যানজট নিরসনে সাইকেল
ঢাকা শহরে প্রতিদিনই মানুষ বাড়ছে। জীবন ও জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন হাজারো মানুষ আসছে ঢাকায়। মানুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যানবাহনও। বাড়ছে না রাস্তা ও ফুটপাত। যানবাহন যতই বাড়ছে, ততই বাড়ছে যানজট। ভাঙাচোরা, অসমতল কিংবা নোংরা ফুটপাত দিয়ে চলাচল করা কষ্টসাধ্য। অনেক সময় মোটরসাইকেলচালকরা যানজট এড়াতে ফুটপাত দিয়ে চলাচল করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। অগত্যা পথচারীরা ফুটপাত ছেড়ে রাস্তায় নেমে যান। গণপরিবহন হিসেবে এখনো বাসের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। কিন্তু রাস্তায় চলাচলকারী সরকারি বাসের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। যেকোনো যানবাহনে ওঠা হোকই না কেন, গন্তব্যে পৌঁছাতে কতটা সময় লাগবে, তা আর এখন নিশ্চিত করে বলা যায় না। প্রতিদিন যানজটের কারণে নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান কর্মঘণ্টা ও জ্বালানি তেল। ঢাকা শহরের ট্রেন চলাচল ব্যবস্থাও যানজটের একটি কারণ। ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকার মধ্য দিয়ে রেললাইন চলে যাওয়ার ফলে অনেকগুলো ছোট-বড় লেভেল ক্রসিং সৃষ্টি হয়েছে। দিনে অনেকবারই এসব লেভেল ক্রসিং পয়েন্টে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে ট্রেন চলাচল করানো হয় এবং যানজটের সৃষ্টি হয়।
বাণিজ্যিক অফিস ও ব্যাংকপাড়ায় রাস্তার দুপাশে যেখানে সেখানে লাইন দিয়ে সারি সারি ব্যক্তিগত গাড়ি পার্কিং অবস্থাতেই থাকে। যাতায়াতের ভোগান্তি এড়াতে বিত্তবানরা অনেকেই ব্যক্তিগত গাড়ির দিকে ঝুঁকছেন। দুটি ব্যক্তিগত গাড়ি রাস্তার জায়গা দখল করে প্রায় একটি বাসের সমান। একটি বাস চলাচলের নির্ধারিত রুটে চলতি পথে প্রায় ১৯০ জন যাত্রী পরিবহন করতে পারে। ব্যক্তিগত গাড়ি সর্বোচ্চ চারজন বহন করে থাকে। ব্যক্তিগত গাড়িতে যাত্রী চলাচল হয় মাত্র ৩.৮ শতাংশ। ব্যক্তিগত গাড়িগুলোতে যাত্রী চলাচলের সংখ্যা অনেক কম হলেও রাস্তার অধিকাংশ জায়গা দখল করে থাকে। অন্যদিকে ৯৬.২ শতাংশ যাত্রী চলাচল করে বাস, সাইকেল, রিকশা ও হেঁটে। যানজট সমস্যা নিরসনে ও পরিবেশ রক্ষায় সাইকেলের উপযোগিতা অনস্বীকার্য।
দীর্ঘমেয়াদি যানজট নিরসনে পরিবহন হিসেবে সাইকেলের কোনো বিকল্প নেই। অল্প দূরত্ব বা কিছু বেশি দূরত্বে চলাচলের জন্য সাইকেলই সবচেয়ে ভালো বাহন। ইউরোপের প্রায় শহরেরই একটি জনপ্রিয় বাহন সাইকেল। যুক্তরাজ্যে প্রায় ২০ মিলিয়ন সাইকেল ব্যবহৃত হচ্ছে। আমস্টারডামকে তো সাইকেলের রাজধানীই বলা চলে। চীন ও জাপানে সাইকেলের জনপ্রিয়তা তো প্রবাদতুল্য। জাপানে সাইকেল চলাচল প্রচুর পরিমাণে। সেই শিশুকাল থেকেই জাপানিজরা সাইকেল চালানো শুরু করে আর শেষ করে বৃদ্ধ বয়সে। সাইকেল ব্যবহারের কারণেই অধিক জনসংখ্যা থাকা সত্ত্বেও তাদের দেশে তেমন একটা যানজট হয় না। যদিও উন্নত দেশগুলোয় রাস্তার আয়তন অনেক বেশি, তারপরও ওই সব দেশে সাইকেল যানজট নিরসনের ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
যানজট এড়াতে ও যাতায়াতের ভাড়া বাঁচাতে সাইকেল একটি আদর্শ বাহনও বলা চলে। সাইকেল চালাতে কোনো ধরনের জ্বালানি খরচ হয় না, তাই কালো ধোঁয়ারও কোনো ঝামেলা নেই। এটি পরিবেশ দূষণ করে না কিংবা পরিবেশের কোনো ধরনের ক্ষতি সাধন করে না বিধায় এটি পরিবেশবান্ধব বাহন। খুব ভোরে সাইকেল চালিয়ে ঘুরে বেড়ানো রীতিমতো একটি স্বাস্থ্যকর ব্যায়াম। সাইকেল একটি সহজ ও টেকসই বাহন। আকার ও আয়তনে ছোট বলে এটি কোনো যানজট সৃষ্টি করেই না বললেই চলে। একটি ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচলের সময় রাস্তার যতটা অংশ দখল করে রাখে, সাইকেল চলার সময় তার থেকে অনেক কম জায়গা নেয়। পাকিংয়ের জন্য ব্যক্তিগত গাড়ির যথেষ্ট পরিমাণ জায়গার দরকার পড়ে, কিন্তু সাইকেল রাস্তার পাশে কিংবা যেকোনো অফিস-আদালতের নিচে অল্প একটু জায়গার মধ্যেই পার্ক করা যায়। আর একবারেই কোথাও কোনো জায়গা না পেলে সোজা কাঁধে করে নিয়ে গিয়ে অফিসের কোনো এক কোণে কাত করে ফেলে রাখা যায়। সাইকেল চালানো শরীরের পক্ষে যথেষ্ট উপকারী। ব্যস্ত নাগরিক জীবনে নিয়মিত সাইকেল চালানো একটি ভালো অভ্যাস ও ব্যায়াম। এতে শরীরে মেদ জমে না, বাড়তি ক্যালরি কমে যায়, শরীর সুস্থ থাকে এবং কর্মক্ষমতা বাড়ে। দৈনন্দিন জীবনযাপনে অন্তত সপ্তাহে তিন ঘণ্টা সাইকেল চালালে হার্ট অ্যাটাক কিংবা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে যায় বহুলাংশে। ভোরের মুক্ত হাওয়ায় নিরিবিলি রাস্তায় কিংবা ছুটির দিনে ফাঁকা রাস্তায় মনের আনন্দে দলবেঁধে সাইকেল চালানোর মজাই আলাদা। যদিও ঢাকার রাস্তাঘাট ও পরিবেশ সাইকেল চালানোর জন্য এখনো পুরোপুরি উপযুক্ত হয়নি। তবু ও তরুণ-তরুণীদের প্রিয় একটি বাহন সাইকেল।
বাংলাদেশের উৎপাদিত সাইকেল ইদানীং রপ্তানি হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তরুণদের কাছে বাংলাদেশের সাইকেল যেমন পছন্দনীয়, তেমনি সাইকেলিংকে একটি ফ্যাশন ও প্যাশন হিসেবে নিয়েছে বাংলাদেশের অনেক আধুনিক ও স্মার্ট তরুণ-তরুণী। তরুণ-তরুণীরা যানজট নিরসনের জন্য বাহন হিসেবে সাইকেল নিয়ে এগিয়ে আসছে। সাইকেলের বিভিন্ন ক্লাব, গ্রুপ ও নানা সংগঠন তৈরি হচ্ছে দেশজুড়ে। রাজধানী ঢাকাকে যানজটমুক্ত রাখার জন্য এখনই প্রয়োজন বিকল্প যান হিসেবে সাইকেলের ব্যবহার বাড়ানো। সাইকেলে যাতায়াত নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করার জন্য ঢাকার প্রতিটি সড়কে তিন ফুটের একটি সাইকেল লেন তৈরি করা জরুরি হয়ে পড়েছে। যে লেনে শুধু সাইকেলই চলাচল করবে, মোটরসাইকেল নয়।
জাপান, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার রাস্তাগুলোতে সাইকেল প্রতীক অঙ্কিত এ ধরনের আলাদা সাইকেল লেন রয়েছে। অনেক আগে থেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে লাইফ স্টাইল এবং ফ্যাশনেবল যাতায়াতের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে সাইকেল বিবেচিত। বর্তমানে তরুণদের কাছে সাইকেল একটি ক্রেজ। রং-বেরঙের বাহারি সাইকেল, তার সঙ্গে বিভিন্ন উপকরণ যুক্ত করে সাইকেলকে লাইফ স্টাইলের একটি অংশও হিসেবে নিয়েছে বর্তমানের তরুণ প্রজন্ম। ছাত্র, শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যাংকার থেকে শুরু করে সাধারণ পেশাজীরী ও করপোরেট অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী যানজট এড়ানোর জন্য সাইকেল নিয়ে নিয়মিত অফিসে যাতায়াত শুরু করেছেন। নিঃসন্দেহে এটি একটি শুভ লক্ষণ। কয়েক বছর আগেও সাইকেল নিয়ে মাথায় হেলমেট পরে চলাফেরা করাটা ছিল অনেকটা স্বপ্নের মতো; কিন্তু এখন হরহামেশাই দেখা যাচ্ছে, উঠতি বয়সীরা সাইকেল নিয়ে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে প্রচণ্ড উচ্ছ্বাস ও আগ্রহ নিয়ে।
লেখক : সাইক্লিস্ট ও সাইকেলে বিশ্ব ভ্রমণকারী।

আবুল হোসেন আসাদ