উচ্চবিত্তের সিংহভাগই জন্মসূত্রে অন্যান্য বিভাগের লোক। বন্দরনগর চট্টগ্রামের তুলনায় ঢাকায় জনবসতি বেড়েই চলেছে। এজন্য ঈদকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটেছে ব্যাপকভাবে। একইসঙ্গে কাজের খোঁজে মানুষের প্রবাহও বাড়ছে ক্রমাগত। সব মিলিয়ে একমাত্র ঢাকার ওপর ক্রমাগত চাপ আমাদের ভাবনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। তবু আশার কথা উৎসবকে কেন্দ্র করে সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ আগে থেকে সতর্ক থাকে। এবার এ পর্যন্ত ঢাকা শহরে চুরি-ডাকাতির ভয়াবহ ঘটনার সংবাদ পাওয়া যায়নি। জঙ্গিবাদীরাও মাথা চাড়া দিতে পারেনি এবার। এখন বাংলাদেশ মোটামুটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি নিয়ে এগিয়ে চলেছে এটাই মুখ্য বিষয়। সবার প্রচেষ্টায় ঈদ উৎসব যেমন সফল হয়েছে তেমনি জাতীয় জীবনের সব কাজ এবং অনুষ্ঠান সাফল্যমণ্ডিত হবে বলে আমরা মনে করি।
লেখক : অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

মিল্টন বিশ্বাস