তারুণ্য আর অভিজ্ঞতার মেলবন্ধন : দ্বিতীয় ট্রফির সন্ধানে লা রোহারা
ফুটবল ইতিহাসে ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ ছিল ‘টিকি-টাকা’ পাসিং স্টাইলের এক নান্দনিক মহাকাব্য, যা বিশ্ব ফুটবলের এক নতুন স্বর্ণমান নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু কাতার ২০২২ বিশ্বকাপে লুইস এনরিকের অধীনে বল দখলে রাখার সেই চিরচেনা কৌশলটিই যেন একগুঁয়েমিতে রূপ নিয়েছিল, যার চরম মূল্য দিতে হয়েছিল শেষ ১৬-র মঞ্চে মরক্কোর জমাট রক্ষণভাগের কাছে পেনাল্টি শুটআউটে হেরে। কাতার ট্র্যাজেডির সেই ব্যর্থতা ও যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতি ভুলে এবার নতুন এক ভোরের অপেক্ষায় স্প্যানিশ ফুটবল।
উয়েফা ইউরো ২০২৪ জয় এবং ২০২৪-২৫ উয়েফা নেশনস লিগের ফাইনালে ওঠার আত্মবিশ্বাসকে সঙ্গী করে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল এবার পা রাখছে তাদের ১৭তম বিশ্বকাপ মিশনে। লক্ষ্য একটাই— দেশের ফুটবলের পথপ্রদর্শক সেই ‘স্বর্ণালী প্রজন্ম’-এর পথ অনুসরণ করে উত্তর আমেরিকার ঐতিহাসিক মঞ্চে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি ঘরে তোলা।
লুইস দে লা ফুয়েন্তে এবং রণকৌশলের বৈচিত্র্য
অনূর্ধ্ব-১৯ এবং অনূর্ধ্ব-২১ দলের হয়ে সাফল্যের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে স্পেনের মূল কোচের হট সিটে বসেন লুইস দে লা ফুয়েন্তে। সাবেক এই ফুল-ব্যাক স্পেনের আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার মূল নীতি বজায় রেখেছেন ঠিকই, তবে বল নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি প্রতি-আক্রমণ এবং দ্রুত আক্রমণে মনযোগ দিয়ে দলের খেলার ধরনে এক যুগান্তকারী বৈচিত্র্য এনেছেন।
দে লা ফুয়েন্তের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, তিনি একঝাঁক প্রতিভাবান তরুণ খেলোয়াড়দের দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছেন। যাদের অনেকের সঙ্গেই তিনি যুব বয়সসভিত্তিক দলে কাজ করেছিলেন। বর্তমান ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন স্পেন তাদের ইউরো ২০২৪ জয়ী দলটির মূল কাঠামো ও মানসিকতাকে ধরে রেখেই বিশ্বজয়ের মিশন সাজিয়েছে।
বাছাইপর্বে অপরাজেয় স্পেন
উত্তর আমেরিকার টিকিট পাওয়ার যাত্রায় স্পেন অপরাজেয় বাছাইপর্বের অভিযান পার করেছে। বুলগেরিয়া ও জর্জিয়ার বিপক্ষে হোম ও অ্যাওয়ে উভয় ম্যাচেই জয় তুলে নিয়েছিল লা রোহারা। একমাত্র পয়েন্ট হারিয়েছিল ঘরের মাঠে তুরস্কের বিরুদ্ধে ২-২ গোলে ড্র করে। যদিও এর আগে অ্যাওয়ে ম্যাচে এই তুরস্ককেই ৬-০ ব্যবধানে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল স্পেন। শেষ ম্যাচে তুরস্কের বিপক্ষে কেবল বড় ব্যবধানে পরাজয় এড়ানোর সমীকরণ নিয়ে মাঠে নেমে অনায়াসেই মূল পর্ব নিশ্চিত করে তারা।
২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের সূচি
গ্রুপ পর্বে স্পেনকে লড়তে হবে তিনটি ভিন্ন মহাদেশীয় শক্তির বিরুদ্ধে। সূচি অনুযায়ী, আগামী ১৫ জুন আটলান্টা স্টেডিয়ামে আফ্রিকা মহাদেশের বিশ্বকাপের নবাগত কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করবে স্পেন। ২১ জুন একই স্টেডিয়ামে এশিয়ার দেশ সৌদি আরবের বিপক্ষে খেলবে স্প্যানিশরা। এরপর ২৬ জুন এস্তাদিও গুয়াদালাহারা স্টেডিয়ামে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ উরুগুয়ের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ খেলবে স্পেন।
স্কোয়াডের শক্তি ও দুর্বলতা
কোচ দে লা ফুয়েন্তে অভিজ্ঞতার সঙ্গে তারুণ্যের এক বিধ্বংসী মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। যেখানে লা লিগা চ্যাম্পিয়ন বার্সেলোনারই আটজন খেলোয়াড় জায়গা পেয়েছেন।
গোলপোস্টের নিচে বিশ্বস্ত দেয়াল হিসেবে থাকছেন উনাই সিমন। ডেভিড রায়া এবং হোয়ান গার্সিয়াও আছেন সেরা ছন্দে। অভিজ্ঞ আয়মেরিক লাপোর্তের সঙ্গে বার্সেলোনার বিস্ময়বালক পাও কুবারসির সেন্ট্রাল ডিফেন্স জুটিকে বর্তমান ফুটবলের অন্যতম সেরা ভাবা হচ্ছে। উইং-ব্যাকে মার্ক কুকুরেলা এবং অ্যালেক্স গ্রিমালদোর গতি ও ওভারল্যাপ করার ক্ষমতা স্পেনের রক্ষণ ও আক্রমণ উভয় ভাগকেই দুর্দান্ত ভারসাম্য দিচ্ছে।
এবারের বিশ্বকাপে স্পেনের মিডফিল্ডকে বলা হচ্ছে অন্যতম সেরা মিল্ড। যেখানে ব্যালন ডি’অর জয়ী রদ্রি এবং মার্টিন জুবিমেন্দি ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড আগলে রাখবেন। আর সামনে থেকে খেলা নিয়ন্ত্রণ করবেন পেদ্রি, গাভি এবং ফ্যাবিয়ান রুইজের মতো তারকারা।
পুরো বিশ্বের সবচেয়ে ভীতিজাগানিয়া উইং আক্রমণভাগ এবারে স্পেনের। ডান প্রান্তে লামিনে ইয়ামাল এবং বাম প্রান্তে নিকো উইলিয়ামসের বিধ্বংসী গতি, ড্রিবলিং ও নিখুঁত ক্রস প্রতিপক্ষের যেকোনো ডিফেন্সকে চুরমার করার জন্য যথেষ্ট। সঙ্গে দানি ওলমোর ক্রিয়েটিভিটি এবং ফেরান তোরেস ও অয়ারজাবালের ফিনিশিং লাইন-আপটিকে পূর্ণতা দিয়েছে।
তবে স্কোয়াডে বিশ্বমানের বা প্রথাগত স্ট্রাইকারের কিছুটা অভাব রয়েছে। আলভারো মোরাতার অনুপস্থিতিতে বোর্জা ইগলেসিয়াস বা তোরেসরা বক্সের ভেতর কতটা ফিজিক্যাল উপস্থিতি ও নিখুঁত ফিনিশিং দিতে পারেন, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। এছাড়া স্পেন যখন অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে হাই-লাইন ডিফেন্স গড়ে তোলে, তখন প্রতিপক্ষের গতিময় কাউন্টার অ্যাটাকের সামনে তাদের রক্ষণভাগ কিছুটা অরক্ষিত হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
স্পেনের বিশ্বকাপ জার্নি
১৯৩৪ সালের ইতালি বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম অভিষেকেই স্প্যানিশরা শেষ ১৬-র লড়াইয়ে খোদ ব্রাজিলকে পরাজিত করে ইতিহাস গড়েছিল। এরপর কোয়ার্টার ফাইনালে তারা স্বাগতিক ইতাহির সঙ্গে অতিরিক্ত সময়ের পর ১-১ গোলে ড্র করে। যা ছিল এই প্রতিযোগিতার ইতিহাসের প্রথম ড্র। রিপ্লে ম্যাচে অবশ্য তারা ১-০ ব্যবধানে হেরে বিদায় নেয়।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের আলো-ছায়া
যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ৩-১, চিলির বিপক্ষে ২-০ এবং ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১-০ ব্যবধানের জয় নিয়ে ১৯৫০ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে চতুর্থ স্থান অর্জন করা ছিল স্পেনের অন্যতম বড় এক সাফল্য।
তবে একটি শিরোপা পেতে স্পেনকে করতে হয়েছে দীর্ঘ অপেক্ষা। অবশেষে ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে ভিসেন্তে দেল বস্কের পরিচালনায় কার্লেস পুয়োল, জাভি, ইনিয়েস্তা ও ইকার ক্যাসিয়াসদের হাত ধরে সেই অপেক্ষা পূর্ণতা পায়। ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার সেই ঐতিহাসিক জয়সূচক গোল এবং প্রয়াত দানি জার্ককে উৎসর্গ করা উদযাপন ফুটবল ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।
এরপর ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে কোস্টারিকাকে ৭-০ ব্যবধানে হারিয়ে নিজেদের বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জয় তুলে নিয়েছিল স্পেন। দানি অলমো, অ্যাসেনসিও, ফেরান তোরেস ও গাভির সেই গোলবন্যা ফুটবলীয় দক্ষতার এক অসাধারণ প্রদর্শনী ছিল। যদিও শেষটা হয়েছিল মরক্কোর কাছে টাইব্রেকারের ট্র্যাজেডিতে।
ভিয়া ও ক্যাসিয়াসের অমরত্ব
বিশ্বকাপের মঞ্চে তিন আসরে ৯টি গোল করে ডেভিড ভিয়া এখন পর্যন্ত স্পেনের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। তার পরেই চার আসরে ১৭টি করে ম্যাচ খেলে স্পেনের হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার যৌথভাবে শীর্ষ স্থানটি ধরে রেখেছেন তিন নির্ভরযোগ্য তারকা— ইকার ক্যাসিয়াস, সার্জিও রামোস এবং সার্জিও বুসকেটস। ১৬টি ম্যাচ খেলে এর পরেই রয়েছেন গোলরক্ষক আন্দোনি জুবিজারেতা।
২০২৬ বিশ্বকাপে স্পেনের লক্ষ্য
লুইস দে লা ফুয়েন্তের ২৬ জনের স্কোয়াডটি নিঃসন্দেহে ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট। তারুণ্য আর অভিজ্ঞতার মিশনে এবং ‘টিকি-টাকা’র সঙ্গে আধুনিক গতির মেলবন্ধনে স্পেনের আত্মবিশ্বাস এখন তুঙ্গে। ২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকার মঞ্চে আর্জেন্টিনা বা ফ্রান্সের মতো পরাশক্তিদের হারিয়ে লা রোহাদের লক্ষ্য দ্বিতীয় শিরোপা উঁচিয়ে ধরা।
স্পেনের বিশ্বকাপ স্কোয়াড
গোলরক্ষ : উনাই সিমন, ডেভিড রায়া এবং হোয়ান গার্সিয়া।
রক্ষণভাগ : মার্ক কুকুরেলা, পাও কুবারসি, আয়মেরিক লাপোর্তে, অ্যালেক্স গ্রিমালদো, পেদ্রো পোরো, এরিক গার্সিয়া, মার্কোস লরেন্তে ও মার্ক পিউবিল।
মিডফিল্ড : রদ্রি, পেদ্রি, গাভি, ফ্যাবিয়ান রুইজ, মার্টিন জুবিমেন্দি, অ্যালেক্স বায়েনা ও মেরিনো।
আক্রমণভাগ : লামিনে ইয়ামাল, দানি ওলমো, নিকো উইলিয়ামস, ফেরান তোরেস, মাইকেল অয়ারজাবাল, জেরেমি পিনো, বোর্জা ইগলেসিয়াস ও ভিক্টর মুনোজ।

ক্রীড়া প্রতিবেদক