রোহিঙ্গা সংকট
প্রধানমন্ত্রীর সফরে যোগ হলো নতুন মাত্রা
উখিয়ার কুতুপালংয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দেখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশ ভালো প্রতিবেশী চায়, তবে যদি কেউ অন্যায় আচরণ করে তা কখনো মেনে নেওয়া হবে না। এই বক্তব্যে মিয়ানমার এবং বাকি বিশ্বের জন্য পরিষ্কার বার্তা আছে। আমার বিশ্বাস প্রধানমন্ত্রী যে বক্তব্য রেখেছেন তাতে রোহিঙ্গা সংকট নতুন মাত্রা পেয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট যে নতুন ও বহুমুখি মাত্রা পেতে যাচ্ছে তা আরো বেশি করে মনে হচ্ছে মঙ্গলবারের আন্তর্জাতিক মহলের নানা ঘটনা দেখেও। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা পরই মঙ্গলবার সন্ধ্যায় খবরে প্রকাশ হয়েছে, এই সংকটে চীন মিয়ানমারের পাশে থাকবে এবং বিশ্বাবাসীকে মিয়ানমারের পাশে থাকারও আহ্বান জানিয়েছে চীন।
কিছুক্ষণ পরই আরো একটি খবর প্রকাশিত হয়। এবারের জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিচ্ছেন না মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সুচি । তাঁর বদলে অধিবেশনে যোগ দেবেন সে দেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট। তারো একটু পর খবর প্রকাশিত হয়েছে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে বুধবার জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে।
এসব ঘটনা এত দ্রুত ঘটছে যে, রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশুর ওপর এবার যে অমানবিক গণহত্যা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা যে আন্তর্জাতিকভাবে একটা আলোড়ন সৃষ্টি করেছে তা বোঝা যাচ্ছে। এবং এজন্য বাংলাদেশ এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের বেশ ভালো একটা অবদান আছে। আছে বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরের তোড়জোড়ের অবদানও।
এবার আসি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসী এবং মানবিক সফর প্রসঙ্গে। সীমান্তের উত্তেজনা নিয়ে সেখানে দেশের সরকার প্রধানের সফরটা যতটা সহজভাবে উপস্থাপন করা যাচ্ছে সংবাদ মাধ্যমে, বিষয়টা আসলে এতটা সহজ-সরল নয়। বাংলাদেশের বন্যার্ত মানুষকে দেখতে যাওয়া আর রোহিঙ্গাদের দেখতে যাওয়া এক বিষয় নয়। অর্থাৎ এক পাল্লায় বিষয়টা মাপা যাবে না। সংকটমুহূর্তে শেখ হাসিনার এই সফরকে সবাই একজন মানবিক প্রধানমন্ত্রীর অসাধারণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। আমি আরেকটু বাড়িয়ে বলতে চাই, মানবিকের পাশাপাশি এটি একটি বিরাট সাহসী পদক্ষেপও বটে।
রোহিঙ্গা সংকটে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নানামুখী তৎপরতা রয়েছে। অনেকের অনেক রকম খেলা এখানে চলছে। খোলা চোখে না দেখা গেলেও এসব পর্দার আড়ালের বিষয়গুলোকে এড়িয়ে চলা সরকারের কর্তাব্যক্তিদের পক্ষে সহজ নয়। হিসেব কষেই পা ফেলতে হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ যে এ বিষয়ে অনেক হিসাবনিকাশ করছে, তা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার বাংলাদেশের সীমানা লঙ্ঘনের ঘটনায় নিরুত্তাপ প্রতিক্রিয়াতেই স্পষ্ট হয়েছে। এ বিষয়টি বিরোধী দল বিএনপিসহ অনেকে সমালোচনা করলেও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকরা এর ভিন্ন মাত্রা খোঁজার চেষ্টা করছেন। এ রকম একটা স্পর্শকাতর সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দেখতে গিয়ে যে সাহসের পরিচয় দিয়েছেন তা ইতিহাসে বিরল। এতে তাঁর মানবিক নয় কেবল, অতিমানবিক একটা চেহারা ফুটে উঠেছে। বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী, বিশেষ করে বিজিবি প্রধানমন্ত্রীর এই সফর থেকে যথেষ্ঠ উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা পাবে।
বিশ্ববাসীও এখান থেকে এবং তাঁর বক্তব্য থেকে একটা সুস্পষ্ট বার্তা পাবে। তিনি তাঁর বক্তব্যে পরিষ্কার করে বলেছেন, প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ মিয়নমারের সঙ্গে সুসম্পর্ক চায়, তার মানে এই নয় যে তাদের যেকোনো অন্যায় মেনে নেওয়া হবে। বাংলাদেশ বিষয়টি জাতিসংঘে তুলবে এবং এর একটা সমাধানের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন বলেও প্রধানমন্ত্রী বিদেশি সংবাদকর্মীদের জানান। সবচেয়ে বড় মানবিকতার যে পরিচয় তিনি দিয়েছেন তা হলো- তিনি বলেছেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কী করবে তার দিকে তিনি চেয়ে নেই, বাংলাদেশ এই অতিরিক্তি সাত লাখ মানুষকে খাওয়াতে পারবে বলে দৃঢ়ভাবে উচ্চারণ করেন তিনি। এটি এসেছে তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত মানবিক বোধের জায়গা থেকে। তিনি যে একজন মানবিক প্রধানমন্ত্রী, মানবিক নেত্রী, মানবতার বন্ধু সে পরিচয় এই সফরের মধ্য দিয়ে নতুন করে জানান দিলেন। বাংলাদেশের সংবাদকর্মীরা শরণার্থী রোহিঙ্গাদের এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তারা জানিয়েছে- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একজন মানবতার বন্ধু, তিনি আমাদের বিপদের দিনে হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, আমরা তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ।
সাম্প্রতিক এই সংকটে এখনো অনেকেরই প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, তবে মিয়ানমারের এই রাখাইন রাজ্যে নানা কারণে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শক্তির শকুনি চোখ যে নিবদ্ধ আছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এর অন্যতম একটি কারণ হলো, সেখানকার মাটির তলে থাকা প্রাকৃতিক সম্পদ। গ্যাস ও বিভিন্ন প্রকার খনিজ সম্পদে নাকি ভরপুর এই অঞ্চল। তাই অনেক আগে থেকেই এসবে ভাগ বসাতে চায় চীন ও ভারত। কাছাকাছি অবস্থানে থাকা রাশিয়াও এখানে বেশ আগ্রহী। এসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন বন্ধুত্বসুলভ। সুতরাং রাখাইনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া বাংলাদেশের পক্ষে এত সহজ নয়।
এরপরও বাংলাদেশ তাদের সংসদে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো বর্বর এই গণহত্যা বন্ধে এবং পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার দিয়ে সে দেশে ফেরত নিতে আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধির প্রস্তাব পাশ করেছে। কূটনৈতিক জ্ঞান যাদের আছে, তারা বুঝবেন এটা কতবড় একটা পদক্ষেপ। সন্দেহ নেই, বাংলাদেশের সংখ্যগরিষ্ঠ মানুষের মানসিক অবস্থা আমলে নিয়েই জাতীয় সংসদ এ প্রস্তাব পাস করেছে, তথাপি ব্যক্তিগতভাবে আমি বিশ্বাস করি এর পেছনেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রচ্ছন্ন নির্দেশনা ছিল এবং এটাও প্রমাণ করে, প্রধানমন্ত্রীর সাহসী মনোবৃত্তিই এই মুহূর্তে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করছে।
এবার আসি এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যা ঘটছে তা কতটা কী প্রভাব ফেলবে সে প্রসঙ্গে। ২৫ আগস্টের সামরিক অভিযানের পর থেকে এ পর্যন্ত রোহিঙ্গা সংকটের যে মাত্রা ও গতিবিধি ছিল তা নতুন নতুন মাত্রা পাচ্ছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের পাশে থাকার ঘোষণা দেওয়ার পর সন্ধ্যার মধ্যেই চীন জানিয়ে দিল, তারা এ বিষয়ে মিয়ানমারের পাশে আছে এবং থাকবে। এই বক্তব্যের তাৎপর্য বহুমুখী। এর মাধ্যমে মূলত আঞ্চলিক অপরাপর শক্তি বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান ও রাশিয়াকে একটা পরিষ্কার বার্তা দিয়েছে মিয়ানমার। কারণ যে যাই বলুক, মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় আচার আচরণ অনেকটাই যে বেইজিংয়ের পরামর্শ ও নির্দেশনায় চলে তা বাকি বিশ্ব ভালোই জানে। সুতরাং সামনের জাতিসংঘ অধিবেশনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে কে কী ভূমিকা নিবে বা নিতে পারে, তা সংশ্লিষ্টরা যাতে চীনের অবস্থান বুঝেই করে-সে বিষয়ে বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে আমি মনে করি। নিরাপত্তা পরিষদে যতই প্রস্তাব আনা নেওয়া করুক না কেন, চীন যদি ভেটো দেয় বা বিরোধিতা করে কোনো প্রস্তাবই পাস করা সম্ভব হবে না। একইভাবে মঙ্গলবারের বিবৃতি থেকে রাশিয়া ও আমেরিকাও বার্তা পাবে এবং তারা তাদের ভূমিকা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করবে।
মিয়ানমারে এমনকি আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও স্বার্থ। ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের সংযোগ স্থল মালাক্কা প্রণালির কাছাকাছি এই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই সামরিক ঘাঁটি করতে চাইছে ওয়াশিংটন। রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান কীভাবে হবে তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই সংকটকে কীভাবে দেখছে বা সামনে দেখবে, তার ওপরও অনেকখানি নির্ভর করছে। যুক্তরাষ্ট্র চাইল এই সংকটকে টিকিয়ে রাখতে পারে যুগের পর যুগ। আবার চীনের বলয়ের বাইরে একটি ভূখণ্ড নিজেদের মিত্র শক্তি হিসেবে এবং আস্থার জায়গা হিসেবে তৈরি করতে ‘স্বাধীন আরাকান’ গঠনেও ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। দেখার বিষয় হচ্ছে তারা কী করে।
তবে ভাগ্য যদি আমাদের এবং এই অঞ্চলের মানুষের খারাপ হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের যত সংঘাত আছে তা এখানেও টেনে আনতে পারে পরাশক্তিরা। দীর্ঘদিনের স্থিতিশীল দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সম্ভাবনা যে উচ্চতায় পৌঁছুতে যাচ্ছে তা অনেকের পছন্দ নাও হতে পারে। যুগে যুগে পরাশক্তিগুলো এটা করে এসেছে। যেখানেই সুযোগ পেয়েছে আঞ্চলিক সংঘাত লাগিয়ে দিয়েছে এবং তা দীর্ঘদিন জিইয়ে রেখেছে। এর লাভ দুই দিক থেকে। এক হলো, তারা সংঘাতের পক্ষগুলোর কাছে অস্ত্র বিক্রি করতে পারে আর দুই হলো, নির্দিষ্ট অঞ্চলের অর্থনৈতক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেওয়া। এখন দেখার বিষয় হচ্ছে আন্তর্জাতিক এই ‘এক্টর’রা রোহিঙ্গা সংকটে কে কোনদিক থেকে কীভাবে রিয়্যাক্ট করে।
লেখক : সাংবাদিক, আরটিভি

জাফর সোহেল