ইডেন স্কুলই এখন নীতিনির্ধারকদের কর্মস্থল
দেশের পুরো প্রশাসন ও সরকারি কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের নাম সচিবালয়। যেহেতু সরকারের সব নীতিনির্ধারণী সংস্থার কার্যালয় এখানে অবস্থিত, তাই সে হিসেবে বলা যায় এটিই দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর একটি।
বিরাট সচিবালয়ে প্রতিদিন হাজারো ধরনের কাজ হয়। ভবনের প্রতিটি কক্ষ, অলিগলি থাকে কর্মব্যস্ত। সচিবালয়ে যে আঙিনা এখন ব্যস্ত থাকে ৬০ জনের বেশি মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, শীর্ষ আমলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের প্রায় ৬০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদচারণায় একসময় সেটিই মুখর থাকত কিশোরীদের কলকাকলীতে। কারণ, সচিবালয়ের পুরোনো স্থাপনাটি আদতে ছিল গার্লস স্কুল।
ঢাকার পুরোনো নকশা আর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত ইতিহাস বলছে, রাজধানীর আবদুল গনি রোড আর তোপখানা রোডের মাঝের এ জায়গায় ছিল মেয়েদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
সচিবালয়ের উত্তর দিকে তোপখানা রোড, দক্ষিণে আবদুল গনি রোড ও ওসামানী উদ্যান, পূর্ব দিকে মুক্তাঙ্গন আর পশ্চিম পাশে রয়েছে জাতীয় প্রেসক্লাব ও বিদ্যুৎ ভবন। এই হলো আজকের সচিবালয়ের অবস্থান।
বাংলাদেশের সাবেক প্রধান আর্কিটেক্ট এ এস এম ইসমাঈল সচিবালয়ের গোড়াপত্তনের ইতিহাস তুলে ধরে এনটিভি অনলাইনকে বলেন, লেখাপড়ায় পিছিয়ে থাকা এ অঞ্চলের নারীদের শিক্ষার জন্য পুরান ঢাকার ওয়ারী ও সদরঘাট এলাকায় ছোট পরিসরে দু-একটি স্কুলঘর তুলে দিয়েছিলেন নওয়াব পরিবারেরই কয়েকজন সদস্য। ওই সময় অভিভক্ত বাংলার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। নারীশিক্ষার উদ্যোক্তারা একবার তাঁর সঙ্গে দেখা করে তখন নতুন ঢাকা হিসেবে পরিচিত পল্টন এলাকায় একটি স্কুল করার অনুরোধ করেন। ঢাকার পুরোনো নকশা থেকে যতটা জানা যায়, তা হচ্ছে ওয়ারীতে প্রতিষ্ঠিত ছোট স্কুলটিই ১৯৪০ সালে তোপখানা রোডে স্থানান্তর করা হয়। ওই সময় বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির লে. গভর্নর ছিলেন আস্লে ইডেন। তাঁকে ছোট লাট হিসেবেই সবাই ডাকত। তাঁর নামানুসারেই তোপখানা রোডের এ স্কুলটির নামকরণ করা হয় ইডেন গার্লস স্কুল।
এ এস এম ইসমাঈল বলেন, ১৯৪১ সালে তোপখানা রোডের এ স্কুলটির জন্য লন্ডনের বিখ্যাত আর্কিটেক্টকে দিয়ে নকশা তৈরি করিয়ে আনা হয়। প্রথমে দোতলাবিশিষ্ট ভবন করা হয় ইডেন গার্লস স্কুলের জন্য। পরে তারই পশ্চিম পাশে আরো একটি দোতলা ভবন করে ইডেন গার্লস কলেজের যাত্রা শুরু হয়। ছাত্রীদের থাকার জন্য আবাসিক ভবন হিসেবে ইডেন গার্লস স্কুলের উত্তর পাশে একটি ভবন করা হয়। এটির নাম দেওয়া হয় ইডেন হোস্টেল।
১৯৪৭ সাল পর্যন্ত এখানে মেয়েদের শিক্ষা কার্যক্রম বেশ সুন্দরভাবেই চলে। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হলে ঢাকাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকারের সচিবালয় হিসেবে তখন সরকার উপযুক্ত স্থান খুঁজছিল। সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, তোপখানা রোডের ইডেন গার্লস স্কুল, ইডেন গার্লস কলেজ ও ইডেন হোস্টেলেই প্রাদেশিক সরকারের সচিবালয়ের কার্যক্রম শুরু করবে।
১৯৪৭ সালে ইডেন গার্লস স্কুলটিকে ওয়ারীর কামরুন্নেছা স্কুলের সঙ্গে একীভূত করে দেয়া হয়। আর ইডেন গার্লস কলেজটিকে বকশীবাজারের বদরুন্নেছা কলেজের সঙ্গে একীভূত করে দেওয়া হয়। পরে অবশ্য আজিমপুরে ইডেন কলেজ নামে পৃথক আরেকটি কলেজের যাত্রা শুরু হয়।
সচিবালয়ে স্কুলঘরের অস্তিত্ব এখনো রয়েছে বলে জানান এ এস এম ইসমাঈল। তিনি বলেন, বর্তমানে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ধর্ম মন্ত্রণালয় যে ভবনটিতে তার নাম এখনো স্কুলঘর হিসেবেই ডাকা হয়। কারণ, এটিই ছিল ইডেন গার্লস স্কুলের ভবন। এ ছাড়া সচিবালয়ে এক নম্বর ভবন হিসেবে পরিচিত ভবনটির অপর নাম হচ্ছে কলেজ ভবন। বর্তমানে এখানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম চলছে। এখানেই ছিল ইডেন গার্লস কলেজ। আর গণপূর্ত মন্ত্রণালয় যে ভবনটিতে অবস্থিত, সেটাই ছিল ইডেন হোস্টেল। এটাকে এখনো ইডেন ভবন হিসেবেই ডাকা হয়।

এম এ নোমান