ধানমন্ডি লেক ও রবীন্দ্র সরোবর : সৌন্দর্য আর কিছু বাস্তব সমস্যা
যান্ত্রিক ঢাকার কংক্রিটের ও ইট-পাথরের জঙ্গল থেকে কিছুটা স্বস্তি ও বিশুদ্ধ নিঃশ্বাসের খোঁজে বের হওয়া ঢাকাবাসীর জন্য ধানমন্ডি লেক ও রবীন্দ্র সরোবর এক অবিচ্ছেদ্য নাম।
সকালের স্নিগ্ধ আলো থেকে শুরু করে গোধূলির মায়াবী বেলা সব সময়ই এই এলাকাটি নানা বয়সি মানুষের পদচারণায় মুখর থাকে। তবে রাজধানী শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই বিশাল জলাশয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটিকে ঘিরে জনমনে রয়েছে নানা মিশ্র প্রতিক্রিয়া এবং ভিন্নমুখী দৃষ্টিভঙ্গি। একদিক থেকে যেমন এটি নাগরিক জীবনের অন্যতম সেরা মানসিক প্রশান্তির জায়গা, অন্যদিকে এর ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ এবং সামাজিক প্রভাব নিয়ে রয়েছে নানা ধরনের সমালোচনা ও বিতর্কের অবকাশ।
ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, ধানমন্ডি লেক ও রবীন্দ্র সরোবরকে ঢাকার প্রাণকেন্দ্রের ফুসফুস বলা চলে। ভোর হতেই লেকের চারপাশের আধুনিক ওয়াকওয়েগুলো মুখর হয়ে ওঠে মর্নিং ওয়াক করা স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের পদচারণায়। পাখির কিচিরমিচির শব্দ আর গাছের ছায়ায় ঘেরা শান্ত পরিবেশ শহরের ক্লান্তি দূর করতে অনন্য ভূমিকা পালন করে।
অন্যদিকে, বিকেল গড়ালে লেকপাড় পরিণত হয় এক বিশাল মিলনমেলায়। তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতে আসা নানা বয়সি মানুষের উপস্থিতি এই স্থানটিকে প্রাণবন্ত করে রাখে। এর বাইরে, ধানমন্ডি লেকেরই একটি বিশেষ অংশ রবীন্দ্র সরোবর দীর্ঘদিন ধরে বাংলা সংস্কৃতিচর্চা, পথনাটক, সংগীত সন্ধ্যা এবং মুক্তমঞ্চের বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে রাজধানীর সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। ছুটির দিনগুলোতে এখানে আয়োজিত নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড তরুণ প্রজন্মকে দেশীয় সংস্কৃতির সাথে সংযুক্ত রাখতে দারুণভাবে সাহায্য করছে। এছাড়া স্ট্রিট ফুড, ফুচকা-চটপটি থেকে শুরু করে লেকপাড়ের অভিজাত ক্যাফে ও রেস্তোরাঁগুলো ফুড লাভারদের জন্য এটিকে একটি জনপ্রিয় আড্ডার স্থানে পরিণত করেছে।
তবে এসব ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি এই এলাকার পরিবেশ ও জনজীবন নিয়ে রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নেতিবাচক দিক ও সমালোচনা। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের অতিরিক্ত জনসমাগম এবং নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করার কারণে লেকের চারপাশের পরিবেশ ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে। অসচেতন দর্শনার্থীদের ফেলে যাওয়া পলিথিন, প্লাস্টিক এবং নানা ধরনের ময়লা-আবর্জনা সরাসরি লেকের পানিতে মিশে এর জলজ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে নষ্ট করছে। এছাড়া হকারদের দৌরাত্ম্য ও অবৈধ দখলের কারণে হাঁটার ওয়াকওয়েগুলো প্রায়ই সংকুচিত হয়ে পড়ে, যার ফলে সাধারণ মানুষের স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটার পরিবেশ ব্যাহত হয়। রবীন্দ্র সরোবরের সাংস্কৃতিক কার্যক্রম প্রশংসনীয় হলেও, অনেক সময় অতিরিক্ত উচ্চস্বরে মাইক ও লাউডস্পিকার বাজানোর কারণে আশেপাশের আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের শান্তি ও পড়াশোনায় মারাত্মক বিঘ্ন ঘটে, যা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা যায়। পাশাপাশি, খোলা জায়গায় অপরিকল্পিতভাবে খাবার বিক্রি এবং তা থেকে সৃষ্ট বর্জ্য এলাকার পরিচ্ছন্নতা নষ্ট করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সবমিলিয়ে, ধানমন্ডি লেক ও রবীন্দ্র সরোবর একাধারে যেমন নাগরিক বিনোদন, সুস্থ শরীরচর্চা ও সংস্কৃতিচর্চার সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম, তেমনি অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও দর্শনার্থীদের উদাসীনতার কারণে এটি নানাবিধ পরিবেশগত সমস্যারও মুখোমুখি। এই ঐতিহ্যবাহী স্থানটির দীর্ঘস্থায়ী সৌন্দর্য ও প্রাণপ্রবাহ টিকিয়ে রাখতে হলে কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। সঠিক পরিকল্পনা ও সুশৃঙ্খল রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলেই কেবল এই স্থানটি ঢাকাবাসীর জন্য একটি প্রকৃত সবুজ ও নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে টিকে থাকতে পারে।

তাওসিফ আহমেদ সূর্য