অপূর্ণতার গল্প শেষে অভাগা রাজপুত্র নেইমারের বিদায়
ফুটবল মাঠে যখন নামতেন তার পা থেকে ঠিকরে বের হতো জাদুর আভা। প্রতিভার কোনো কমতি ছিল না। তাকে ফাউল না করে আটকানো প্রতিটি ডিফেন্ডারের জন্যই ছিল অসাধ্য কাজগুলোর একটি। চোখ জুড়ানো সব ড্রিবলিংয়ে মুগ্ধতা ছড়িয়েছিলেন ফুটবলপ্রেমীদের মনে। আশা দেখিয়েছিলেন একটি ফুটবল পাগল জাতিকে। কিন্তু তার বাস্তবায়ন হলো কতটুকু?
কার কথা বলছি, নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন আপনি। তিনি ব্রাজিলিয়ান তারকা নেইমার দ্য সিলভা দস সান্তোস জুনিয়র। ফুটবলের দীর্ঘ ইতিহাসে কিছু নাম থাকে, যারা কেবল মাঠে গোল করেন না, বরং শিল্পের বুনন দিয়ে কোটি মানুষের হৃদস্পন্দনের গতি নিয়ন্ত্রণ করেন। নেইমার জুনিয়র সেই তালিকার এক অনন্য নাম—যার পায়ের ছন্দে মুগ্ধতা খুঁজে পায় বিশ্ব। বারবার চোটের কারণে সেই প্রতিভার পুরোটা বিকশিত হতে পারেনি।
ক্যারিয়ারের অর্ধেকেরও বেশি সময় নেইমার থেকেছেন মাঠের বাইরে। কখনও ডাক্তারের ছুরি-কাঁচির নিচে, আবার কখনও চোট থেকে সেরে উঠার প্রক্রিয়ায়। অথচ পেলে-রোনালদো-রোনালদিনহোদের উত্তরসূরি হিসেবে যখন নেইমার এসেছিলেন, তখন ব্রাজিলিয়ানরা স্বপ্ন দেখেছিল হেক্সা মিশন পূর্ণ করার। ড্রিবলিংয়ের সেই শৈলী, নিখুঁত পাস আর গোল করার সহজাত প্রতিভা—সবই ছিল তার মধ্যে। কিন্তু ফুটবল ইতিহাসে নেইমার হয়ে রইলেন এক অভাগা যুবরাজ।
২০১৪ সালে ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে সেই মর্মান্তিক চোট। যা প্রায় তার ক্যারিয়ারকেই শেষ করে দিয়েছিল। এরপর প্রতিটি বিশ্বকাপেই যেন চোট আর দুর্ভাগ্য আঠার মতো লেগে ছিল তার পেছনে। অঢেল প্রতিভা থাকলেও যখনই সাফল্যের শিখরে পৌঁছানোর সময় হয়েছে, নিয়তি তাকে বারবার টেনে ধরেছে।
নেইমার তার ক্যারিয়ারে এতবার চোটে পড়েছেন যে, অন্য কেউ হলে হয়ত আরও আগেই হাল ছেড়ে দিয়ে বুটজোড়া তুলে রাখতেন। তবে,মাঠের লড়াইয়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টারের মনের জোরটাও ছিল প্রবল। বারবার হোঁচট খেয়েছেন, আবার উঠে দাঁড়িয়েছেন। লড়াই চালিয়েছেন ফিটনেস ফিরে পাওয়ার। ফিরে এসেছেন ফুটবলের সবুজ গালিচায়।
কিন্তু এভাবে আর কত? প্রকৃতির নিয়মে যার শুরু আছে, তার শেষও হয়। নেইমার পৌঁছে গেলেন সেই শেষের ঠিকানায়। দীর্ঘ চোট কাটিয়ে, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দলে। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে গুঞ্জন ছিল— এটাই হয়ত সেলেসাওদের সর্বোচ্চ গোলদাতার শেষ বিশ্বকাপ। নরওয়ের বিপক্ষে হারের পর সেটিকেই বাস্তব করে বিদায়ের ঘোষণা দিলেন নেইমার।
চোট নেইমারকে এতটাই আপন করে নিয়েছিল যে, শেষ বিশ্বকাপটাও রঙিন হতে দিল না। বিশ্বকাপ দলে ডাক পাওয়ার পরও কাফ মাসেলের চোটে পড়েছিলেন তিনি। সেটি থেকে পুরোপুরি সেরে না ওঠায় এবারের বিশ্বকাপে দুই ম্যাচে বদলি নেমে খেলা হয়েছে সর্বসাকুল্যে ৪০ মিনিটের মতো। গ্রুপ পর্বে ৯৮১ দিন পর জাতীয় দলের জার্সিতে নেমেছিলেন স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে। আর শেষ ম্যাচে নামলেন নরওয়ের বিপক্ষে। যে পায়ে জাদু ছিল, সেই পা যেন শেষবার তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করল।
২০০৯ সালে সান্তোসের হয়ে আলো ছড়িয়ে যখন আন্তর্জাতিক ফুটবলে পা রাখলেন, তখন থেকেই নেইমার ছিলেন আলাদা। জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়ানোর পর তিনি শুধু গোল করেননি, তিনি তৈরি করেছিলেন একের পর এক মাইলফলক। অল্প সময়ের উস্থিতিতেও ব্রাজিল ফুটবলের ইতিহাসে নিজের নামটা খোদাই করে লিখে রেখেছেন নেইমার।
নেইমার আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন যুক্তরাষ্ট্রের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। তার শুরুটাও হয়েছিল এখান থেকেই। ২০১০ সালের ১০ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচে প্রথমবার ব্রাজিলের জার্সি গায়ে গড়ান নেইমার। এরপর ব্রাজিলের জার্সিতে ১৩০ ম্যাচে মাঠে নেমে করেছেন ৮০টি গোল। যা তাকে সেলেসাওদের সর্বোচ্চ গোলদাতার খেতাব এনে দিয়েছে। শুধু গোল করা নয়, করানোতেও জুড়ি মেলা ভার। তার নামের পাশে ৫৮টি অ্যাসিস্ট সে কথাই বলে।
১৬ বছরের চোট জর্জরিত ক্যারিয়ারের জেতা হয়নি খুব বেশিকিছু। ২০১৩ সালে ফিফা কনফেডারেশনস কাপ আর ২০১৬ সালে অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জয়। জাতীয় দলে প্রাপ্তি বলতে এতটুকুই। অবশ্য সব প্রতিভাকে শিরোপা দিয়ে বিচার করা যায় না। তিনি এখনও একটি প্রজন্মের আইডল হয়ে আছেন।
কিন্তু চোটের কারণে ক্যারিয়ারের শেষের দিকে এসে সেই সোনালী স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটল। জাতীয় দলের হয়ে দীর্ঘ যাত্রায় যে ট্রফি জয়ের তৃপ্তি পাওয়ার কথা ছিল, তা না পাওয়ার আক্ষেপ কেবল নেইমারের নয়, বরং ফুটবলপ্রেমী প্রতিটি মানুষের।
মাঠের বাইরে হয়তো অনেক সমালোচনা হয়েছে, কিন্তু আজকের এই দিনে এসে সেই সমালোচনার ভাষা হারিয়ে যায়। কারণ, তিনি কেবল একজন ফুটবলার ছিলেন না, তিনি ছিলেন ফুটবলের এক রঙিন কবিতা। ইতিহাস তাকে শিরোপাজয়ী রাজা হিসেবে মনে রাখবে না হয়তো, কিন্তু এক অভাগা রাজপুত্র হিসেবে তিনি অমর হয়ে থাকবেন সেই সব ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে, যারা বুঝেছিলেন, ফুটবল মানে কেবল ট্রফি নয়।

নাজমুল সাগর