মেসির বাঁ পায়ে লেখা ছিল আমাদের বেড়ে ওঠার গল্প
‘চোখ ভাঙা ঘুমে তুমি খুঁজো না আমায়, আশেপাশে আমি আর নেই।’ অনুপম রায়ের এই গানটা শুনলে মনে হয়, কথাগুলো শুধু কোনো হারিয়ে যাওয়া মানুষকে নিয়ে লেখা নয়। বরং সেই সময়টার জন্যও, যে সময় একদিন নিঃশব্দে আমাদের জীবন থেকে সরে যায়। কিছু মানুষ চলে গেলে শুধু একজন মানুষই চলে যায় না, সঙ্গে হারিয়ে যায় একটা সময়, একটা অভ্যাস, একটা অনুভূতি।
ফুটবলের ভাষায়, আমাদের হারিয়ে যেতে বসা সেই সময়টার নাম যদি বলতে হয়, তাহলে হয়তো একটি নামই যথেষ্ট—লিওনেল মেসি।
মেসি তার শেষ ম্যাচ খেলে ফেলেছেন—এই কথাটা লিখতে যতটা সহজ, মেনে নেওয়া ঠিক ততটাই কঠিন। কারণ মেসি শুধু একজন ফুটবলার ছিলেন না। তিনি ছিলেন একটা প্রজন্মের অভ্যাস, রাত জাগার কারণ, আনন্দ আর কান্নার সঙ্গে মিশে থাকা একটি নাম। আমাদের অনেকের কাছে ফুটবল মানেই ছিল মেসি।
ম্যাচ শুরু হওয়ার আগে অপেক্ষা থাকত—আজ মেসি কী করবেন? বলটা যখন তার পায়ে যেত, মনে হতো এখন কিছু একটা হবে। সামনে ডিফেন্ডার, মেসি কাটিয়ে গেলেন। আরেকজন এলেন, তাকেও কাটালেন। তারপর বাঁ পায়ের শট। গো…ওওওওওওওও….ল! টেলিভিশনের সামনে বসে থাকা মানুষগুলো চিৎকার করে উঠত। আমরা হয়তো তখন বুঝিনি, শুধু ফুটবল দেখছিলাম না। একটা যুগকে বড় হতে দেখছিলাম।
২৪ জুন ১৯৮৭। আর্জেন্টিনার রোসারিও শহরে জন্ম লিওনেল আন্দ্রেস মেসির। তখন কে জানত, এই ছোট্ট ছেলেটার বাঁ পায়ের ছোঁয়ায় একদিন পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের আবেগ বদলে যাবে? অবশ্য মেসির শৈশবটা সহজ ছিল না। ছোট বয়সেই তার শারীরিক বৃদ্ধিজনিত সমস্যা ধরা পড়ে। প্রয়োজন ছিল চিকিৎসার। সেই চিকিৎসার খরচও পরিবারের জন্য ছিল বড় বিষয়। এরপর মাত্র ১৩ বছর বয়সে তাকে পাড়ি দিতে হলো স্পেনে।
যে বয়সে একটা শিশু নিজের শহরের গলিতে খেলাধুলা করে, সেই বয়সেই মেসিকে ছেড়ে যেতে হলো নিজের শহর, পরিচিত মানুষ আর শৈশবের অনেকটা অংশ। নতুন দেশ, নতুন ভাষা, নতুন পরিবেশ। সঙ্গে শুধু ফুটবল। সেই ভালোবাসাই তাকে নিয়ে গেল বার্সেলোনার লা মাসিয়ায়।
১৬ নভেম্বর ২০০৩। পোর্তোর বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচে মাত্র ১৬ বছর বয়সে বার্সেলোনার জার্সিতে মাঠে নামলেন মেসি। সেদিন হয়তো কেউ বুঝতে পারেনি, ইতিহাসের একটি অধ্যায় শুরু হয়ে গেছে। এরপর ২০০৪ সালে লা লিগায় অভিষেক। এরপর ধীরে ধীরে মেসি হয়ে উঠলেন বার্সেলোনার প্রাণ। পেপ গার্দিওলার বার্সেলোনা—জাভি, ইনিয়েস্তা, বুসকেটস আর সামনে মেসি—ফুটবল তখন যেন অন্য এক সৌন্দর্য খুঁজে পেয়েছিল।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, লা লিগা, কোপা দেল রে, ক্লাব বিশ্বকাপ—একের পর এক শিরোপা। তারপর ২০১২ সালে এক ক্যালেন্ডার বছরে ৯১ গোল। তখন হয়তো আমরা বুঝিনি, এমন একটি সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যা আর ফিরে আসবে না। বার্সেলোনার হয়ে ১০টি লা লিগা, ৪টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ৭টি কোপা দেল রে, ক্লাব বিশ্বকাপসহ অসংখ্য শিরোপা জিতেছেন মেসি। ব্যক্তিগতভাবে আটটি ব্যালন ডি’অর, ছয়টি ইউরোপিয়ান গোল্ডেন বুট। কিন্তু তার গল্পের সবচেয়ে আবেগের জায়গাটা ছিল আর্জেন্টিনা।
বার্সেলোনায় তিনি ছিলেন রাজা। কিন্তু আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাকে স্বর্ণ হওয়ার আগে পুড়তে হয়েছে। অপেক্ষা করতে হয়েছে, হারতে হয়েছে। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হার। ২০১৫ কোপা আমেরিকার ফাইনালেও হার। ২০১৬ সালে আবার ফাইনাল, আবারও হার। টাইব্রেকারে মেসির পেনাল্টি মিস। তারপর সেই কান্না।
এতে এতে না পাওয়ার হতাশা পুড়িয়েছিল মেসিকেও। একসময় তিনি বললেন, আর্জেন্টিনার জার্সিতে আর মাঠে নামবেন না মেসি। তখন মনে হয়েছিল, গল্পটা বুঝি অসমাপ্তই থেকে গেল। কিন্তু তিনি ফিরে এলেন, খেললেন আর জয় করলেন—পরের গল্পটা অনেকটা এমনই।
২০২১ সাল। মারাকানা স্টেডিয়াম। ব্রাজিলের মাটিতে কোপা আমেরিকার ফাইনাল। ডি মারিয়ার গোল। শেষ বাঁশি। আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন। মেসির চোখে পানি। সেই কান্নার মধ্যে ছিল বছরের পর বছর জমে থাকা আক্ষেপ। অবশেষে আর্জেন্টিনার জার্সিতে বড় একটি ট্রফি উঠল তার হাতে। কিন্তু তখনও একটি ট্রফি বাকি। বিশ্বকাপ।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে মেসির বয়স ৩৫। অনেকেই বলছিলেন, এটাই হয়তো তার শেষ বিশ্বকাপ। সৌদি আরবের কাছে প্রথম ম্যাচে হারার পর প্রশ্নও উঠেছিল। কিন্তু এরপর মেসি যেন অন্য এক গল্প লিখলেন। মেক্সিকোর বিপক্ষে গোল। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে গোল। এরপর নেদারল্যান্ডস, ক্রোয়েশিয়া। তারপর ফাইনাল।
আর্জেন্টিনা বনাম ফ্রান্স। মেসি বনাম এমবাপ্পে। মেসির গোল, এমবাপ্পের হ্যাটট্রিক, ৩-৩ সমতা, অতিরিক্ত সময়, তারপর টাইব্রেকার। মেসি শট নিলেন। গোল! আর্জেন্টিনা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। মেসি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। যে ট্রফিটা এতদিন অধরা ছিল, সেটাই অবশেষে উঠল তার হাতে। স্ক্রিনের ওপাশে বসে থাকা কোটি কোটি মানুষ বুঝতে পারল—কিছু অপেক্ষা যত দীর্ঘ হয়, তার শেষটা তত সুন্দর হয়।
তারপর ২০২৩ সালে মেসি পাড়ি দিলেন আমেরিকায়। যোগ দিলেন ইন্টার মায়ামিতে। নতুন দেশ, নতুন লিগ, নতুন দল—কিন্তু পুরোনো সেই বাঁ পায়ের জাদু। ইন্টার মায়ামিকে লিগস কাপ জেতালেন। এরপর সাপোর্টার্স শিল্ড। তারপর ২০২৫ সালে এমএলএস কাপ। বয়স বেড়েছে। গতি কিছুটা কমেছে। কিন্তু বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ফুটবল বোঝার ক্ষমতাটা বেড়েছে।
তারপর এলো ২০২৬ সাল। মেসির বয়স ৩৯। ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। একটা প্রজন্মের কাছে মেসি তখন আর শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি একটি জীবন্ত স্মৃতি। মেসি বিশ্বকাপ খেললেন। গোল করলেন, অ্যাসিস্ট করলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের পথ থেমে গেল।
একটা সময় এসে বুঝতে হয়—যত বড় কিংবদন্তিই হোক, সময়ের কাছে সবাইকে একদিন হার মানতে হয়। আর আজ সেই দিন। আজ আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসি তার শেষ ম্যাচ খেলে ফেলেছেন। আজকের পর হয়তো আর আর্জেন্টিনার কোনো ম্যাচের আগে আমরা অপেক্ষা করব না—‘আজ মেসি কী করবে?’ ফ্রি-কিকের জায়গায় দাঁড়িয়ে তাকে দেখলে মনে হবে না—‘এটা তো মেসির জায়গা।’ তার নামটা আর শুরুর একাদশে খুঁজব না।
আজ যা খুব স্বাভাবিক, একদিন সেটাই সবচেয়ে বেশি মিস করব। একদিন হয়তো গভীর রাতে ইউটিউবে গিয়ে লিখব—‘মেসির সেরা গোল।’ স্ক্রিনে দেখা যাবে সেই পুরোনো মেসি। পায়ে বল, সামনে একের পর এক ডিফেন্ডার। একজনকে কাটালেন, দুজনকে কাটালেন, তৃতীয়জনকেও কাটালেন। তারপর বাঁ পায়ের শট। গোল। ভিডিওটা দেখে হয়তো মনে হবে—‘ইশ, এই সময়টা যদি আরেকবার ফিরে আসত!’
কিন্তু সময় ফিরে আসে না। শৈশব ফিরে আসে না। প্রথমবার মেসিকে দেখার অনুভূতিও ফিরে আসে না। ২০১২, ২০১৪, ২০১৫, ২০১৬ কিংবা ২০২১-২০২২—সবকিছু একসময় স্মৃতি হয়ে যায়। মেসিও একদিন স্মৃতি হয়ে যাবেন। নক্ষত্রেরও পতন হয়। স্টেডিয়ামের আলো একসময় নিভে যায়। ম্যাচ শেষ হয়। জার্সি তুলে রাখা হয়। বুট জোড়া খুলে রাখা হয়। তারপর একজন কিংবদন্তি ধীরে ধীরে মাঠ থেকে হেঁটে চলে যান।
আজ মেসিও সেই মাঠ থেকে হেঁটে গেছেন। কিন্তু তার বাঁ পায়ের জাদু কোথাও যাবে না। তার গোল থাকবে। রেকর্ড থাকবে। কান্না থাকবে। হাসি থাকবে। মারাকানার সেই রাত থাকবে। লুসাইলের সেই রাত থাকবে। বিশ্বকাপের ট্রফি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মানুষটা থাকবে। আর সবচেয়ে বেশি থাকবে—আমাদের শৈশব।
অনুপম রায়ের সেই কথাগুলো তখন হয়তো আরও বেশি সত্যি মনে হবে— ‘চোখ ভাঙা ঘুমে তুমি খুঁজো না আমায়, আশেপাশে আমি আর নেই।’ হ্যাঁ মেসি, হয়তো একদিন আশেপাশে তুমি আর থাকবে না। কোনো স্টেডিয়ামে তোমাকে খেলতে দেখা যাবে না। কোনো নতুন গোলের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না।
কিন্তু তুমি আমাদের এমন একটা শৈশব দিয়ে গেছ, যেটা আমরা কোনোদিন ভুলতে পারব না। তুমি শিখিয়েছ—হেরে গেলে আবার উঠতে হয়। কাঁদলেও আবার মাঠে নামতে হয়। মানুষ যতই বলুক তুমি পারবে না, তবুও চেষ্টা করে যেতে হয়। লিওনেল মেসি, তুমি শুধু একজন ফুটবলার নও। তুমি কারও শৈশব। কারও কৈশোর। কারও প্রথম ফুটবল ভালোবাসা। কারও প্রথম জার্সি। কারও প্রথম রাত জেগে খেলা দেখা। কারও জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ। তাই বিদায় শব্দটা বলতে ইচ্ছে করে না। শুধু বলা যায়— ভালো থেকো, লিও।
তুমি হয়তো ফুটবল থেকে বিদায়ের পথে হাঁটতে শুরু করেছ। কিন্তু আমাদের স্মৃতি থেকে কখনোই না। কারণ কিছু আলো কখনো নিভে না। মেসি, তুমি তেমনই এক আলো। একদিন হয়তো সত্যিই চোখ ভাঙা ঘুমে তোমাকে মাঠে খুঁজব। কিন্তু আশেপাশে তুমি আর থাকবে না।
কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই দেখা যাবে, একটা ছোট্ট ছেলে বল পায়ে দৌড়াচ্ছে। সামনে একের পর এক ডিফেন্ডার। তারপর বাঁ পায়ের একটা স্পর্শ। বল জালে। আর পুরো পৃথিবী চিৎকার করে উঠছে—“মেসি!”
লিওনেল মেসি, ধন্যবাদ আমাদের শৈশবটাকে এত সুন্দর করার জন্য। ধন্যবাদ আমাদের হাসানোর জন্য, কাঁদানোর জন্য, স্বপ্ন দেখানোর জন্য। আর সবচেয়ে বেশি—ধন্যবাদ এমন একটা গল্প দেওয়ার জন্য, যে গল্প আমরা সারাজীবন আমাদের সন্তানদের কাছে বলব।
“একটা সময় ছিল, যখন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জিনিসগুলোর একটি ছিল—মেসিকে ফুটবল খেলতে দেখা।” ভালো থেকো, মেসি। আমাদের প্রজন্মের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি হয়ে থেকো। চিরকাল।

মুহাম্মদ আব্দুল কাইয়ুম ইফাজ