এক বছরে ৯ দিন ভালো বায়ু পেয়েছে ঢাকাবাসী
২০১৮ সালের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকা শহরের মানুষ মাত্র ৯ দিন ভালো বায়ু পেয়েছে। মধ্যম থেকে সতর্কতামূলক দূষিত বায়ু পেয়েছে ১৮৮ দিন। এ ছাড়া ১০৭ দিন অস্বাস্থ্যকর, ৮২ দিন খুবই অস্বাস্থ্যকর ও পাঁচ দিন মারাত্মক অস্বাস্থ্যকর বায়ু পেয়েছে। এক গবেষণায় এসব তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
গতকাল সোমবার রাজধানীর প্রেসক্লাবে ‘নগরের প্রবীণ এবং শিশুদের ওপর বায়ুদূষণের প্রভাব রোধে করণীয়’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপে এসব জানান তাঁরা। সংলাপে বলা হয়, বায়ুদূষণের কারণে ঢাকার বাসিন্দারা ফুসফুসের ক্যানসার, হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, যক্ষ্মা, যকৃতের সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, চর্মরোগ ও নিউমোনিয়ার মতো নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
এ ছাড়া সংলাপে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে গত ছয় বছরে ঢাকার বায়ুমান পর্যালোচনার তথ্য তুলে ধরা হয়। এ সময়ের মধ্যে ঢাকায় আদর্শ বায়ুমানের চেয়ে বায়ুদূষণ সব সময় চার থেকে ছয়গুণ বেশি ছিল। এই উচ্চমাত্রার বায়ুদূষণের কারণে বিকলাঙ্গ ও মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন বক্তারা।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউটের মতে বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে এক লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষ মারা যায়। উচ্চমাত্রার বায়ুদূষণের কারণে শারীরিকভাবে বিকলাঙ্গ এবং মানসিক বুদ্ধিমত্তা, অর্থাৎ নির্বোধ শিশুর সংখ্যা অনেক বেশি বেড়ে যাবে বলে জানান বক্তারা।
নাগরিক সংলাপের মূল প্রবন্ধে বলা হয়, ‘দি ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট প্রতিবছর পৃথিবীর বসবাসযোগ্য শহরগুলোর তালিকা প্রকাশ করে থাকে এবং দুর্ভাগ্যবশত গত তিন বছরে ঢাকা পৃথিবীর বসবাসযোগ্য তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। ২০১৩ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত এই ছয় বছরের ঢাকা শহরের বায়ুর মান পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, এই সময়ে ঢাকার বায়ু সব সময় আদর্শ বায়ুমানের চেয়ে চার থেকে ছয়গুণ বেশি ছিল। বায়ুমান খারাপ করার জন্য মূলত অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা দায়ী, যার আকার ২ দশমিক ৫ মাইক্রন। এই অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা আমরা খালি চোখে দেখতে পাই না। এটি এত ক্ষুদ্র যে আমাদের মাথার চুলের তুলনায় এটি ২০ থেকে ৩০ গুণ ছোট (চুলের ব্যাস ৫০ থেকে ৭০ মাইক্রন)। এটি আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।’
বায়ুদূষণের ফলে শিশুমৃত্যুর হারে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। ইটের ভাটা, অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণকাজ করা, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ও আবর্জনা পোড়ানোসহ নানা কারণে এ অবস্থার তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বায়ুমান গবেষকরা। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে এআইএলইউ বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরেরর সঙ্গে যৌথ একটি গবেষণা পরিচালনা করে। ঢাকার বায়ুদূষণের জন্য ইটভাটা, সড়কের ধুলা, যানবাহন এবং বায়োগ্যাস পোড়ানোকে দায়ী করে তারা। ঢাকার দূষণের ইটভাটা ৫৮ শতাংশ, সড়কের ধুলা ১৮ শতাংশ, যানবাহনের ধোয়া ১০ শতাংশ, বায়োগ্যাস পোড়ানো ৮ শতাংশ এবং অন্যান্য কারণ ৬ শতাংশ দায়ী বলে জানানো হয়।
সংলাপে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুজ্জামান মজুমদার। সভাপতিত্ব করেন পবার চেয়ারম্যান আবু নাসের খান। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস আহমেদের সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন বারসিকের পরিচালক পাভেল পার্থ, পবার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লেনিন চৌধুরী, নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ ফোরামের সভাপতি হাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ নিরাপদ পানি আন্দোলনের সভাপতি মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, বারসিকের সমন্বয়ক জাহাঙ্গীর আলম, পরিচালক পাভেল পার্থ প্রমুখ।
ঢাকার আশপাশের ইটভাটা হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী ক্রমান্বয়ে সরানো, ঢাকার ভেতরের রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানাগুলো ঢাকার বাইরে স্থানান্তর, প্রাইভেটকারের চাপ কমানোর পাশাপাশি গণপরিবহনের পরিমাণ বাড়ানো, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নগরে খোলা জায়গায় প্রচুর পরিমাণ গাছ লাগানোসহ নগরের জলাশয়গুলো সংরক্ষণ ও পরিষ্কার রাখার সুপারিশ করা হয়।
এ ছাড়া ঢাকার রাস্তাঘাট ও ফুটপাত নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও মেরামত এবং ধুলা সৃষ্টি করে এমন কোনো সামগ্রী (বালু, মাটি, ইট, পাথর) বহনের সময় সঠিকভাবে আচ্ছাদনের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়।

নিজস্ব প্রতিবেদক