মানবতাবিরোধী অপরাধ : ছয়জনের ব্যাপারে আদেশ রোববার
মানবতাবিরোধী অপরাধে জামালপুরের ছয়জনকে গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে জানিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্র্যাইব্যুনালে প্রতিবেদন দাখিল করেছে পুলিশ।
পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) পক্ষ থেকে দেওয়া ওই প্রতিবেদনের ওপর আদেশের জন্য ১০ মে, রোববার দিন নির্ধারণ করেছেন আদালত। একই সঙ্গে তাঁদের (ছয়জনের) অনুপস্থিতিতে বিচার কার্যক্রম শুরু করা হবে কি না, সে ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত দেবেন ট্রাইব্যুনাল।
আজ বুধবার ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এ আদেশ দেন।
এর আগে গত ২৯ এপ্রিল জামালপুরের আট রাজাকারের মধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অন্য ছয়জনের গ্রেপ্তারের বিষয়ে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, তার অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করতে পুলিশপ্রধানকে নির্দেশ দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। ওই দিন রাজাকারের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
জামালপুরে আলবদর বাহিনীর উদ্যোক্তা আশরাফ হোসাইনসহ জেলার আটজনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গত ১৯ এপ্রিল ট্রাইব্যুনালে দাখিল করে প্রসিকিউশন।
এসব অভিযোগের ওপর ২১ এপ্রিল শুনানি শেষে ২৯ এপ্রিল তাঁদের অভিযোগ আমলে নেন আদালত ।
রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ও অ্যাডভোকেট তাপস কান্তি বল।
এ মামলার আট আসামি হচ্ছেন আশরাফ হোসেন (৬৪), অধ্যাপক শরীফ আহম্মেদ ওরফে শরীফ হোসেন (৭১), মো. আবদুল মান্নান (৬৬), মো. আবদুল বারী (৬২), মো. হারুন (৫৮), মো. আবুল হাশেম (৬৫), শামসুল হক ওরফে বদর ভাই (৭৫) ও এস এম ইউসুফ আলী (৮৩)। তাঁদের মধ্যে দুজন কারাগারে থাকলেও পলাতক রয়েছেন বাকি ছয়জন।
গত ১৯ এপ্রিল ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে ব্যারিস্টার তাপস কান্তি বলের নেতৃত্বে প্রসিকিউশন টিম ১০৭ পৃষ্ঠার আনুষ্ঠানিক অভিযোগটি দাখিল করে।
অভিযোগে বলা হয়, আসামিদের মধ্যে গ্রেপ্তার দুজন মুক্তিযুদ্ধে রাজাকার বাহিনীর সদস্য এবং পলাতক ছয়জন আলবদর বাহিনীর সদস্য ছিলেন। গ্রেপ্তার অ্যাডভোকেট শামসুল আলম জামালপুর জেলা জামায়াতের সাবেক আমির এবং এস এম ইউসুফ আলী সাবেক জামায়াত নেতা ও জামালপুর জেলার সিংহজানি স্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষক।
আট আসামির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের ৩(১), ৪(১) ও ৪(২) ধারা অনুসারে হত্যা, গণহত্যা, আটক, অপহরণ, নির্যাতন, লুটপাট ও লাশ গুমের পাঁচটি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ২২ এপ্রিল থেকে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তৎকালীন জামালপুর মহকুমায় তাঁরা অপরাধগুলো সংঘটিত করেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
অভিযোগগুলোর মধ্যে জামালপুরে রাজাকার-আলবদর বাহিনী ও শান্তি কমিটি গঠন, স্থানীয় সাধনা ঔষধালয় দখল করে আলবদর বাহিনী ও শান্তি কমিটির কার্যালয় স্থাপন এবং সিংহজানি হাই স্কুলে আলবদর সদস্যদের প্রশিক্ষণ প্রদান। এ ছাড়া পিটিআই হোস্টেল ও আশেক মাহমুদ কলেজের ডিগ্রি হোস্টেল দখল করে নির্যাতন কেন্দ্র গড়ে সেগুলোতে ১০ হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা-গণহত্যা, আটক, অপহরণ, নির্যাতন ও গুমের অভিযোগ আনা হয়েছে। ঘটনার ৩৪ জন ও জব্দ তালিকার ছয়জনসহ মোট ৪০ জন সাক্ষী আট আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবেন।
মামলার প্রধান আসামি পলাতক আশরাফ হোসেন আলবদর বাহিনীর জামালপুর মহকুমার কমান্ডার ছিলেন। তাঁর মাধ্যমেই মূলত ইসলামী ছাত্রসংঘের বাছাই করা কর্মীদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের কিলিং স্কোয়াড আলবদর বাহিনী গঠিত হয়। মামলাটি দায়েরের পর থেকেই তিনি ভারতে পালিয়ে আছেন বলে তাঁরা নিশ্চিত হয়েছেন বলেও জানান তদন্ত কর্মকর্তা।
এ ছাড়া পলাতক অধ্যাপক শরীফ আহম্মেদ স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক এবং বাংলাদেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে কর্মরত ছিলেন।
গত ২৫ মার্চ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. মতিউর রহমান ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন কার্যালয়ে চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুর কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। এর আগে ২৪ মার্চ বেলা ১১টায় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার ধানমণ্ডি কার্যালয় সেফহোমে সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক আবদুল হান্নান খান, জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক সানাউল হক এবং এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্ত সংস্থার উপপরিচালক সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মতিউর রহমান এক সংবাদ সম্মেলনে আসামিদের বিরুদ্ধে তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেন।
৯২ পৃষ্ঠার মূল তদন্ত প্রতিবেদনসহ ৫৯৬ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনে বিভিন্ন ধরনের সাক্ষ্য-প্রমাণ, দলিল ও ডকুমেন্টস রয়েছে। এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মতিউর রহমান ২০১৩ সালের ৬ জুন থেকে গত ২৪ মার্চ পর্যন্ত তদন্তকাজ সম্পন্ন করেন। তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে আসামিদের বিরুদ্ধে মোট ১০টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনেছিলেন তদন্ত সংস্থা। সেখান থেকে একটি বাদ দিয়ে ও বাকিগুলো সমন্বিত করে মোট পাঁচটি অভিযোগসংবলিত আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেন প্রসিকিউশন।
রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে গত ৩ মার্চ আশরাফ হোসেনসহ ওই আটজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল-২। পরোয়ানা জারির পর ওই দিনই বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে অভিযান চালিয়ে জামালপুর শহরের নয়াপাড়ার নিজ বাড়ি থেকে শামসুল হককে ও ফুলবাড়িয়ার জাহেদা শফির মহিলা কলেজগেট প্রাঙ্গণ থেকে ইউসুফ আলীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বর্তমানে কারাগারে থাকা এ দুজনকে তদন্তের স্বার্থে গত ৬ মার্চ সেফহোমে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন।

জাকের হোসেন