যে কারণে ‘সব যুগের সেরা’ মেসি
বিশ্বকাপের ইতিহাসে শিরোপা ধরে রাখা সব সময়ই সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। ১৯৬২ সালের পর আর কোনো দল টানা দুইবার বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। তাই ২০২৬ সালে আর্জেন্টিনা যদি সেই কীর্তি গড়ে, তবে ইতিহাসের পাতায় নতুন অধ্যায় যোগ হবে। আর সেই ইতিহাসের কেন্দ্রে থাকবেন লিওনেল মেসি। ৩৮ বছর বয়সে নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলছেন তিনি। এর মাধ্যমে পর্তুগালের ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও মেক্সিকোর গিয়ের্মো ওচোয়ার সঙ্গে যৌথভাবে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ অংশগ্রহণের রেকর্ড গড়েছেন। তবে এবারের মেসি আর সেই কিশোর নন। যিনি ২০০৩ সালে বার্সেলোনার জার্সিতে প্রথমবার সিনিয়র দলে নেমেছিলেন। গত দুই দশকে তিনি শুধু একজন মহান ফুটবলারই হননি। বারবার নিজেকে নতুন করে তৈরি করেছেন।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অধিকাংশ ফুটবলারের পারফরম্যান্স কমতে থাকে। কেউ গতি হারান, কেউ আগের ধার আর ধরে রাখতে পারেন না। কিন্তু সেরারা নিজেদের নতুনভাবে গড়ে তোলেন। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো যেমন উইং ছেড়ে বক্সের ভেতরের গোল শিকারিতে পরিণত হয়েছেন। মেসির পরিবর্তনের গল্প আরও বিস্ময়কর। একদিকে বয়স বেড়েছে, অন্যদিকে মেসি প্রতিটি সময়ের ফুটবলকে নিজের মতো করে বদলে নিয়েছেন। ১৬ বছর বয়সে বার্সেলোনার অভিষেকের পর থেকে অন্তত পাঁচবার নিজের খেলার ধরন বদলেছেন তিনি। প্রতিবারই নতুন এক মেসির জন্ম হয়েছে।
মেসির অসাধারণ প্রতিভা প্রথম চিনেছিলেন রোনালদিনহো। বার্সেলোনার অনুশীলনে প্রথম দেখেই তিনি বলেছিলেন, ‘এই ছেলেটিই একদিন বিশ্বের সেরা হবে।’ সেই ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হতে বেশি সময় লাগেনি। ২০০৫ সালের আগস্টে জোয়ান গ্যাম্পার ট্রফিতে জুভেন্টাসের বিপক্ষে ১৮ বছর বয়সী মেসির পারফরম্যান্স দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন জুভেন্টাস কোচ ফাবিও ক্যাপেলো। এমনকি তাকে দলে নেওয়ার চেষ্টাও করেছিলেন বলে জানা যায়। রোনালদিনহোর যুগ শেষ হতে শুরু করলে বার্সেলোনা কোচ ফ্রাঙ্ক রাইকার্ড বুঝতে পারেন— দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হওয়া উচিত মাঠের মাঝখান, কারণ ‘মেসির পায়ে যত বেশি বল থাকবে, দলের জন্য ততই ভালো।’
২০০৮ সালে পেপ গার্দিওলা বার্সেলোনার দায়িত্ব নেওয়ার পর শুরুতে মেসি খেলতেন ডান প্রান্তে। কিন্তু গার্দিওলা বুঝেছিলেন, তাকে উইংয়ে আটকে রাখলে চলবে না। এক ম্যাচে তিনি স্যামুয়েল ইতোকে ডানদিকে, থিয়েরি অঁরিকে বাঁ-দিকে পাঠিয়ে মেসিকে মাঝখানে খেলান। তবে প্রচলিত স্ট্রাইকার হিসেবে নয়, বরং নিচে নেমে বল নেওয়া, খেলা তৈরি করা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়ে। সেই ম্যাচে বার্সেলোনা জেতে ৬–২ ব্যবধানে। আধুনিক ফুটবলে ফলস নাইন ভূমিকাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান মেসি। যদিও ১৯৫৩ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হাঙ্গেরির নান্দর হিদেগকুতি কিংবা পরে ইয়োহান ক্রুইফ একই ধরনের ভূমিকায় খেলেছিলেন। কিন্তু মেসিই এই কৌশলকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম কার্যকর অস্ত্রে পরিণত করেন।
মেসি যখন মাঝমাঠে নেমে আসতেন। প্রতিপক্ষের সেন্টারব্যাকরা বুঝে উঠতে পারতেন না তাকে অনুসরণ করবেন, নাকি নিজেদের জায়গায় থাকবেন। দুই ক্ষেত্রেই লাভ হতো বার্সেলোনার। পেছনে জাভি, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা ও ইয়ায়া তুরে, দুই পাশে অঁরি ও ইতো থাকায় প্রতিপক্ষের জন্য তাকে থামানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠত। কয়েক সপ্তাহ পর চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষেও একই পরিকল্পনা কাজে লাগান গার্দিওলা। সেই ম্যাচে হেডে গোল করেন মেসি। এরপর ২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে লা লিগার মাত্র ৬৯ ম্যাচে করেন অবিশ্বাস্য ৯৬ গোল। ২০০৯ সালে প্রথম ব্যালন ডি’অর জেতার পর ২০১০, ২০১১, ২০১২, ২০১৫, ২০১৯ এবং ২০২৩ সালে আরও সাতটি জিতে সংখ্যাটা দাঁড় করান আটে। ২০২৪ সালে সাংবাদিক হুয়ান পাবলো ভার্সকিকে তিনি বলেন, ‘গার্দিওলার কাছ থেকে আমি জায়গা তৈরি করা, বল ধরে রাখা এবং ফুটবল আসলে কীভাবে কাজ করে, তা শিখেছি।’
২০১৫ সালে জাভি এবং ২০১৮ সালে ইনিয়েস্তা বার্সেলোনা ছাড়ার পর আবার বদলে যায় মেসির ভূমিকা। এবার তিনি শুধু গোলদাতা নন, দলের মূল সংগঠকও। আর্জেন্টাইনদের ভাষায় এনগানচে হিসেবে আরও নিচে নেমে খেলা গড়তে শুরু করেন। ২০১৯ থেকে ২০২০ মৌসুমে লা লিগার ৩৩ ম্যাচে করেন ২৫ গোল ও ২২ অ্যাসিস্ট। পরের মৌসুমে ৩০ গোলের সঙ্গে ছিল ১১ অ্যাসিস্ট। এরপর পিএসজিতে প্রথম মৌসুমে ৩৪ ম্যাচে করেন ১১ গোল ও ১৫ অ্যাসিস্ট, যা ক্লাব ক্যারিয়ারে প্রথমবার গোলের চেয়ে অ্যাসিস্ট বেশি হওয়ার ঘটনা। এক আর্জেন্টাইন বিশ্লেষক তাই বলেছিলেন, ‘গোলদাতা মেসি ধীরে ধীরে ইনিয়েস্তায় পরিণত হয়েছেন।’
আর্জেন্টিনার জার্সিতেও তার পথটা সহজ ছিল না। ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে অতিরিক্ত সময়ে হার, ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে পরাজয় তাকে ভেঙে দিয়েছিল। ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন। পরে ফিরে এসে তিনি হয়ে ওঠেন অন্য এক নেতা। ২০১৯ কোপা আমেরিকায় ব্রাজিলের কাছে বিতর্কিত সেমিফাইনাল হারের পর প্রকাশ্যে দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল কর্তৃপক্ষের সমালোচনা করেন। এরপর ২০২১ সালে মারাকানায় ব্রাজিলকে হারিয়ে আর্জেন্টিনাকে ২৮ বছরের শিরোপা খরা কাটানোর নেতৃত্ব দেন। আর ২০২২ বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে যোশকো গভার্দিওলকে কাটিয়ে দৌড়, ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে গোল, অ্যাসিস্ট, বুদ্ধিদীপ্ত পজিশনিং ও চাপের মুহূর্তে সফল পেনাল্টি। সবমিলিয়ে যেন তার পুরো ক্যারিয়ারের সারাংশ দেখা যায়।
২০২৩ সালে জিনেদিন জিদানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেসি বলেছিলেন, ‘ফুটবল অনেক বদলে গেছে। এখন খেলা অনেক বেশি কৌশলনির্ভর এবং শারীরিক। আগে অনেক বেশি জায়গা পাওয়া যেত।’
এখন ইন্টার মায়ামিতে কিংবা ২০২৪ কোপা আমেরিকায় তাকে আগের মতো দৌড়াতে দেখা যায় না। কিন্তু সেটিই তার শক্তি। তিনি হাঁটেন, খেলা পড়েন, শক্তি সঞ্চয় করেন, তারপর একটি মুহূর্তেই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেন। শৈশবের আদর্শ পাবলো আইমারের সেই বিখ্যাত কথাটি এখনও সমান সত্য, ‘শেষের মেসিই সব সময় সেরা মেসি।’ মেসির সবচেয়ে বড় কীর্তি হয়তো ট্রফি বা গোল নয়। বরং প্রতিটি নতুন চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই নতুন করে গড়ে তোলার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা। এই কারণেই লিওনেল মেসি শুধু একজন কিংবদন্তি ফুটবলার নন। তিনি সব যুগের সেরা ফুটবলার। মেসি ফুটবল বিবর্তনের সবচেয়ে জীবন্ত উদাহরণ।

স্পোর্টস ডেস্ক