ওয়ারড্রবে ছিল ৪ বছরের শিশুর মরদেহ! খুলনায় ট্রিপল মার্ডারে মামলা, মেরি হেফাজতে
খুলনার সোনাডাঙ্গা কাঁচাবাজারের পাশের একটি ভাড়া বাসা থেকে নানি ও দুই নাতির মরদেহ উদ্ধারের লোমহর্ষক ঘটনায় অবশেষে সোনাডাঙ্গা মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। আজ রোববার (৩১ মে) নিহত দুই শিশুর বাবা মাসুম বেপারী বাদী হয়ে রফিকুল ইসলামকে প্রধান আসামি করে এই মামলাটি করেন।
সোনাডাঙ্গা মডেল থানার ডিউটি অফিসার হাসানুজ্জামান মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মামলার বাদী মাসুম বেপারীর দাবি, তার দুই সন্তান ও শাশুড়িকে নৃশংসভাবে হত্যার এই ঘটনায় তার সাবেক স্ত্রী ফাতেমা বেগম মেরি ও মেরির বর্তমান স্বামী রফিকুল ইসলাম সরাসরি জড়িত রয়েছেন। এর আগে গতকাল শনিবার (৩০ মে) সন্ধ্যা ৬টার দিকে খুলনা নগরীর সোনাডাঙ্গা এলাকার দারুল আমান মসজিদ গলির মাথায় শরিফুল ইসলামের ভাড়া বাড়ি থেকে তালা ভেঙে নানি বেবি বেগম (৬৫) এবং তার দুই নাতি শামীম (১৪) ও মুস্তাকিমের (৪) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পবিত্র ঈদুল আজহার দিন থেকে গত তিন দিন ধরে শরিফুল ইসলামের ওই ভাড়া বাসাটি বাহির থেকে তালাবদ্ধ দেখতে পাচ্ছিলেন প্রতিবেশীরা। দীর্ঘ সময় ঘর বন্ধ থাকা এবং চারপাশের রহস্যজনক পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের মনে তীব্র সন্দেহের সৃষ্টি হলে তারা বিষয়টি জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল করে জানান। খবর পেয়ে সোনাডাঙ্গা থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। প্রথমে একটি কক্ষ থেকে বেবী বেগম ও শামীমের মরদেহ উদ্ধার করা হলেও পরিবারের আরেক শিশু সদস্য মুস্তাকিমকে সেখানে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে ঘটনাস্থলে ডিবি পুলিশ ও সিআইডির বিশেষ ফরেনসিক দল এসে বিস্তারিত তল্লাশি চালায়। একপর্যায়ে ঘরের একটি কক্ষের ওয়ারড্রব খুলে ভেতর থেকে চার বছর বয়সী শিশু মুস্তাকিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা, নিহত দুই সন্তানের মা ফাতেমা বেগম মেরির দ্বিতীয় স্বামী ও পেশায় ট্রাকচালক রফিকুল হাওলাদার মাতাল অবস্থায় তাদের শ্বাসরোধ বা আঘাত করে হত্যা করেছে। নিহত দুই শিশু মেরির প্রথম ঘরের সন্তান ছিল।
নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই নিখোঁজ রয়েছেন মেরির বর্তমান স্বামী রফিকুল ইসলাম। পেশায় ট্রাকচালক রফিকুল মহানগরের দৌলতপুর থানার মানিকতলা এলাকার বাসিন্দা।
মহেশ্বরপাশা এলাকার কয়েকজন ট্রাক ড্রাইভার জানান, রফিক চরম মাদকাসক্ত ছিলেন এবং প্রায়ই মাতাল থাকতেন।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে ফাতেমা বেগম মেরিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ইতোমধ্যে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। মেরি পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন, গত চার বছরের সংসারে দ্বিতীয় স্বামী রফিকুলের সঙ্গে তার প্রায়ই ঝগড়াঝাঁটি হতো। গত শুক্রবার রাতেও রফিকুল প্রচণ্ড মাতাল অবস্থায় ছিল এবং একপর্যায়ে শাশুড়ি বেবী বেগমের সঙ্গে তীব্র তর্কে জড়ান। এরপর ঘরে ঠিক কী ঘটেছিল সে বিষয়ে আর কিছু বলতে পারেননি মেরি।
সোনাডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। নিহতদের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। এদিকে, আলোচিত এই ট্রিপল হত্যা মামলার ঘাতক ট্রাক ড্রাইভার রফিকুল হাওলাদারকে দ্রুত গ্রেপ্তারের জন্য একাধিক টিম মাঠে নেমেছে। র্যাব ও পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থা শনিবার সন্ধ্যার পর থেকে মহানগরীর কয়েকটি স্থানে অভিযান চালালেও ঘাতক রফিক বারবার স্থান পরিবর্তন করায় তাকে ধরা যায়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জানিয়েছেন, রফিকুলের মোবাইল ট্র্যাকিং করে দেখা গেছে সে ক্রমাগত তার অবস্থান পরিবর্তন করছে, তবে তাকে খুঁজে বের করার জন্য জোর চেষ্টা চলছে।

মুহাম্মদ আবু তৈয়ব, খুলনা