অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে বেড়ে উঠছে শিশুরা
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে বেড়ে উঠছে ভৈরবের কালিকাপ্রসাদের ছিদ্দিরচর এলাকার আদর্শ গুচ্ছগ্রাম, আশ্রয়ণ আর আবাসন প্রকল্পের শত শত শিশু।
প্রকল্প এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় প্রয়োজনবোধ করলেও দারিদ্র্যপীড়িত অভিভাবকরা দূরের স্কুলে তাঁদের সন্তানদের পাঠাতে পারছেন না।
অপরদিকে সরকারি উদ্যোগে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেলেও নাগরিক অধিকারবঞ্চিত ওই সব প্রকল্পের অধিবাসীরা বাধ্য হচ্ছেন মানবেতর জীবনযাপনে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের ছিদ্দিরচর বাজার এলাকায় আদর্শ গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পে ৪৭টি, আশ্রয়ণ প্রকল্পে ৫০টি এবং আবাসন প্রকল্পে ২০টিসহ মোট ১১৭টি ভূমিহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করে সরকার। ১৯৯৭ সালে ৭ অক্টোবর আদর্শ গুচ্ছগ্রাম, ২০০০ সালের ১৮ নভেম্বর আশ্রয়ণ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন তৎকালীন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী জিল্লুর রহমান। আর ২০০২ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৬ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের তত্ত্বাবধানে নির্মিত আবাসন প্রকল্প বুঝে নিয়ে অধিবাসীদের কাছে হস্তান্তর করে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন।
ওখানকার বাসিন্দারা জানান, বিগত ১৮-১৯ বছরে প্রকল্প এলাকায় বরাদ্দ পাওয়া তাদের ঘরগুলোর ওপরের চালাসহ বিভিন্ন স্থানে ভাঙনে ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি আর শীতের শিশির বাইরে পড়ার আগেই তাদের ঘরের ভেতর পড়ে। এতে করে শিশু আর বৃদ্ধসহ তাদের পরিবারের সদস্যদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তাদের এসব দুঃখ-দুর্ভোগের কথা স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনে বহুবার জানিয়েও কোনো ফলাফল তারা পায়নি বলে এনটিভি অনলাইনকে জানিয়েছেন আদর্শ গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের সর্দার মো. সাদেক মিয়া।
এ প্রকল্পে বসবাসকারী শিশুদের শিক্ষার জন্য কোনো সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়নি। শুরুতে শিক্ষার জন্য ব্র্যাকের সহায়তায় তিন বছর মেয়াদি একটি প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা করে স্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, সাদ বাংলাদেশ। সেটি বন্ধ হওয়ার পর এখানকার শিশুদের শিক্ষার জন্য আর কোনো প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসেনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাদ বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী এম মতিউর রহমান সাগর এনটিভি অনলাইনকে জানান, তাঁর সংস্থা আঞ্চলিক পর্যায়ে বৃহৎ এনজিওগুলোর বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন। তখন ব্র্যাকের সহায়তা তাঁরা স্কুলটি পরিচালনা করেছিলেন। এখনো যদি সরকারি-বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান তাঁদের প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সহায়তা চায়, তবে তাঁরা সেটি বাস্তবায়নে প্রস্তুত।
পানি সরবারাহের জন্য বসানো নয়টি টিউবওয়েলের সব কটি বিকল হয়ে যাওয়ায় নদী-নালার পানি ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছেন ওখানে বসবাসকারী বাসিন্দারা। ফলে তাদেরসহ শিশুদের নানা ধরনের রোগ-বালাই লেগে থাকে বলে জানান তাঁরা। এ বিষয়ে অনেক দেন-দরবার করেও কোনো নতুন বরাদ্দে তাঁদের জন্য জোটেনি বলে অভিযোগ তাঁদের।
ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় টয়লেটের ময়লা-আবর্জনা উপচে পড়ে আঙিনায়। আর একটুখানি বৃষ্টি হলেই সেই নোংরা ময়লা-পানি ঘরের ভেতর ঢুকে বাস অযোগ্য পরিবেশ তৈরি করে বলেও জানান তাঁরা। এ ক্ষেত্রে তাঁরা অবিলম্বে প্রকল্প এলাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানান।
এদিকে প্রকল্প এলাকায় কোনো সীমানাপ্রাচীর না থাকায় এলাকার আৎকাপাড়া গ্রাম থেকে ছিদ্দিরচর বাজারগামী লোকজনসহ বিভিন্ন যানবাহন আশ্রয়ণ প্রকল্পের ভেতর দিয়ে চলাচল করে। এতে করে শিশুরা প্রায়ই দুর্ঘটনায় পড়ে আহত হচ্ছে। রাত-দিনের পরিবেশ নষ্ট করছে ওই অবাধ যাতায়াত। এ ছাড়া খোলামেলা থাকায় ওই সব পরিবারের তরুণীদের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কিত অভিভাবকরা।
অন্যদিকে, প্রকল্প এলাকার অধিবাসীদের ছেলেমেয়েদের বিয়েসহ নানা উৎসব-পার্বণের জন্য এখানে তৈরি করা হয়েছিল দুটি কমিউনিটি সেন্টার। ঝড়-তুফানে ভেঙে বর্তমানে সে দুটি এখন প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এতে করে তাদের বিয়ে-সাদিসহ সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠান বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে।
এসব অভাব অভিযোগ বিষয়ে ভৈরব উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা দিলরুবা আহমেদের কাছে জানতে চাইলে তিনি এনটিভি অনলাইনকে জানান, এরই মধ্যে তিনি প্রকল্পগুলো পরিদর্শন করেছেন। সমস্যাগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে কথা বলে তিনি সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। তিনি আশাবাদী, শিগগিরই এসব সমস্যার সমাধান করা যাবে।

মোস্তাফিজ আমিন, ভৈরব