মানবিকতা
খাদিজা এখন ‘আব্বু’ বলে ডাকছে!
অক্টোবরের ৩ থেকে ২৫ তারিখ, সময়ের ব্যবধানটা কম নয়। মৃত্যুর সঙ্গে লড়া মেয়েটির মুখে প্রথম বুলি ‘আব্বু’! তাও আবার দীর্ঘ ২২ দিন পর। দুদিন ধরে অস্পষ্ট আওয়াজ করলেও মঙ্গলবার ‘আব্বু’ বলে ডেকেছে খাদিজা। মাকেও চিনতে পারছে একটু একটু। সিলেট মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী খাদিজার শরীরের অবস্থা আগের থেকে বেশ ভালো। সর্বশেষ গত সোমবার তাঁর ‘মাসল চেইন’ কেটে যাওয়া ডান হাতে সফল অস্ত্রোপচার করেন চিকিৎসকরা।
দায়িত্বরত ডাক্তারদের প্রত্যাশা, কয়েক মাসের মধ্যে খাদিজা অনেকাংশেই সুস্থ হয়ে ফিরবেন নিজ গৃহে। বাবা মাসুক মিঞার কাছে এখন এর চেয়ে ভালো সংবাদ বোধ হয় আর নেই। খাদিজার ‘আব্বু’ ডাক তাঁর পরিবারের সবাইকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। সবার মাঝে ফিরে আসবে প্রিয় খাদিজা, এ বিশ্বাস দৃঢ় হচ্ছে দিন দিন।
বদরুলের চাপাতির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত খাদিজার অবস্থার অবনতি হলে ৪ অক্টোবর ভোরে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে আনা হয়। ওই দিনই অস্ত্রোপচারের পর নিবিড় পরিচর্যায় রাখা হয় তাঁকে। খাদিজা এখন স্কয়ারের হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিটে আছেন। তাঁর শরীর থেকে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের যন্ত্রপাতি ও খাওয়ানোর জন্য যন্ত্রপাতি খুলে নেওয়া হয়েছে। শারীরিক অবস্থার আরো উন্নতি হওয়ার পর হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিট থেকে খাদিজাকে কেবিনে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন চিকিৎসকরা। খাদিজার শারীরিক অবস্থার উন্নতি দেখে খাদিজার ভাই শাহীন আহমেদ গত সোমবার চীনে ফিরে গেছেন। চীনের একটি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী খাদিজার ভাই শাহীন। খাদিজার আহত হওয়ার খরব শুনে সৌদিপ্রবাসী খাদিজার বাবা মাশুক মিয়া ৬ অক্টোবর দেশে ফেরেন। একই দিনে দেশে আসেন খাদিজার ভাই শাহীন আহমেদ।
খাদিজার বাবা মাশুক মিয়া মেয়ের সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে গতকাল গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, খাদিজা আজ খুব আস্তে আমাকে আব্বু বলে ডেকেছে। আমি নিজ কানে শুনেছি। আমার মনে হলো, ও আমাকে, ওর মাকে এবং আমাদের আত্মীয়স্বজনকে হালকা হালকা চিনতে পারছে। চিকিৎসকরা আমাদের বলেছেন, দু-চার দিনের মধ্যেই ওকে কেবিনে দিয়ে দেবেন। খাদিজা এখন কোনো কৃত্রিম যন্ত্রের সাহায্য ছাড়াই অল্পস্বল্প খাওয়া-দাওয়া করছে। বেশির ভাগ সময়ই তাকে তরল খাবার দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসকরা ধারণা করছেন, দু-তিন মাস পরে খাদিজার শারীরিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে।
স্কয়ার হাসপাতালের চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচারের পর খাদিজার শরীরের ডান দিকে সাড়া ফিরলেও বাঁ হাত ও বাঁ পা নাড়াতে পারছিলেন না। এই সপ্তাহের শুরু থেকে খাদিজা বাঁ পাও সামান্য নাড়াতে পারছেন। তবে বাঁ পা নাড়াতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। ১৭ অক্টোবর তাঁর ডান হাতে অস্ত্রোপচার করা হয়। বাঁ হাতটি খাদিজা এখনো নাড়াতে পারছেন না। এই হাতে অনুভূতি ফিরে এলে আরো এক দফা অস্ত্রোপচারের মুখোমুখি হতে হবে তাঁকে।
৩ অক্টোবর সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের (ডিগ্রি) ছাত্রী খাদিজা বেগম পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পথে বদরুল আলমের হামলার শিকার হন। মাথায় গুরুতর আঘাত নিয়ে প্রথমে খাদিজাকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অস্ত্রোপচারের পর অচেতন অবস্থাতেই খাদিজাকে ওই দিন দিবাগত রাতে তাঁর স্বজনরা স্কয়ার হাসপাতালে নিয়ে আসেন। সংকটজনক অবস্থাতেই খাদিজার মাথায় অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারের ৯৬ ঘণ্টা পর চিকিৎসকরা জানান, খাদিজার আর জীবন সংশয় নেই।
এ ঘটনার পর ক্ষোভে ফেটে পড়ে সারা সিলেট। বিক্ষোভে উত্তাল জনতা প্রতিবাদ করতে থাকে সারা দেশ থেকে। ঘাতক বদরুলের বিচার চেয়ে রাস্তায় নেমে আসে ছাত্র-জনতা। বদরুল এখন শ্রীঘরে। খাদিজা সুস্থ হয়ে ফিরবেন প্রিয়জনদের মধ্যে। প্রিয় ক্যাম্পাসের বান্ধবীদের সঙ্গে মিলবে তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে। গ্রামের চিরচেনা মেঠো পথে আবারও আলো ছাড়াবেন খাদিজা। শারীরিক অবস্থার যেভাবে উন্নতি হচ্ছে, তাতে মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে ফিরে আসবে খাদিজা। সমাজের কাছে বিবেকের দায়বদ্ধতা বাড়িয়ে দিতে খাদিজার এই বেঁচে থাকা হবে প্রেরণার। বদরুলের মতো ঘাতকের মুখে চুনকালি দিতে খাদিজার ফিরে আসাটা আজ খুব বেশি প্রয়োজন।
লেখক : শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

ফয়জুল্লাহ ওয়াসিফ