সোমবার হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু, কোন দিন কী করবেন হাজিরা?
সৌদি আরবে জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা যাওয়ায় পবিত্র হজ ও ঈদুল আজহার তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ২৫ মে থেকে শুরু হতে যাচ্ছে মুসলমানদের অন্যতম ইবাদত হজ। এটি ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ। এতে প্রায় ২০ লাখ মুসলমান অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশ। খবর আল-জাজিরার।
এই প্রতিবেদনে মুসলমানরা কীভাবে হজ পালন করেন এবং হজের জন্য কী কী প্রধান ধাপ, আচার-অনুষ্ঠান এবং প্রস্তুতি নিতে হয় তা তুলে ধরা হলো।
হজ কী?
প্রতি বছর হজ করতে বিশ্বের নানা প্রান্তের মুসলমানরা সৌদি আরবের মক্কায় সমবেত হন। কালেমা, নামাজ, যাকাত, রোজার পাশাপাশি হজ ইসলামের পঞ্চম ও সর্বশেষ স্তম্ভ।
হজ শব্দটি আরবি মূল ‘হ-জ-জ’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘যাত্রার অভিপ্রায়’ বা ‘কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করা’। শারীরিক ও আর্থিকভাবে সক্ষম সব প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের জন্য জীবনে একবার হলেও এই ইবাদতটি করা ফরজ।
হজ কখন অনুষ্ঠিত হয়?
আরবি বর্ষপঞ্জির দ্বাদশ ও শেষ মাস জিলহজের ৮ তারিখে শুরু হয়ে ১২ তারিখে শেষ হয়। সাধারণত রমজান মাস শেষ হওয়ার প্রায় ৭০ দিন পর হজ অনুষ্ঠিত হয়, তবে চাঁদের ওপর নির্ভর করে সময়সীমায় সামান্য তারতম্য ঘটতে পারে।
এ বছর হজ ২৫ মে শুরু হবে, কিন্তু অনেক হজযাত্রী প্রস্তুতি নিতে কয়েক সপ্তাহ আগেই সৌদি আরবে পৌঁছেন। আরবি বর্ষপঞ্জি চাঁদের ওপর নির্ভর করে এবং এর মাসগুলো ২৯ বা ৩০ দিনের হয়। এতে প্রতি বছর হজ খ্রিস্টীয় বর্ষপঞ্জিতে ১০ থেকে ১২ দিন এগিয়ে আসে।
মুসলমানরা কেন হজ পালন করে?
পবিত্র কোরআন অনুসারে মুসলমানরা হজকে আল্লাহর পক্ষ থেকে সরাসরি আদেশ হিসেবে বিশ্বাস করে। আরবি বর্ষপঞ্জি ১০ হিজরিতে, অর্থাৎ ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে ইসলামের সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ‘বিদায় হজ’ করেন। পবিত্র কোরআনে বেশ কয়েকবার হজের বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে।
হজে মুসলমানরা আল্লাহর কাছে নিজদের গুনাহ মাফের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। হজের মাধ্যমে মুসলমানরা আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেন এবং ইহকাল ও পরকালের জন্য শান্তি-কল্যাণ কামনা করেন।
হজ কীভাবে পালন করা হয়?
মুসলমানরা হজের পাঁচ দিন ধরে বিভিন্ন নিয়মকানুন ও আচার-অনুষ্ঠান পালন করে থাকেন। হজের ধারাবাহিক নিয়মাবলি ও পদক্ষেপগুলো নিচে তুলে ধরা হলো—
প্রথম দিন (সোমবার)
মক্কায় আগমন ও নিয়ত : হজ পালনের নিয়ত করার পর মক্কায় প্রবেশের আগে হাজিরা ইহরাম পরিধান করেন। পুরুষরা দুটি সাদা পোশাক এবং নারীরা শালীন পোশাক পরেন। ইহরামের এই বিশেষ পোশাক সমতা, নম্রতা ও ঐক্যের প্রতীক। এর মাধ্যমে জাতি, সম্পদ ও মর্যাদার ভেদাভেদ বিলুপ্ত হয়ে যায়।
তাওয়াফ : হাজিরা প্রথমে তাওয়াফ আল-কুদুম সম্পন্ন করেন, অর্থাৎ কাবা শরিফে আগমনী তাওয়াফ করেন তারা। তাওয়াফের সময় মুসলমানরা ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে পবিত্র কাবা শরীফ সাতবার প্রদক্ষিণ করেন। এটি এক আল্লাহর উপাসনায় মুসলমানদের ঐক্যের প্রতীক।
সাঈ করা : হাজিদের সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সাতবার হেঁটে সাঈ সম্পন্ন করতে হয়। সাঈ করার এই আচার নবী ইব্রাহিম (আ.) এর স্ত্রী হাজেরা তাঁদের ছেলে ইসমাইল (আ.) এর জন্য মক্কার মরু উপত্যকায় পানির অনুসন্ধানের ঘটনাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এরপর আল্লাহ তায়ালার অশেষ মেহেরবানিতে সেখানে জমজম কূপের উদঘাটন ঘটে।
ইসলামী ইতিহাস অনুসারে, এই জমজম কূপ চার হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে শুষ্ক মরুভূমিতে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করে আসছে। এরপর হাজিরা মিনায় যান এবং সেখানে রাতে অবস্থান করেন।
মিনায় অবস্থান : এরপর হাজিরা কাবা থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত মিনার উদ্দেশে রওনা করেন। সেখানে তাঁরা তাঁবুতে প্রার্থনা ও ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে রাত কাটান। ফজর নামাজ শেষে তারা আরাফাত ময়দানের উদ্দেশে যাত্রা করেন।
দ্বিতীয় দিন (মঙ্গলবার)
আরাফাত ময়দানে অবস্থান : মিনা থেকে হাজিরা প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আরাফাত পর্বতের ময়দানে পৌঁছেন। তারা সেখানে সূর্যাস্ত পর্যন্ত প্রার্থনা ও তওবা করে সময় কাটান। নামাজ, কোরআন পাঠ, দোয়া ও ইবাদতের মধ্য দিয়ে দিনটি অতিবাহিত করেন তারা।
আরাফাতের ময়দানে সমবেত হয়ে প্রার্থনা করা ও খুতবা শোনা হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। এটি কেয়ামত দিবসের কথা মনে করিয়ে দেয়। বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা এই দিনে রোজা রাখেন এবং ইবাদতে মগ্ন থাকেন।
মুজদালিফায় রাতযাপন : সূর্যাস্তের পর হাজিরা ৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মুজদালিফায় যান। সেখানে তারা পরের দিনের অনুষ্ঠানের জন্য নুড়ি পাথর সংগ্রহ করেন। এরপর মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় করেন। হাজিরা এখানে আল্লাহকে স্মরণ করে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটান।
তৃতীয় দিন
শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ : মুজদালিফা থেকে হাজিরা মিনার জামারাতে গিয়ে শয়তানের উদ্দেশে পাথর নিক্ষেপ করেন। এদিন পাথরের স্তম্ভে সাতটি নুড়ি পাথর নিক্ষেপ করেন তারা। হাজিদের পাথর নিক্ষেপের এই কার্যক্রম শয়তানের প্রলোভনকে প্রত্যাখ্যানের প্রতীক।
পশু কোরবানি : এই দিনে সারা বিশ্বের মুসলমানরা ঈদুল আজহার নামাজ আদায় এবং পরে পশু কোরবানি করেন। এ কার্যক্রম আল্লাহর আদেশ পালনে ইব্রাহিম (আ.) এর নিজ পুত্রকে উৎসর্গ করার ইচ্ছা এবং আল্লাহর কৃপায় অলৌকিকভাবে পশু জবাই হওয়ার ঘটনাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। মুসলমানরা তিন দিন (১০, ১১ ও ১২ জিলহজ) পশু কোরবানি করতে পারেন।
মাথা মুণ্ডন এবং ইহরামের কাপড় পরিবর্তন : পশু কোরবানির পর পুরুষেরা মাথার চুল কামিয়ে ফেলেন বা ছেঁটে নেন এবং নারীরা তাদের চুলের একটি ছোট অংশ কেটে ফেলেন।
মূল তাওয়াফ : এরপর হাজিরা তাওয়াফ করার জন্য মক্কায় ফিরেন। সেখানে তারা কাবা শরিফ প্রদক্ষিণ করেন এবং এরপর সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে সাতবার হেঁটে সাঈ করেন।
চতুর্থ ও পঞ্চম দিন
পুনরায় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ : হাজিরা এরপর আবারও মিনায় ফিরে তিনটি পাথরের স্তম্ভে পাথর নিক্ষেপ করেন। তবে যে হাজিরা অতিরিক্ত একদিন থেকে যান, তারা আরও একবার তিনটি স্তম্ভেই শয়তানের উদ্দেশে পাথর নিক্ষেপ করেন।
বিদায়ী তাওয়াফ : হজের সর্বশেষ আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে কাবা শরিফে বিদায়ী তাওয়াফ করেন হাজিরা।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক