গৃহবধূর চুলকাটা : চার আসামির গ্রেপ্তারে হাইকোর্টের নজর
মিথ্যা অপবাদ দিয়ে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় দুই সন্তানের জননীর মাথার চুল বঁটি দিয়ে কেটে দেওয়ার ঘটনায় চার আসামিকে গ্রেপ্তার করা পর্যন্ত এ মামলার দিকে নজর রাখবেন হাইকোর্ট।
অভিযুক্তদের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে হাইকোর্টে স্থানীয় পুলিশ সুপার (এসপি) প্রতিবেদন দেওয়ার পর বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ আজ বুধবার এ আদেশ দেন।
প্রতিবেদনে প্রধান আসামি জেলহাজতে আছেন উল্লেখ করে বলা হয়, বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত আছে। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার।
পরে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘আজ এমন প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর আদালত বাকি চারজন আসামি আটক না হওয়ায় অসন্তুষ্ট হয়েছেন এবং বলেছেন, বাকি আসামিদের গ্রেপ্তার না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি নজরে রাখবেন। আর এ বিষয়ে প্রতিবেদন দিয়ে আদালতকে অগ্রগতি জানাতে হবে।’
প্রতিবেদনে পুলিশ সুপার টুটুল চক্রবর্তী বলেন, মামলার পর থেকে গ্রেপ্তার এড়ানোর জন্য আত্মগোপনে থাকা আসামিদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য এলাকায় একাধিক সোর্স নিয়োগ করেন। সোর্সের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ও তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে জানা যায় যে, আসামিরা রাজধানীর পল্টন ও মতিঝিল থানা এলাকায় অবস্থান করছেন। এই তথ্য অনুযায়ী আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য উল্লাপাড়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) এবং তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্টন ও মতিঝিল থানা পুলিশের সহায়তায় ব্যাপক পুলিশি অভিযান পরিচালনা করে। প্রযুক্তির প্রয়োগের মাধ্যমে দেখা যায়, আসামিরা ঘন ঘন তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে। পুলিশি তৎপরতার কারণে ১ নম্বর আসামি মো. আবদুর রশিদ ১০ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির হয়ে বর্তমানে জেলহাজতে আটক আছেন। মামলাটির সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে উক্ত আসামিকে ১০ দিনের পুলিশ রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত আছে।
এর আগে এ বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন গত ৮ ডিসেম্বর আদালতে বিষয়টি নজরে আনেন আইনজীবী ইশরাত হাসান। ওই দিন বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ আসামিদের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা জানতে চেয়েছেন। সেই অনুসারে সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপার ও উল্লাপাড়ার স্থানীয় পুলিশের পক্ষে প্রতিবেদন দেওয়া হয়।
দৈনিক ইত্তেফাকে গত ৭ ডিসেম্বর ‘মাছকাটার বঁটি দিয়ে গৃহবধূর মাথার চুল কেটে দিল আ.লীগ নেতা’ শীর্ষক প্রকাশিত প্রতিবেদন আদালতের নজরে আনা হয়।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, মিথ্যা অপবাদ দিয়ে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় দুই সন্তানের জননীর মাথার চুল বঁটি দিয়ে কেটে দিয়েছেন এক আওয়ামী লীগ নেতা। ভুক্তভোগী ওই গৃহবধূর বাড়ি উধুনিয়া ইউনিয়নের গজাইল গ্রামে।
আসামি উপজেলার উধুনিয়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. আবদুর রশিদ। ঘটনার সময় তাঁর সঙ্গে চার সহযোগী ছিল বলে জানা গেছে।
গত ২৫ নভেম্বর রাতে চাঞ্চল্যকর এ ঘটনাটি ঘটে। এ ঘটনায় ওই গৃহবধূ নিজেই বাদী হয়ে ২ ডিসেম্বর উল্লাপাড়া মডেল থানায় ওই আওয়ামী লীগ নেতা ও তাঁর চার সহযোগীর বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০/৩০ ধারায় একটি মামলা (নম্বর-২) দায়ের করেছেন। এ মামলার অপর আসামিরা হচ্ছেন গজাইল গ্রামের মোজাহারের ছেলে মুনসুর (৩৮), বাহের প্রামাণিকের ছেলে আবদুস সালাম (৪৫), নাসির উদ্দিন (৪০) ও শহীদুল ইসলাম (৩২)।
এ মামলা দায়ের করার পর থেকে আসামিরা ভুক্তভোগীকে হুমকি দিয়ে আসছেন। একের পর এক হুমকির ভয়ে ওই গৃহবধূ পার্শ্ববর্তী তরফ বায়রা গ্রামের বাবার বাড়ি গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন।
আর এ ঘটনার পর থেকে গ্রেপ্তার এড়াতে ওই আওয়ামী লীগ নেতা ও তাঁর সহযোগীরা আত্মগোপনে থেকে প্রভাবশালীদের মাধ্যমে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী গৃহবধূ বলেন, ‘গত ২৫ নভেম্বর সন্ধ্যায় আমি আমার এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার জন্য ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেলের খোঁজে বের হই। পথে একই গ্রামের মৃত আবেদ আলীর ছেলে সাইফুল ইসলামের বাড়ির পাশে উধুনিয়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ও গজাইল গ্রামের মৃত বেলায়েত সরকারের ছেলে মো. আব্দুর রশিদ ও তাঁর চার সহযোগী আমার পথরোধ করে। এরপর সাইফুল ইসলামের সঙ্গে আমাকে আপত্তিকর অবস্থায় আটক করেছে বলে চিৎকার শুরু করেন।’
‘এ সময় গ্রামের লোকজন ছুটে এলে তাদের সামনে আমাকে বিবস্ত্র করে মারপিট করে। এতেও তাঁরা ক্ষান্ত হননি। কয়েকশ লোকের সামনে মাছ কাটার বঁটি দিয়ে আমার মাথার চুল কেটে উল্লাস করেন। এ সময় আমি তাদের কাছে নানা কাকুতি-মিনতি করলেও তাঁরা বিন্দুমাত্র সাহায্য না করে নির্দয়ভাবে আমার মাথার চুল কেটে দেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়।’
ওই গৃহবধূ আরো বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রশিদ দীর্ঘদিন ধরে আমাকে নানাভাবে কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন। এতে আমি রাজি না হওয়ায় এবং আমার বাড়ির ডিশ সংযোগ লাইন বারবার কেটে দেওয়া নিয়ে তাঁর সঙ্গে পূর্ববিরোধের জের ধর তিনি এ ঘটনাটি ঘটিয়েছেন। আমাকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে সবার সামনে মাথার চুল কেটে নির্যাতন করা হয়েছে। এতে আমি সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হয়েছি। এ ঘটনার পর থেকে আমি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছি এবং ভেঙে পড়েছি। রাতে ঠিকমতো ঘুমাতেও পারছি না।’
‘এমনকি সমাজের কাছে মুখ দেখাতে পারছি না। লজ্জা ও ঘৃণায় বাড়ি থেকে বের হতে পারছি না। ফলে একরকম নিজ বাড়িতে অবরুদ্ধ হয়ে গৃহবন্দি হয়ে পড়ে রয়েছি,’ যোগ করেন বাদী।

নিজস্ব প্রতিবেদক