উৎসব-শঙ্কার ভোট কাল, সহিংসতা এড়াতে প্রস্তুত ইসি
টানটান উত্তেজনায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রচারণা এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। ভোট উৎসবের জন্য প্রস্তুত প্রার্থী ও ভোটাররা। কিন্তু ভোটারদের ভেতরে ভোট নিয়ে আছে শঙ্কা, আছে ভয়। তবে শান্তিপূর্ণ ভোট গ্রহণের সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইসি বলছে, কোনো ধরনের সহিংসতা ছাড়া ভোট গ্রহণ শেষ করা ইসির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলেও শান্তিপূর্ণভাবে সব কার্যক্রমে সফল হবে সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানটি।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রচার শেষ হয় গতকাল বৃহস্পতিবার রাত ১২টায়। স্থানীয় সরকারের সিটি করপোরেশন নির্বাচন বিধিমালা অনুযায়ী, ভোট শুরুর ৩২ ঘণ্টা আগে প্রচারকাজ বন্ধ করতে হবে। ফলে বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত শেষ মুহূর্তের প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করেন বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা।
আগামীকাল শনিবার সকাল ৮টা থেকে বিকেলে ৪টা পর্যন্ত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) মাধ্যমে সিটির ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ভোট গ্রহণের প্রস্তুতি হিসেবে আজ শুক্রবার সারা দিন বিশেষ নিরাপত্তার মাধ্যমে কেন্দ্রে কেন্দ্রে পাঠানো হবে ইভিএমসহ নির্বাচনী মালামাল। ভোট শেষে ভোটাররা নির্বাচিত করবেন তাঁদের নতুন নগর পিতা।
তবে নির্বাচনকে ঘিরে ভোটারদের সঙ্গে সঙ্গে শঙ্কা আছে প্রার্থীদের ভেতরও। একই ধরনের শঙ্কা প্রকাশ করেছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। আওয়ামী লীগ বারবার ইসিতে অভিযোগ করেছে, বিএনপি বহিরাগত সন্ত্রাসীদের ঢাকায় এনেছে নাশকতা সৃষ্টির জন্য। এদিক বিএনপিও একই অভিযোগ করেছে ইসিতে। তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা বলছেন, ‘এসব তেমন কিছু নয়। আমাদের কাছে এমন ধরনের তথ্য নেই।’ আওয়ামী লীগ ইসিতে অভিযোগ করছে, বিএনপি কেন্দ্র দখল করার পরিকল্পনা করছে। এদিকে ভোটকেন্দ্র দখল হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করে এর প্রতিকার চেয়ে সিইসিকে চিঠি দিয়েছেন বিএনপি মনোনীত মেয়র পদপ্রার্থী তাবিথ আউয়াল।
প্রার্থী ও ভোটারদের ভেতর নির্বাচনী সহিংসতাসহ নির্বাচনকেন্দ্রিক অপরাধের যেসব শঙ্কা রয়েছে, তা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে নির্বাচন কমিশন। সে জন্য নির্বাচন নির্বিঘ্ন করতে ইসির নির্দেশে দুই সিটিতে চার স্তরের নিরাপত্তাবলয় গড়ে তুলেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গতকাল বৃহস্পতিবার থেকেই স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে মাঠে নেমেছেন বিজিবি-র্যাব-পুলিশের সদস্যরা। দুই সিটি নির্বাচনে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৫০ হাজার সদস্য। ভোটের আগে দুই দিন, ভোটের দিন ও ভোটের পরদিন—মোট চার দিন মাঠে থাকবেন তাঁরা। তবে কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা চার দিনের জন্য নিয়োজিত থাকলেও অঙ্গীভূত আনসার ও ভিডিপি সদস্যরা পাঁচ দিনের জন্য নিয়োজিত থাকবেন। এ ছাড়া প্রস্তুত থাকছে বম্ব ডিসপোজাল স্কোয়াড-ডগ স্কোয়াড। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চৌকি বসিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ভোটাধিকার প্রয়োগে কোনো ভোটারকে কেন্দ্রে আসা-যাওয়ার পথে কেউ বাধা দিলে বা ভয়ভীতি, অস্ত্র, শক্তি প্রদর্শন করলে তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কাল দুই সিটিতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
দুই রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে জানা গেছে, দুই সিটিতে মোট দুই হাজার ৪৬৮টি ভোটকেন্দ্রে আছে। এর মধ্যে এক হাজার ৫৯৭টি কেন্দ্রকেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাকি কেন্দ্রগুলোকে সাধারণ কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করেছে ইসি। সুতরাং মোট ৬৪ দশমিক ৭১ শতাংশ কেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ। ঝুকিপূর্ণ কেন্দ্রে মোট ১৮ জন ও সাধারণ কেন্দ্রে ১৬ জন করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিয়োজিত থাকবেন। এবার দুই সিটিতে মেয়র, সাধারণ ও সংরক্ষিত (নারী) কাউন্সিলর পদপ্রার্থীসহ মোট ৭৪৯ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে মেয়র পদপ্রার্থী ১৩ জন।
এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে যা যা করা দরকার, ইসি তাই করবে। তবে শঙ্কা যে নেই, তা নয়। কিন্তু শঙ্কার ভাবনা থেকে আমরা অতিরিক্ত সতর্ক থাকব। নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন যেই করুক না কেন, আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা গ্রহণ করব। ভো গ্রহণ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা ইসির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলেও ইসি সবকিছুর জন্য প্রস্তুত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আমাদের নির্দেশনা আছে, যেন অহেতুক কাউকে হয়রানি না করা হয়। আর নির্বাচনকেন্দ্রিক সন্ত্রাসীকে যেন কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া না হয়।’
কবিতা খানম আরো বলেন, ‘ভোটারদের বলব, আপনারা ভোটকেন্দ্রে আসুন। আপনাদের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য আমরা প্রস্তুত। নির্বাচন কমিশন চায়, নগরবাসীকে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে আপনারা (ভোটার ও প্রার্থী) সহযোগিতা করবেন বলে আমরা আশা করছি।’
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘ভোটে কোনো ধরনের অনিয়ম সহ্য করা হবে না। সে যেই হোক না কেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও যদি কোনো ধরনের অনিয়ম করার চেষ্টা করে বা কারো পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন, তাহলেও বিষয়টি ইসি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেবে। আমরা চাই, ঢাকা সিটির ভোট হোক জনগণের ভোট।’
ঢাকা উত্তর সিটির রিটার্নিং কর্মকর্তা আবুল কাসেম বলেন, ‘ভোটকে সুষ্ঠু করতে আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত। আউনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া পাহারায় সন্ধ্যার ভেতর সব কেন্দ্রে আমাদের ইভিএম পৌঁছে যাবে। প্রস্তুত আছে ভোটকেন্দ্রসহ ভোটগ্রহণ কর্মকর্তারা। নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ করার জন্য সব ধরনের চেষ্টা ইসি চালিয়ে যাচ্ছে।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটির রিটার্নিং কর্মকর্তা আবদুল বাতেন বলেন, ‘ভোট গ্রহণের দিন সহিংসতার শঙ্কা থাকলেও কোনো ধরনের অনিয়ম করতে পারবে না কেউ। আর কেউ অনিয়ম করার চেষ্টা করলে নির্বাচনী আইন অনুযায়ী তাকে জরিমানাসহ জেলে পাঠানো হবে। এই ব্যাপারে আমরা পুরোপুরি স্ট্রিক্ট।’

মাসুদ রায়হান পলাশ