যে বিশ্বকাপ বদলে দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল মানচিত্র
একসময় যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবল ছিল অনেকটা উপেক্ষিত একটি খেলা। বেসবল, আমেরিকান ফুটবল, বাস্কেটবল আর আইস হকির দাপটে ফুটবল ছিল প্রায় আড়ালেই। অথচ আজ সেই দেশেই বিশ্বকাপের টিকিট পেতে হিমশিম খাচ্ছেন সমর্থকেরা। পেশাদার লিগ বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ লিগে পরিণত হয়েছে। আর লিওনেল মেসির মতো মহাতারকা খেলছেন স্থানীয় ক্লাবে। মাত্র ৩২ বছরে এমন বদলে যাওয়ার শুরুটা হয়েছিল ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ দিয়ে।
সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রে কোনো শীর্ষ পর্যায়ের পেশাদার ফুটবল লিগ ছিল না। জাতীয় দলে ছিলেন সাবেক কলেজ ফুটবলার, আধা পেশাদার ও বিভিন্ন ছোট ক্লাবের খেলোয়াড়েরা। বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পেলেও আয়োজকদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিল, স্টেডিয়ামের আসন আদৌ পূর্ণ হবে কি না।
কিন্তু সব শঙ্কা উড়িয়ে দেয় ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ। পুরো টুর্নামেন্টে মাঠে বসে খেলা দেখেন রেকর্ড ৩৫ লাখ দর্শক। প্রতি ম্যাচে গড়ে প্রায় ৬৯ হাজার দর্শক উপস্থিত ছিলেন, যা এখনো বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা। শুধু গ্যালারিতেই নয়, মাঠেও চমক দেখায় স্বাগতিকরা। ১৯৩০ সালের পর প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে ওঠে যুক্তরাষ্ট্র। শেষ ষোলোতে পরবর্তীতে চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের কাছে মাত্র ১–০ গোলে হেরে বিদায় নেয় তারা।
তবে সেই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল অন্য জায়গায়। যেটি বদলে দেয় যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলের ভবিষ্যৎ।
বিশ্বকাপ আয়োজনের অন্যতম শর্ত ছিল একটি পেশাদার লিগ চালু করা। সেই প্রতিশ্রুতি থেকেই ১৯৯৬ সালে যাত্রা শুরু করে মেজর লিগ সকার, সংক্ষেপে এমএলএস।
শুরুর এমএলএস আর আজকের এমএলএসের মধ্যে পার্থক্য বিশাল। ১০ দল নিয়ে শুরু হওয়া লিগ এখন ৩০ দলের। ২২টি ক্লাবের নিজস্ব ফুটবল স্টেডিয়াম রয়েছে। প্রতি ম্যাচে গড়ে প্রায় ২০ হাজার দর্শক মাঠে আসেন। একসময় যে দেশে ফুটবলের জন্য আলাদা স্টেডিয়ামই ছিল না, আজ সেখানে আধুনিক অবকাঠামো গড়ে উঠেছে দেশের নানা প্রান্তে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও বদলে গেছে চিত্র। বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান ৫০টি ফুটবল ক্লাবের মধ্যে ১৮টিই এখন এমএলএসের। লস অ্যাঞ্জেলেস এফসির বাজারমূল্য প্রায় ১২৫ কোটি ডলার। সম্প্রতি কলম্বাসের নারী ফুটবল দলের মালিকানা বিক্রি হয়েছে ২০ কোটি ৫০ লাখ ডলারে। যা নারী ক্লাব ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম বড় চুক্তি।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল ফেডারেশনের অধীনে রয়েছে ১২৭টি পেশাদার দল। এর মধ্যে ১০২টি পুরুষ এবং ২৫টি নারী দল। শীর্ষ লিগের পাশাপাশি দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের প্রতিযোগিতাও শক্তিশালী হয়েছে। ফলে ফুটবল এখন আর একটি প্রান্তিক খেলা নয়, বরং দেশের ক্রীড়া সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে সবকিছুই যে নিখুঁত, তা নয়। সাবেক মার্কিন তারকা এরিক উইনাল্ডার মতে, অবকাঠামো যতই উন্নত হোক, প্রতিযোগিতার মান না বাড়লে বিশ্বমানের খেলোয়াড় তৈরি করা কঠিন। তার মতে, পদোন্নতি ও অবনমন ব্যবস্থা চালু হলে প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে এবং খেলোয়াড়দের মানসিক দৃঢ়তাও তৈরি হবে।
অন্যদিকে, ১৯৯৪ বিশ্বকাপের আরেক সদস্য অ্যালেক্সি লালাসের বিশ্বাস, ফুটবল হয়তো এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা নয়। কিন্তু এটি এখন দেশের ক্রীড়া সংস্কৃতির স্থায়ী অংশ। মেসির আগমন, দর্শকের আগ্রহ এবং এমএলএসের বাণিজ্যিক সাফল্যই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবলের বীজ বপন করেছিল। সেটি এখন গাছে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ সেই গাছকে আরও বড় করে তোলার সুযোগ এনে দিয়েছে। তিন দশক আগে যে দেশটি দর্শক টানতে শঙ্কায় ছিল। আজ সেই দেশেই টিকিটের চাহিদা সরবরাহের বহু গুণ বেশি।
এখন দেখার বিষয়, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ কি শুধু আরেকটি সফল আয়োজনই হবে, নাকি এটি যুক্তরাষ্ট্রকে ফুটবল বিশ্বের প্রকৃত পরাশক্তি হওয়ার পথেও আরও এক ধাপ এগিয়ে দেবে।

ক্রীড়া প্রতিবেদক