‘শুধু মাঠের জঙ্গি নির্মূল করলে জঙ্গিত্ব যাবে না’
আজ ১৭ আগস্ট। ১১ বছর আগে ২০০৫ সালের এই দিনে সারা দেশে একযোগে বোমা হামলা করে মানুষকে আতঙ্কিত করে তুলেছিল নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। দেশের ৬৩ জেলার ৩৫০টি স্থানে একযোগে সিরিজ বোমা হামলা চালানোর মধ্য দিয়ে জেএমবি নিজেদের শক্ত অবস্থানের জানান দেয়। ওই হামলায় শিশুসহ নিহত হন দুজন আর আহত হন শতাধিক ব্যক্তি।
এত বড় ঘটনার পর ১১ বছর পেরিয়ে গেলেও দেশে থেমে নেই জেএমবির কার্যক্রম। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতে, আগের মতো সাংগঠনিক শক্তি না থাকলেও নতুন নামে আবারও সংগঠিত হয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে তারা। কৌশল ও অবস্থানগত দিকে পরিবর্তন এনেছে সংগঠনটি।
পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘ওই গ্রুপ আমরা মনে করি না যে এখনো বড় কিছু, কোনো অঘটন ঘটানোর মতো ক্যাপাসিটি (সক্ষমতা) তাদের আছে। আগে যেভাবে সংগঠিত শক্তিশালী মহলগুলো, মহলের কেউ কেউ কাজ করত, একটা শক্ত অবস্থান থেকে, যাদের সক্ষমতা অনেক বেশি, এ রকম কেউ কেউ জড়িত ছিল। এখন আমরা মনে করি, ওই পর্যায়ে নেই। এখন ব্যক্তি পর্যায়ে বা কোনো কোনো মহল যে মহলের আসলে কোনো গ্রহণযোগ্যতা নাই, এ রকম মহল থেকে আসলে পৃষ্ঠপোষকতা থাকতে পারে।’
নিজেদের প্রয়োজনে কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠী জঙ্গিবাদকে মদদ দেওয়ায় জঙ্গিবাদ নির্মূল কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
এ ছাড়া ময়মনসিংহের ত্রিশালে পুলিশভ্যান থেকে মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত তিন জেএমবি সদস্যকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে, জঙ্গিরা নতুন করে সংগঠিত হচ্ছে। অর্থাৎ এসব সংগঠনকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে এখনো পেছন থেকে কেউ কলকাঠি নাড়ছেন। এদের খুঁজে বের করে শাস্তি দিতে পারলেই জঙ্গি তৎপরতা অনেকাংশে কমে আসবে বলে মনে করেন তাঁরা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আবদুর রশীদ বলেন, ‘যখনই তাঁরা কোনো একটি বিষয়ে জঙ্গিত্বকে মাথাচাড়া দেওয়ার জন্য পৃষ্ঠপোষকতা দেয়, তার পেছনে তাদের একটা লুকায়িত উদ্দেশ্য থাকে। সেই লুকায়িত উদ্দেশ্যকে উন্মোচন করা হচ্ছে একটা কঠিন কাজ। সেটিতে বাংলাদেশকে এখন নজর দিতে হবে। শুধু মাঠের জঙ্গিকে নির্মূল করলে জঙ্গিত্ব চলে যাবে, এটা আমি মনে করি না। তবে মদদদাতা ও পৃষ্ঠপোষকদের সেটা দেশীয় হোক, বিদেশি হোক তাদের চিহ্নিত করে আপনি যতক্ষণ না জঙ্গিবাদ থেকে বিচ্যুত করতে পারছেন, তাহলে জঙ্গিবাদ নির্মূল হবে না।’
নিরাপত্তা বিশ্লেষক আবদুর রশীদের মতে, বিচারকাজ প্রলম্বিত হওয়া জঙ্গিবাদ নির্মূলের সহায়ক নয়। তাই বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে জঙ্গিবাদের বিচার হতে পারে বলে মত তাঁর।
আবদুর রশীদ আরো বলেন, ‘বাংলাদেশে ভালো আইন হয়েছে। কিন্তু সেটা এখনো কার্যকর হয়নি। যেমন আমাদের অ্যান্টিটেররিস্ট অ্যাক্ট, ২০০৯ আছে। সেখানেও একটি স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের কথা বলা আছে। স্পেশাল ইনভেস্টিগেট করে যেভাবে যুদ্ধাপরাধীর বিচার হচ্ছে, সেটির মধ্যে যদি জঙ্গিবাদের বিচার হতো, তাহলে বিচারটা দ্রুত হতো এবং এটা জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কাজ করত। ’
দীর্ঘ এই সময়ে জঙ্গিবাদের ঘটনায় তিন শতাধিক মামলা হলেও বিচার হয়েছে মাত্র ৮০টির। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে ২৪ জনের। ১০০ জনের যাবজ্জীবন এবং বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি হয়েছে আরো শতাধিক জঙ্গির। বাকি মামলা এখনো বিচারাধীন রয়েছে।

তামজিদ সুমন