ধুলো আর মাকড়সার জালে বন্দি শতবর্ষের জ্ঞানের বাতিঘর
পরিত্যক্ত ভুতুড়ে বাড়ির মতো দাঁড়িয়ে আছে ভবনটি। আগাছার লতায় ঢাকা চারপাশ, তালাবদ্ধ দরজায় মাকড়সার জাল আর নিস্তব্ধতা- দেখে বোঝার উপায় নেই এক সময় এখানেই জ্বলত জ্ঞানের আলো। দিনাজপুরের ফুলবাড়ী পৌর এলাকার সুজাপুর গ্রামে শতবর্ষের ইতিহাসের ভার সয়ে ধুঁকছে ‘সুরেশ চন্দ্র পাবলিক লাইব্রেরি’।
১৯১৬ সালে ছোট যমুনা নদীর পশ্চিম পাড়ে তৎকালীন জমিদার সুরেশ চন্দ্র রায় ও তাঁর পুত্র ক্ষিতিশ চন্দ্র রায়ের হাত ধরে এই পাঠাগারের যাত্রা শুরু হয়। সুজাপুর হাই স্কুলের দরিদ্র ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের বইয়ের অভাব দূর করতেই স্কুল সংলগ্ন এলাকায় এটি গড়ে তোলা হয়। বাবার স্মৃতি রক্ষায় ক্ষিতিশ চন্দ্র এর নাম রাখেন ‘সুরেশ চন্দ্র পাবলিক লাইব্রেরি’। এক সময় সাহিত্য, ইতিহাস ও বিজ্ঞানের অমূল্য সংগ্রহে ঠাসা এই লাইব্রেরি ছিল স্থানীয় বিদ্যোৎসাহীদের প্রধান মিলনস্থল।
সময়ের বিবর্তনে লাইব্রেরিটি প্রথম বড় ধাক্কা খায় ১৯৭১ সালে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক হানাদার বাহিনীর দেওয়া আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় এর অমূল্য বই ও আসবাবপত্র। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় এটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। এরপর ২০১১ সালে স্থানীয় সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফিজুর রহমানের উদ্যোগে পুনর্গঠনের কাজ শুরু হয়। ২০১২ সালে নতুন ভবন নির্মাণ ও ১ হাজার ১২০টি নতুন বই সংগ্রহ করা হয়। ২০১৭ সালে সেখানে একটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও চালু হয়েছিল।
হারানো জৌলুস ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হলেও তা বেশিদিন টেকেনি। অর্থাভাব, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব আর সবশেষে করোনা মহামারিতে বন্ধ হয়ে যায় লাইব্রেরির কার্যক্রম। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ছয়টি কম্পিউটার চুরি হওয়ার পর লাইব্রেরিটি পুরোপুরি অন্ধকারে তলিয়ে যায়। বর্তমানে লাইব্রেরি চত্বর ঝোপঝাড়ে পূর্ণ এবং ভেতরে বইগুলো ধুলোর স্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে।
লাইব্রেরি পরিচালনা কমিটির সম্পাদক প্রদীপ কুমার সরকার জানান, মূলত অর্থের অভাবে এবং একজন লাইব্রেরিয়ানের বেতন দিতে না পারায় প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে আছে। লাইব্রেরিতে বর্তমানে প্রায় আড়াই হাজার বই থাকলেও অযত্নে অনেকগুলো নষ্ট হচ্ছে।
লাইব্রেরির প্রবীণ পাঠক নূরুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, এটি ফুলবাড়ীর শিক্ষা ও সংস্কৃতির জীবন্ত দলিল। সামান্য পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এটি আবারও নতুন প্রজন্মের আশ্রয়স্থল হতে পারত।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আহমেদ হাছান জানান, তিনি লাইব্রেরিটি পরিদর্শন করেছেন এবং পরিচালনা কমিটিকে দ্রুত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে বসার ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিয়েছেন। ভবিষ্যতে জনবল সংকট কাটাতে এবং সরকারি বরাদ্দের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি।

মাসুদ রানা, দিনাজপুর (বীরগঞ্জ-খানসামা)